kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৮ হাফেজের গর্বিত পিতা ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

২০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৮ হাফেজের গর্বিত পিতা ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ

সন্তান-সন্ততি, মানুষের জাগতিক সৌন্দর্য ও সাফল্যের বাহন। বংশের প্রদীপ জ্বেলে দেওয়ার মায়াবী সংকল্পে বান্দার আকুতি থাকে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে—‘তুমি আমাদের এমন পরিজন (স্ত্রী-সন্তান) দান করো,  যারা আমাদের চক্ষুর শীতলতা দানকারী হবে এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানাও।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭৪)

ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মো. নুরুল হক মিয়া এমন এক গর্বিত পিতা, যাঁর আটজন সন্তানই পবিত্র কোরআন বুকে ধারণ করে ইসলামের দ্যুতি ছাড়াচ্ছেন দেশ-দেশান্তরে।

বাংলাদেশে কলেজ শিক্ষার শ্রেষ্ঠতম প্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজ। প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৪১। ঢাকা কলেজ দেশের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কলেজের কিংবদন্তিতুল্য অভিভাবক ও ব্যক্তিত্ব মো. নুরুল হক মিয়া। জীবনের গল্পে তিনি বলেন, ‘ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপালের চেয়ারে যেদিন বসি, তখন সবাই বলেছিল, ঢাকা কলেজের দেড় শ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম দাড়ি-টুপিওয়ালা কেউ প্রিন্সিপালের চেয়ারে বসল।’

অনেকেই জানেন, অধ্যাপক নুরুল হক বিশ্ববরেণ্য আলিম, শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)-এর জামাতা। তিনি ছাত্রজীবন থেকে তাবলিগ জামাতে জড়িত। তাঁর দুই ছেলে ও ছয় কন্যার সবাই পবিত্র কোরআনের হাফেজ। দুই ছেলেই মাওলানা, ঢাকার সুবিখ্যাত জামিয়া আরাবিয়া রহমানিয়ার শিক্ষক।

বিস্ময়কর, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ও ঢাকা কলেজের মতো কলেজের অধ্যক্ষের আট সন্তানই হাফেজে কোরআন! অধ্যাপক হক তাঁর সন্তানদের প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঢাকা কলেজের সহকর্মীরা বলতেন, স্যার সবাইকে মাদরাসায় পড়াচ্ছেন, ওরা খাবে কী? বলতাম আল্লাহ ভরসা।’ মহান আল্লাহ তাঁর সন্তানদের খারাপ রাখেননি।

নির্লোভ, সংসার-সন্তান অন্তপ্রাণ অধ্যাপক হক অত্যন্ত সহজ-সরল, ধার্মিক ও প্রখর মেধাবী। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পিএইচডির জন্য আমেরিকা যাননি। ভেবেছেন সন্তানের ভবিষ্যৎ, ভেবেছেন তাদের ধার্মিকতা ও নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি নিয়ে।

১ জুলাই ১৯৪৪ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরের গোসিঙ্গা ইউনিয়নের পটকা গ্রামে জন্ম নেওয়া অধ্যাপক হক, একজন তারকা। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় রসায়ন, সেশন ১৯৬৬-১৯৬৭। তিনি ফজলুল হক মুসলিম হলের ৩৫৯ কক্ষের আবাসিক। অধ্যাপক হকের সমসাময়িকদের তালিকা দীর্ঘ ও স্বর্ণোজ্জ্বল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পাশাপাশি কক্ষে (৩৬১) ছিলেন এক বছরের সিনিয়র আওয়ামী লীগের সাবেক শীর্ষনেতা আব্দুর রাজ্জাক। পড়তেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। তখন তোফায়ের আহমেদ ইকবাল হলের (সার্জেন্ট জহুরুল হক) ভিপি। জনাব নুরুল হকের ঘনিষ্ঠ রাজনীতির রহস্যপুরুষ সিরাজুল আলম খান। রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী—অনেকেই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং জনাব হকের কাছের মানুষ, বন্ধু।

জনাব নুরুল হকের অধ্যাপনা শুরু ১৯৬৯ সালে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মস্থল হলো জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ, ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ, সিলেট এমসি কলেজ, টাঙ্গাইলের সা’দাত কলেজ। চার বছর রসায়ন বিভাগের প্রধানসহ দীর্ঘ এক যুগ কাটিয়েছেন ঢাকা কলেজে। ২০০১ সালে হন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত)।

অধ্যাপক নুরুল হক জ্ঞানসাধনা, মসজিদমুখিতার অনন্য উদাহরণ। ঢাকা কলেজের দায়িত্বকালে অধ্যক্ষের সুবিধা নেননি। ব্যবহার করেননি সরকারি গাড়ি, সরকারি বাংলো ও টেলিফোন সুবিধাও। লালবাগের বাসা থেকে বেশির ভাগ সময় হেঁটেই কলেজে আসতেন, এমনকি অধ্যক্ষের দায়িত্বকালেও। জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বিবেচনায় একটু চেষ্টা করলেই তিনি পারতেন ভারমুক্ত অধ্যক্ষ পদে স্থায়ী হতে। বরং তাঁর অনুভূতি, ‘কী দরকার, এ জন্য তদবির লাগে, আমি তা করব না।’ অথচ তাঁর সহপাঠী, সমবয়সী অনেক নেতা মন্ত্রী ছিলেন। প্রভাবশালী অনেকেই তাঁর ঘনিষ্ঠজন। শ্রীপুরের সাবেক এমপি মরহুম রহমত আলীর পুত্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পদার্থবিজ্ঞানী এম জাহিদ হাসান তাপসের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠতা, তিনি নিয়মিত অধ্যাপক নুরুল হকের বাসায় যাতায়ত করতেন।

অধ্যাপক হক ‘কেমিস্ট্রির প্রফেসরে’র সুখ্যাতি পান তাঁর রচিত অন্তত সাতটি বই উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরের পাঠ্যসূচিভুক্ত হওয়ার কারণে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তাঁর বইগুলো অদ্বিতীয়। করেছে ব্যবসায় একচেটিয়া রাজত্ব। প্রকাশকের প্রচেষ্টা না থাকায় বইগুলো বাজারে নেই। তবে অভিজাত পুস্তকবিতানে ‘ঢাকা কলেজ কেমিস্ট্রি নুরুল হক’ নামে পুরনো বই খুঁজলেই বোঝা যায়, তিনি হারিয়ে যাননি।

অধ্যাপনা, লেখালেখির পাশাপাশি জনাব হক তাবলিগি কাজে দেশ-বিদেশে সময় লাগিয়েছেন। তিনি একজন প্রবীণ দায়ি বা মুবাল্লিগ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাবলিগে গেলে অসংখ্য ছাত্র তাঁর সাক্ষাৎ, ক্লাস ও অটোগ্রাফ পাওয়ার জন্য ছুটে আসত।

অধ্যাপক নুরুল হকের ছোট ছেলে হাফেজ মাওলানা এহসানুল হক বলেন, ‘পিতার কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে তাঁর সোনালি অধ্যায়গুলো দেখার সুযোগ আমি পাইনি। তবে যখন ঢাকা কলেজে অধ্যক্ষের অনারবোর্ডে আব্বার নাম দেখি তখন গর্বে বুক ভরে যায়, এ আনন্দ বলে প্রকাশের নয়।’ সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা, বড় বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র অধ্যাপক নুরুল হকের ছাত্র, তাঁর বই পড়েছেন, শুনলে এহসানুল হক নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন।

বর্তমানে অধ্যাপক হক গুরুতর অসুস্থ। আছে ডায়াবেটিস, প্রেসারসহ অন্যান্য বার্ধক্যজনিত সমস্যা। পারকিনসনের ফলে তিনি অপরের সহযোগিতা ছাড়া প্রায় চলতেই পারেন না। কিন্তু তাঁর স্মৃতি ও মেধা সচল, স্বাভাবিক।

বর্তমানে অধ্যাপক নুরুল হকের বসবাস আজিমপুরস্থ আমতলা রোডের ৩০ নম্বর শেখ সাহেব বাজার ঠিকানায়। বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনসহ কারো সঙ্গে এখন তাঁর যোগাযোগ নেই। ব্যস্ত জীবনে ছুটে চলা মানুষজনের তেমন কেউ-ই তাঁর খবর নেয় না।

জীবন সায়াহ্নে তাঁর অখণ্ড অবসর কাটে বিছানায়। এই রমজানেও অতি কষ্টে রোজা রাখছেন নিয়মিত। লকডাউনের সুবাদে হুইলচেয়ারে পারিবারিক পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যথারীতি জামাতে তারাবি আদায় করছেন।

পরিশেষে এই খ্যাতিমান অধ্যাপকের সুস্থ, সুন্দর, রোগমুক্ত, নির্বিঘ্ন ও সাবলীল ভবিষ্যৎ কামনা করি। তিনি শতায়ু লাভ করুন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া, গাজীপুর।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা