kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

ভাগ্যে বিশ্বাস বলতে কী বুঝি

মুফতি মুহাম্মাদ ইসমাঈল   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাগ্যে বিশ্বাস বলতে কী বুঝি

আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস রাখা যেমন ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ, তেমনি ভাগ্যের প্রতি বিশ্বাস রাখাও ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো বান্দাই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না এই চারটি কথায় বিশ্বাস রাখে—(ক) এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল। তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন। (খ) মৃত্যুতে বিশ্বাস রাখবে। (গ) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস রাখবে। (ঘ) ভাগ্যে বিশ্বাস রাখবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২১৪৫)

 

ভাগ্য কাজের কারণ নয়

ভাগ্য লিপিবদ্ধ আছে বলেই মানুষ ভালো-মন্দ করছে—বিষয়টি এমন নয়; বরং মানুষ এমন করবে জেনে আল্লাহ তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। বিষয়টি বোধগম্য করার জন্য একটি উদাহরণ পেশ করা যায় : একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার তাঁর রোগীর অবস্থা জানেন বলে তাঁর ডায়েরিতে লিখে রাখলেন যে, এ রোগী অমুক সময় অমুক অবস্থায় মারা যাবে। অবশেষে যদি তাই হয়, এ ক্ষেত্রে ডাক্তারের লিখন তার মৃত্যুর কারণ নয়। ঠিক তদ্রূপ আল্লাহ মানুষের অবস্থা জানেন বলে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এ লিপিবদ্ধকরণও মানুষের কাজের কারণ নয়। মানুষের কাজের কারণ মানুষের ইচ্ছা বা সংকল্প।

 

মানুষ পূর্ণ স্বাধীনও নয়, পূর্ণ অক্ষমও নয়

সব বস্তুর স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা। মানুষের কর্মের স্রষ্টাও আল্লাহ তাআলাই। কিন্তু মানুষ আপন কর্মের কর্তা। পার্থক্য হলো ‘আল্লাহ তাআলা হলেন কাজের স্রষ্টা, আর মানুষ হলো সে কাজের কর্তা।’ সুতরাং একদিকে মানুষ যেমন ‘মুখতারে কুল’ বা সম্পূর্ণ স্বাধীনও নয়, অন্যদিকে মানুষ তেমনি ‘মাজবুরে মাহাজ’ বা সম্পূর্ণ অক্ষমও নয়। তাই সত্কর্মে তাদের পুরস্কৃত করা হবে। অসত্কর্মে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। আর এতে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচার ও ন্যায়বিচারক হওয়াও বহাল থাকে।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) বলেন, বান্দার এখতিয়ার বা স্বাধীনতা তো আছে। তবে এই এখতিয়ার বা স্বাধীনতা আল্লাহর এখতিয়ারের অধীন। অর্থাৎ কর্মের ইচ্ছা এবং কর্মের শক্তি মানুষের মধ্যে আছে; কিন্তু এর সঙ্গে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটলে কোনো কিছুরই বহিঃপ্রকাশ ঘটবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের এবং তোমরা যা করো, তা-ও।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ৯৬)

 

ভাগ্যে বিশ্বাসী বিপদে সবর সুখে শোকর করে

তকদিরে বিশ্বাসী ব্যক্তি এ কথা নিশ্চিতভাবে জানে যে মানবজীবনে সুখ-দুঃখ, সফলতা ও ব্যর্থতা যা কিছু ঘটছে, সবই তকদিরে লিপিবদ্ধ আছে। তকদিরের বাইরে কিছুই ঘটছে না। তাই সুখ-দুঃখ কোনো অবস্থায়ই সে আল্লাহবিমুখ হয় না। বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং সুখের অবস্থায় তাঁর শোকর আদায় করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবীতে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে তা সংঘটিত করার আগেই লিপিবদ্ধ থাকে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এ জন্য যে তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা দুঃখিত না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য উল্লসিত না হও। আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২২-২৩)

 

তকদিরের সঙ্গে তদবিরের কোনো সংঘাত নেই

কার্য সম্পাদনের জন্য উপায়-উপকরণ অবলম্বন করাকে তদবির বলা হয়। উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা তকদিরে বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়। কেননা তকদিরে এ উপায়-উপকরণ অবলম্বনের কথাও লিখিত আছে। একবার এক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যে ঝাড়ফুঁক করে থাকি, চিকিৎসায় ওষুধ প্রয়োগ করে থাকি অথবা আত্মরক্ষার জন্য যে উপায় অবলম্বন করে থাকি, তা কি তকদিরের কোনো কিছুকে রদ করতে পারে? জবাবে রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের এসব চেষ্টাও তকদিরের অন্তর্গত। (তিরমিজি, হাদিস : ২১৪৮)

 

কর্মই ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক

তকদির বা ভাগ্য দুই প্রকার—মুবরাম ও মুআল্লাক। মুবরাম অর্থ স্থিরকৃত, মুআল্লাক অর্থ পরিবর্তনীয়। আল্লাহ তাআলা ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন, তিনি পরিবর্তন করারও ক্ষমতা রাখেন। ভাগ্য নেক আমল, পিতা-মাতার দোয়া ও দান-সদকা ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবর্তন হয়। ভাগ্য মানুষের অজানা বিষয়, আমরা জানি না তা স্থির নাকি পরিবর্তনীয়। সুতরাং আমাদের নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। নেক আমল করতে থাকা চাই। যাবতীয় কল্যাণকর বিষয়ের জন্য সদা চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে যাওয়া উচিত। রাব্বে কারিমের কাছে দোয়া করতে থাকতে হবে। তবেই তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আমাদের তকদিরকে সৌভাগ্যে পরিণত করে দেবেন। আর এ কথা মনে রাখা যে কর্মই ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)

ভাগ্য সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। তকদিরের ওপর ঈমান রাখা আবশ্যক। এ সম্পর্কে বিতর্ক নিরাপদ নয়। এ বিতর্ক অনেক ক্ষেত্রে কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। মহানবী (সা.) ভাগ্য নিয়ে বিতর্কে জড়াতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২১৩৩)

মহান আল্লাহ আমাদের বোঝার তওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা