kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

করোনাভাইরাস

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাগুলো শরিয়তবিরোধী নয়

আল্লামা আরশাদ রাহমানি   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাগুলো শরিয়তবিরোধী নয়

পৃথিবীর ইতিহাসে মানবজাতির ওপর অনেক দুর্যোগ ও বিপদাপদ এসেছিল। বর্তমানেও আসছে। এই বিপদের কারণ কী? একজন ঈমানদারের বিশ্বাসমতে, এই বিপদাপদ ও দুর্যোগের সৃষ্টিকারী আল্লাহ। আর অন্যদের বিশ্বাস হলো, এগুলো প্রাকৃতিক কারণে হয়। একজন বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর মধ্যে এটাই পার্থক্য।

আল্লাহর সৃষ্ট এই রহস্যময় দুনিয়ায় এমন অনেক জিনিস আছে, যেগুলো মানুষ আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা বুঝতে সক্ষম, আবার অনেক জিনিস আছে, যেগুলো মানুষ বুঝতে সক্ষম হয় না। কারণ আল্লাহ তাদের জ্ঞান যে পরিমাণ দিয়েছেন, তা সে রহস্যগুলো বোঝার উপযোগী নয়। ওই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য যে পরিমাণ জ্ঞান দরকার ছিল, তা মানুষের কাছে নেই।

 

সৃষ্টিজগতে আল্লাহর নিয়ম

আল্লাহ এই জগতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার জন্য কিছু মাধ্যম বানিয়েছেন। যেমন—আল্লাহ পৃথিবীকে আলোকিত করার জন্য একটা বাল্ব সৃষ্টি করেছেন, যার নাম সূর্য। আল্লাহর হুকুমে হাজার-লাখো বছর তা আমাদের উপকার করে যাচ্ছে, আমরাও কোনো রকম সার্ভিস চার্জ ছাড়া তা থেকে উপকৃত হচ্ছি। কখনো এমন হয়নি যে বাৎসরিক সার্ভিসিংয়ের জন্য কয়েক দিন সূর্যের তাপ কিংবা আলো বন্ধ ছিল। আল্লাহ এ ধরনের মাখলুকগুলোকে মানুষের উপকারার্থে এমনভাবে নিয়োজিত করে দিয়েছেন যে সেগুলো নিয়ানুযায়ী  বিরতিহীন কাজ করে যাচ্ছে। এর বিনিময়ে মানুষকে কোনো সার্ভিস চার্জ দিতে হয় না। এগুলো মেরামতের দায়দায়িত্বও মানুষের ওপর বর্তানো হয়নি। আল্লাহ চাইলে এই বিশাল সূর্য ছাড়াও মানুষকে আলো দিতে পারেন। এই বিশাল জগতে আলো দানকারী আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নন, কিন্তু আলো দিচ্ছেন সূর্যের মাধ্যমে।

তিনি মেঘ সৃষ্টি করেছেন, এই মেঘ সাগর থেকে পানি উত্তোলন করে উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে দৌড়াচ্ছে। যখন বৃষ্টি বর্ষণ করার আদেশ আসছে, বৃষ্টি বর্ষণ করছে। এভাবে চাঁদ, সূর্য, মেঘ, তারকা এসব কিছুই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আমরা ভাবি সব কিছু প্রাকৃতিকভাবে ঘটছে, এই প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তাও আল্লাহ। এই কথাগুলো শুনতে অনেক হালকা মনে হলেও এই বিশ্বাসগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের চৌরাস্তা। এখানে জান্নাতি ও জাহান্নামিদের আলাদা করা হয়।

 

ঈমান কিভাবে বৃদ্ধি পাবে

হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) ষষ্ঠ হিজরিতে মদিনা থেকে মক্কায় এসেছেন ওমরাহ করার জন্য, তখনকার মক্কার সরকার রাসুল (সা.)-কে মক্কায় ঢুকতে দিলেন না। তাঁরা একটি জায়গায় অবস্থান করলেন, রাতে ভীষণ বৃষ্টি হলো। পরদিন সকালে রাসুল (সা.) বলেন, গত রাতের বৃষ্টিতে যারা ঈমানদার তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেয়েছে, আর যারা কাফের, তাদের কুফুরির মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, যারা বলেছেন, (যারা মেঘ কিংবা তারকার চিন্তা না করে) আল্লাহর রহমতে বৃষ্টি হয়েছে, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে। আর যারা বলেছে, নক্ষত্রের গতিবিধির ওপর নির্ভর করে, শুধু তাকে বৃষ্টির কারণ ভেবে বলেছে, নক্ষত্রের কারণেই বৃষ্টি হয়েছে। তাদের কুফর বৃদ্ধি পেয়েছে। কেউ যদি এ ধারণা পোষণ করে যে মহান আল্লাহ মেঘমালাকে এদিকে এনেছেন, নক্ষত্রের অবস্থানকে এভাবে করে বৃষ্টি দিয়েছেন, তাহলে তো সে ঈমানদার। তবে কেউ যদি আল্লাহকে বাদ দিয়ে তার বানানো মাধ্যমগুলোকেই মূল কারণ হিসেবে বিশ্বাস করে, তবে তার কুফর আরো বৃদ্ধি পাবে।

 

দুর্যোগ পাপাচারের সম্পর্ক

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের প্রতি যে মুসিবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)

অর্থাৎ আল্লাহ বলেন, ‘মুসিবত যেকোনো পর্যায়েরই হোক না কেন, তা তোমার কারণে।’ অন্য আয়াতে আছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কিছু কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৪১)

কোরআন অবতীর্ণ করার সময় আল্লাহ বলেছেন, জলে হোক, স্থলে হোক, পানিতে হোক এমন কোনো জায়গা থাকবে না, যেখানে আল্লাহর নাফরমানি হবে না। আপনারা যাঁরা আকাশ সফর করেছেন, বলেন তো আকাশ সফরে আল্লাহর নাফরমানি দেখেছেন কি না? অবশ্যই হচ্ছে। এ কারণে জলে হোক, স্থলে হোক, পানিতে—সর্বত্রই অশান্তি আর অশান্তি বিরাজ করবে। মানুষের কৃত গুনাহের কারণে।

ওপরে উল্লিখিত সুরা শুরার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন’। অর্থাৎ মানুষ সর্বদা যত গুনাহ করে, আল্লাহ সব গুনাহের জন্য পাকড়াও করেন না, হয়তো পাঁচ লাখ গুনাহের মধ্যে একটির পাকড়াও করেন। কিন্তু বেশির ভাগই তিনি ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ যদি বান্দার সব গুনাহ ধরতেন, তবে এই পৃথিবীতে কোনো মানুষ পাওয়া যেত না। কেননা মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, নিশ্চয়ই তোমার রবের পাকড়াও অনেক কঠিন। (সুরা : বুরুজ, আয়াত : ১২)

অতএব আমরা বুঝতে পারি যে দুনিয়ায় যত দুর্যোগ ও অশান্তির সৃষ্টি হয়, তা আমাদের নাফরমানি ও বদ আমলের কারণে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের মহান রবের কাছেই ফিরে যেতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল।’ (সুরা : নূহ, আয়াত : ১০)

আল্লাহ বলেন, বান্দা তোমরা তাওবা করো। তোমরা তাওবা করতে যত সময় লাগবে, আমার ক্ষমা করতে তত সময় লাগবে না। এরপর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন, ‘তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন, আর দেবেন নদী-নালা’। (সুরা : নূহ, আয়াত : ১১-১২)

 

সব কিছু সচল করতে তাওবা

এখন আমাদের সব কিছু অচল হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন, তোমরা তাওবা করো, আমি সব কিছু সচল করে দেব। এ জন্য কোনো কিছুতেই অতিরঞ্জিত করা ভালো নয়, আতঙ্ক ছড়ানো ভালো নয়। বরং আমরা এ বিষয়গুলো আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিই, আমরা আমাদের কাজ করি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সতর্ক হতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আমাদের যে নির্দেশনাগুলো দেওয়া হয়েছে, যা এ যাবৎ গণমাধ্যমে এসেছে, সেগুলো শরিয়তবিরোধী নয়। তাই আমরা সেগুলো পালন করব। পাশাপাশি আমাদের মূল কাজ হবে আল্লাহর কাছে তাওবা করা। আল্লাহ সব কিছু সমাধান করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।

লেখক : পরিচালক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা