kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা মহামারির প্রভাব ও দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

মুফতি শাহেদ রাহমানী, সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ, ঢাকা

১৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনা মহামারির প্রভাব ও দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী যে ভয়াবহ মহামারি দেখা দিয়েছে তার প্রভাব সমাজের সব শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর দৃশ্যমান। আগামীতে এই সংকট আরো প্রকট হওয়ার ভয় রয়েছে। সুতরাং দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও দ্বিনপ্রেমী মানুষের ভেতর একটি শঙ্কা কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে দুটি দিক রয়েছে। এক. বাহ্যিক উপায়-উপকরণ। এই দিক বিবেচনা করলে দ্বিনদার মানুষের শঙ্কা অযৌক্তিক নয়। মাদরাসা-মসজিদের মতো যেসব প্রতিষ্ঠানকে ‘সাধারণ মানুষের সহযোগিতানির্ভর’ মনে করা হয়, তার সবগুলোর ব্যাপারেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে; শুধু কওমি মাদরাসা নয়। কেননা দাতাদের আর্থিক অবস্থা যদি খারাপ হয়ে যায়, তবে তারা এসব প্রতিষ্ঠানকে কিভাবে সহযোগিতা করবে—এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। এ ছাড়া রমজানে যেহেতু মানুষ পুণ্যের কাজে বেশি অগ্রগামী থাকে, তাই রমজান মাসে দ্বিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ বেশি হয়। এর মধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান। সে হিসেবে আগামী দিনে এর প্রভাব দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পড়তে পারে। তবে প্রভাব পড়াটা নিশ্চিত কোনো বিষয় নয়, একটি ধারণা মাত্র।

দুই. আল্লাহর ওপর নির্ভরতা। দেশের কওমি ধারার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোথাও লেখা নেই তারা মানুষের চাঁদার ওপর নির্ভর করে চলে। এ দেশের কওমি ধারার মাদরাসাগুলোর যে বার্ষিক প্রতিবেদন ও পরিচিতি প্রকাশিত হয়, তাতে লেখা হয়—এই প্রতিষ্ঠান আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তাঁর রহমতের ওপর নির্ভর করেই পরিচালিত হয়। এটাই লিখিত ঘোষণা এবং এটাই প্রকৃত সত্য—কওমি ধারার মাদরাসাগুলো আল্লাহর ওপর নির্ভর করেই যুগ যুগ ধরে চলছে।

বর্তমানে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভয় করা হচ্ছে, তার চেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে। যুদ্ধের পুরো বছর এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হতে হতে যে সময় লেগেছিল, তখন দেশ ও সমাজ একটি সংকটময় সময় কাটিয়েছিল। সে সময়ও মাদরাসাগুলো বন্ধ হয়ে যায়নি। সুতরাং আমরা মাদরাসাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি শঙ্কিত নই। যারা খুব বেশি চিন্তিত তাদের আশ্বস্ত করে বলতে চাই—দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা আল্লাহর অনুগ্রহে পরিচালিত হয়। আল্লাহ এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষা করবেন। মাদরাসাগুলোকে মহামারি ও মন্দার প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখতে মাদরাসা ছাত্র-শিক্ষক ও দায়িত্বশীলদের কাজ হলো পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং তাঁর অনুগ্রহ ও করুণা কামনা করা।

এই কঠিন সময়ে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত ও তা অবতীর্ণ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে লোকেরা বলল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো; কিন্তু এটা তাদের ঈমান দৃঢ়তর করেছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৩)

তাফসিরে ইবনে কাসিরের বর্ণনা মতে, উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত হওয়ার পর এই ঘটনা ঘটেছিল—বেশির ভাগ সাহাবি তখন আহত ও ক্লান্ত ছিলেন। তাদের ঈমানি দৃঢ়তার কারণে আল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে আরো গুরুতর পরিণতি থেকে রক্ষা করেছিলেন। সায়্যিদুনা ইবরাহিম (আ.) অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মুহূর্তে এই বাক্যই পাঠ করেছিলেন। সুতরাং মুমিনের কাজ হলো যেকোনো বিপর্যয় ও ভয়ের সময় আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখা এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া। বরং আমি বলব, এটা আমাদের সামনে একটি পরীক্ষার সময়। প্রকৃতার্থে আমরা আল্লাহর জন্য দ্বিনি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি কি না, সেই পরীক্ষা দেওয়ার একটি সময় এসেছে। একইভাবে মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডগুলো ও মাদরাসা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের জন্য এটি অভিভাবকত্বের পরিচয় দেওয়ার সময়। নিশ্চয়ই কোনো দায়িত্বশীল অভিভাবক দুর্দিনে অধীনস্থদের ভুলে যান না।

আর দেশের দ্বিনপ্রিয় মানুষের জেনে রাখা উচিত যে দেশের দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখা মুসলমানের জন্য আবশ্যক। যেমন আবশ্যক নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা। সুতরাং সাধারণ মুসলমানের দায়িত্ব হলো একবেলা না খেয়ে হলেও মাদরাসাগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা করা। আর আলেম-উলামা ও ছাত্রদের দায়িত্ব হলো আল্লাহর দিকে পরিপূর্ণ মনোযোগী হওয়া। বিশেষত রহমতের মাস রমজানে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ প্রার্থনায় নিজেদের নিয়োজিত করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা