kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

শবেবরাতে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই

মুফতি শহীদুল্লাহ   

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শবেবরাতের নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত ও আমল নেই। তবে বিশেষ কিছু আমল করা যায়। আর বিশুদ্ধ মতানুসারে শবেবরাত ও শবেকদরের নফল আমলগুলো একাকী করণীয়। ফরজ নামাজ অবশ্যই মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার, তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বে। বিভিন্ন হাদিস থেকে এ রাতে দীর্ঘ নামাজ পড়া, সিজদা দীর্ঘ হওয়া, দোয়া-ইস্তিগফার করার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। (শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকি : ৩/৩৮২, ৩৮৩)

১। এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা।

২। দীর্ঘ সেজদায় দীর্ঘ নফল নামাজ পড়া। দুই রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব এবং যে সুরা দিয়ে সম্ভব পড়তে থাকা। নির্দিষ্ট সুরা ও নির্ধারিত রাকাতসংখ্যার কোনো নিয়ম নেই। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘এ রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দীর্ঘ সময় ধরে সেজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকতেন।’ (শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকি, হাদিস : ৩৫৫৪, তুহফাতুল আহওয়াজি : ৩/৩৬৭)

৩। সালাতুল হাজত পড়া।

৪। সালাতুত তাসবিহ পড়া। এটি চার রাকাতবিশিষ্ট নফল নামাজ। প্রতি রাকাতে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ ৭৫ বার করে চার রাকাতে মোট ৩০০ বার পড়া। হাদিসে আছে, ‘মহান আল্লাহ এ নামাজ আদায়কারীর প্রথম-শেষ, অতীত-বর্তমান, ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত, ছোট-বড় এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (আবুদাউদ, হাদিস : ১২৯৭, রদ্দুল মুহতার : ২/২৭)

৫। বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ পাঠ, জিকির-আজকারে মশগুল থাকা।

৬। তাওবা-ইস্তিগফার করা, সব মুমিন মুসলমানের ইহকালীন-পরকালীন কল্যাণ ও ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করা এবং দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে কান্নাকাটি করে রাত কাটিয়ে দেওয়া। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কাঁদো! যদি কাঁদতে না পারো, তাহলে কাঁদার ভান করো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৯৬)

৭। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া। এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত নফল নামাজ আদায় করা হয়। এটাকে ‘সালাতুল লাইল’ বা তাহাজ্জুদ নামাজ বলে। তাহাজ্জুদ শেষ রাতে পড়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্কৃষ্ট নামাজ হচ্ছে রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬৩, ফাতাওয়া দারুল উলুম : ৪/২২৩, ২২৭)

৮। মৃত আত্মীয়-স্বজন ও মুসলিম নর-নারীর কবর জিয়ারত করা এবং তাদের মাগফিরাত কামনা করা। এ রাতে রাসুল (সা.) একবার মদিনার প্রাচীন কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে একাকী গিয়েছিলেন; কোনো সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে যাননি। তাঁর অনুকরণার্থে জরুরি মনে না করে একাকী কবরস্থানে যাওয়া যাবে। তবে এ আমলকে আবশ্যকীয় মনে করা যাবে না। আর মাঝেমধ্যে ছেড়েও দিতে হবে। (ইসলাহি খুতুবাত : ৪/২৫৯-২৬০)

৯। শবেবরাতের পরের দিন রোজা রাখা। এটি মুস্তাহাব আমল। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা অর্ধ শাবানের রজনী ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোজা রাখো।’ তা ছাড়া শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখার কথা সহিহ হাদিসে এসেছে এবং ওই দিন ‘আইয়ামে বিজ’ (চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ)-এর অন্তর্ভুক্ত। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৮৮, লাতায়িফুল মাআরিফ : ১/১৫১-১৫৭)

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আম্বরশাহ আল-ইসলামিয়া, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।

 

শবেবরাতে যে কাজগুলো করা যাবে না

যেকোনো বরকতময় স্থান, ফজিলতপূর্ণ সময় বা ইবাদতে শয়তানের প্রচেষ্টা থাকে আদমসন্তানকে বরকত ও ফজিলত থেকে বঞ্চিত করা। এ জন্য শয়তান তাদের ভেতরে অতি সতর্কভাবে কিছু বিদআত, রসম-রেওয়াজ এবং নানা অনুচিত ও মনগড়া বিষয় ঢুকিয়ে দেয় আর এগুলোকে এমনভাবে সাজিয়ে তোলে যে কিছু লোক গোঁড়ামির কারণে আর কিছু লোক নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতার কারণে অতি দ্রুত শয়তানের এসব ধোঁকার বেড়াজালে আটকে যায়। ফলে সাওয়াব ও কল্যাণের পরিবর্তে ইহকালীন ও পরকালীন ক্ষতি ও অকল্যাণের বোঝা বয়ে বেড়ায়। শবেবরাতও সেসব বিদআত ও রসম-রেওয়াজ এবং নব-আবিষ্কৃত বিষয়াদি থেকে মুক্ত থাকেনি। নিম্নে এ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা হলো।

১।        নারীদের জামাত : নারীদের পরস্পরে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। চাই তা ফরজ হোক অথবা সুন্নত বা নফল।

            রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নারীদের নামাজের উত্তম জায়গা হলো তাদের ঘরের নির্জন কোণ। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬৫৪২; হাদিসটি হাসান)

২।        খিচুড়ি, হালুয়া-রুটি তৈরি ও মিষ্টান্ন বিতরণে সময় ব্যয় করা। মসজিদ, ঘরবাড়ি বা দোকানপাটে আলোকসজ্জা করা। মাইকে কোরআন তিলাওয়াত করা। কবরস্থান ও মাজারগুলোতে ভিড় করা, ওই সব স্থানে আলোকসজ্জা করা, মেলা বসানো, পুষ্প অর্পণ করা, মোমবাতি জ্বালানো, বহুদূর সফর করে আসা, ঘোরাফেরা করা, বিভিন্ন তামাশা দেখে মূল্যবান সময় নষ্ট করা। এ সবই গুনাহের কাজ ও বিদআত। এসবের পেছনে লেগে এ রাতের মূল কাজ তাওবা-ইস্তিগফার ও ইবাদত-বন্দেগির যেহেতু ব্যাঘাত ঘটে এবং অন্যদের ইবাদতেও বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়, তাই এগুলো থেকে বেঁচে থাকা অত্যাবশ্যক। (মা সাবাতা বিসসুন্নাহ : ৩৫৩-৩৬৩)

৩।       আতশবাজি করা, পটকা ফোটানো, নারীদের ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়া এবং বেপর্দা হয়ে দোকানপাট, মাজার ইত্যাদি স্থানে ভিড় করা। এসব সব সময়ই হারাম। (মা সাবাতা বিসসুন্নাহ : ৩৫৩-৩৬৩)

৪।        শবেবরাতে গোসল। শাবানের ১৫ তারিখের রাতের বিষয়ে সমাজে প্রচলিত আছে যে শবেবরাতে ইবাদতের উদ্দেশ্যে যদি কেউ গোসল করে, তাহলে তার গোসলের প্রতি ফোঁটা পানির বিনিময়ে গুনাহ মাফ হবে। আবার কেউ কেউ বর্ণনাটি এভাবে বলে যে প্রতি ফোঁটায় ৭০ রাকাত নফল নামাজের সওয়াব হবে। এসব কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। শবেবরাত উপলক্ষে গোসল করার কোনো বিধান নেই। তবে এমনিতে কেউ শরীরের দুর্গন্ধ ইত্যাদি দূর করার জন্য গোসল করতে পারবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা