kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

মহামারি রোধে নববি নির্দেশনা

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মহামারি রোধে নববি নির্দেশনা

বর্তমান পরিস্থিতিতে সারা দুনিয়া যখন এক ভাইরাসের আক্রমণে হতবিহ্বল হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.) এর নির্দেশনা হচ্ছে—বিপদে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ও মহান রবের সামনে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। কারণ সংকট যত বড়ই হোক তার লাগাম তো তাঁরই হাতে। তাই এই সংকট কাটিয়ে এর জন্য মুমিনকে অনুসরণ করতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিকা। নিম্নে তেমনই কিছু নির্দেশিকা তুলে ধরা হলো—

 

আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নিন

মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা আনয়ন করে হাদিসে বর্ণিত দোয়া পাঠ করুন। সেই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকার দায়িত্বশীল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ মেনে চলুন। উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় তিনবার বলবে ‘বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মায়াসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা-ই ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম’। সকাল পর্যন্ত তার কোনো আকস্মিক বিপদ আসবে না। আর যে সকালে তা তিনবার পাঠ করবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ওপর কোনো হঠাৎ বিপদ আসবে না। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৮৮)

সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নবী ইউনুস (আ.) মাছের পেটে থাকাকালে যে দোয়া করেছিলেন তা হলো—‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জলিমিন’। যেকোনো মুসলিম লোক কোনো বিষয়ে কখনো এই দোয়া করলে অবশ্যই আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)

 

সর্বাবস্থায় সংকটের তীব্রতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকুন

আবু হুরাইরাহ (রা.) সূত্রে রাসুল (সা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, তোমরা ভয়ানক বিপদ, দুর্ভাগ্যের অতল তল, মন্দ পরিণতি এবং শত্রুর আনন্দ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও। (বুখারি, হাদিস : ৬৬১৬)

এ ক্ষেত্রে আমরা নববি আমলের অনুসরণ করতে পারি। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরূপ দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুযামি, ওয়া মিন সায়্যিয়িল আসক্বাম।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি শ্বেত রোগ হতে, পাগলামি হতে, খুজলি-পাঁচড়া হতে এবং দুরারোগ্য ব্যাধি হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৫৪)

 

বর্তমান সংকটে যথাসম্ভব ঘরেই অবস্থান করুন

একান্তই যদি বের হতে হয় তাহলে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা পোশাক পরিধান করুন ও গুরুত্বসহকারে রাসুল (সা.) কর্তৃক শিক্ষা দেওয়া দোয়া পাঠ করুন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবে, ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ তখন তাকে বলা হয়, তুমি হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছ, রক্ষা পেয়েছ ও নিরাপত্তা লাভ করেছ। (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৫)

 

সর্বাবস্থায় পবিত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করুন

মহামারির সংক্রমণ প্রকাশ পাওয়া এলাকায় যাতায়াত থেকে বিরত থাকুন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সেখান থেকে চলে এসো না, অন্যদিকে কোনো এলাকায় মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫)। চিকিৎসাবিজ্ঞানও আজ ঘোষণা করছে যে, আক্রান্ত এলাকায় এমন অনেক লোক থাকেন যারা মনে করেন তাদের মধ্যে সেই রোগ নেই। অথচ সেই রোগের জীবাণু তাদের মধ্যে রয়েছে। তারা যদি সেখান থেকে বের হয়ে অন্যত্র গমন করে, তাহলে সেই রোগটি তার মাধ্যমে অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। রাসুল (সা.) কত বড় দূরচিন্তক যে তিনি আমাদেরকে তখনই সতর্ক করে গিয়েছেন।

তাই আমাদের উচিত যেখানে coronavirus নামক এই মহামারির প্রকোপ ইতোমধ্যে আঘাত হেনেছে, সেখানে না যাওয়া। আর কোথাও কেউ সংক্রমিত হয়ে গেলে সেখানেই অবস্থান করে যথাসাধ্য চিকিৎসা গ্রহণ করা। আর বেশি বেশি করে ইস্তিগফার পাঠ করা।

 

রাতে সাধ্যমতো নফল নামাজ আদায় করুন

বিলাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা অবশ্যই রাতের ইবাদত করবে। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের নিত্য আচরণ ও প্রথা। রাতের ইবাদত আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের উপায়, পাপকর্মের প্রতিবন্ধক, গুনাহসমূহের কাফফারা এবং দেহের রোগ দূরকারী। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪৯)

 

খাদ্য পানীয় গ্রহণে সর্বোচ্চ সতর্ক হোন

নিজের পানপাত্রগুলো ঢেকে রাখুন। ব্যবহার্য পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছু শতভাগ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করুন। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা বাসনগুলো আবৃত রাখবে এবং মশকসমূহের মুখ বেঁধে রাখবে। কারণ বছরে একটি এমন রাত আছে, যে রাতে মহামারি অবতীর্ণ হয়। যেকোনো খোলা পাত্র এবং বন্ধনহীন মশকের ওপর দিয়ে তা অতিবাহিত হয়, তাতেই সে মহামারি নেমে আসে। (মুসলিম, হাদিস : ৫১৫০)

 

সর্বদা মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন

কারণ তিনি চাইলে আপনি যত চেষ্টাই করুন এ থেকে পরিত্রাণ পাবেন না। আর তিনি না চাইলে কোনো কিছুই আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এ বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে লালন করে রবের গোলামিতে বেশি করে আত্মনিয়োগ করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি করে তাওবা করে নিজেদের ব্যক্তিজীবনে পরিশুদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে এই মহামারি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : অনুবাদক ও মুহাদ্দিস

ফকিরের বাজার, নেত্রকোনা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা