kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা, পরিচ্ছন্নতা ও ইসলাম

জাভেদ চৌধুরি   

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনা, পরিচ্ছন্নতা ও ইসলাম

সাম্প্রতিক চলমান আতঙ্ক সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের মাধ্যমে ইসলামের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা আবারও প্রমাণিত হলো। মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরির এমন পরিস্থিতি আগে কখনো ঘটেনি। মা তার সন্তানকে, স্বামী তার স্ত্রীকে, ভাই ভাইকে ও বোন বোনকে স্পর্শ করতে না পারার ভয়ংকর অবস্থা বিশ্বে এবারই প্রথম। ডাক্তার রোগীর গায়ে হাত দিতে চায় না! রোগী ডাক্তারের হাঁচি শুনে আতঙ্কে আঁতকে ওঠে। ইমাম ও মুসল্লি পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে আতঙ্কে। এমন স্বার্থপর পৃথিবী আগে কি কেউ দেখেছে? আশ্চর্যের বিষয় হলো পৃথিবীর বুকে এই প্রথম সব ধর্মালম্বীদের উপাসনালয় বন্ধ। বিয়ে-শাদী, জানাজা ইত্যাদি বাধাগ্রস্ত। সরকারের প্রতি জনগণের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অনেক রাষ্ট্র আজ অবরুদ্ধ। ধনী-গরিব, বিচারক-অপরাধী, অফিসার-কর্মকর্তা, রাজা-প্রজা—সবার মাঝেই বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক ও উত্কণ্ঠা। তবে এই ভীতিকর পরিবেশেও নিজেকে চেনার মতো অসংখ্য ইতিবাচক দিক আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে এই ভাইরাস শরীরের সাতটি অঙ্গ দিয়ে ঢুকে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করে। আর এর থেকে বেঁচে থাকার বড় মাধ্যম হচ্ছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। যা ইসলাম ধর্মের মৌলিক অনুষঙ্গ। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। (মুসলিম, হাদিস : ২২৩)

এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেছেন ,‘আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন। পরিচ্ছন্ন ও পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৭৯৯)

মুসলিমরা দিনে পাঁচবার অজু করে, প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রা সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থাকে সর্বোচ্চ। দুপুরের পর থেকে ওই মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। রাতের দিকে প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি দুপুরের পর থেকে বেশি ক্লান্তি অনুভব করে। দেখুন, শরীরের পরিছন্নতা দিনের দুই-তৃতীয়াংশের পর থেকে বেশি প্রয়োজন দেখা দেয়। এই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে  জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার অজু করে মুসলমানরা, যে সময়টাতে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রা নিচে নামতে থাকে। মুসলমানদের এ অজু করার কারণে শরীরের সাতটি ছিদ্রে ভাইরাস প্রবেশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে—স্ত্রী সহবাসের পরক্ষণেই তাদের আবশ্যকীয় গোসল করতে হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে (গোসল করে) পবিত্র হও। যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা  থেকে আগমন করে অথবা তোমরা স্ত্রী-সহবাস করো এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো; তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ করো। আল্লাহ তোমাদের কোনো প্রকার কষ্ট দিতে চান না; বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৬)

আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) যখন জানাবাতের (শারীরিক অপবিত্রতা) গোসল করতেন, প্রথমে তাঁর হাত দুটো ধুয়ে নিতেন। তারপর নামাজের অজুর মতো অজু করতেন। আর আঙুলগুলো পানিতে ডুবিয়ে চুলের গোড়ালি পর্যন্ত খিলাল করতেন। তারপর তার দুই হাতের তিন আজলা পানি মাথায় ঢেলে সারা শরীরের ওপর পানি পৌঁছে দিতেন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৮)

এমনকি সপ্তাহে একবার নখ কাটা, শরীরের অতিরিক্ত পশম পরিষ্কার করা মুমিনদের আবশ্যকীয় কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের স্বভাবজাত বিষয় পাঁচটি: ১. সুন্নতে খতনা। ২. নাভির নিচের পশম কাটা। ৩.বগলের নিচের পশম কাটা। ৪. নখ কাটা।  এবং ৫. গোঁফ ছোট করা। (বুখারি, হাদিস : ৫৮৮৯)

ওপরের সব দিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও  পরিচ্ছন্নতার সর্বোচ্চ পন্থা। সত্যিই পুরো বিশ্বের সব ধর্ম প্রচারকরা  যা করতে পারেনি এক করোনাই তা করে দেখিয়েছে। করোনা আক্রান্তদের ডাক্তাররা আরো যেসব চিকিৎসা দিয়ে থাকেন তার মধ্যে একটি হলো দৈনিক আট থেকে দশ ঘণ্টা ঘুমানো। রাতে হালকা খাবার খাওয়া। এ দুটি বিষয়েও ইসলামের  নির্দেশনা রয়েছে। রাসুল (সা.) এশার নামাজের পর অযথা গল্পগুজব ও গভীর রাত পর্যন্ত সময় নষ্ট না করে দ্রুত ঘুমানোর তাগিদ দিতেন। (মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস : ৪৮৭৯)

খাবার প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ পেট থেকে অধিক নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে এমন কয়েক গ্রাস খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৮০)

তাই পর্যাপ্ত ঘুম ও হালকা খাবার গ্রহণ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। যা আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ শ বছর আগেই ইসলাম মানুষকে জানিয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আক্রান্ত দেশগুলোর অধিকাংশ মানুষ রাত্রি জাগরণ করে। আবার শরীরের পরিচ্ছন্নতার প্রতিও তাদের রয়েছে যথেষ্ট উদাসীনতা। ফ্রান্স-ইতালির মানুষের হাত-মুখ ধোয়ার অভ্যাস খুবই কম। সেসব দেশে সকালে মেট্রোরেলে সফরের সুযোগ যদি কারো হয় তাহলে দেখবেন মানুষ থুতু দিয়ে চোখ মুছে নিচ্ছে। বিশেষত মহিলারা সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধোয়া ছাড়াই অফিসে বের হয়ে পড়ে। খাবারের আগে-পরে হাত না ধোয়া,  টয়লেট শেষে পানি ব্যবহার না করে শুধু  টিস্যু ব্যবহার করা এবং গভীর রাত পর্যন্ত সজাগ থাকা এদের বদ স্বভাবে পরিণত হয়েছে। যার ফলে পৃথিবীতে কোনো ভাইরাস দেখা দিলে এরাই বেশি আক্রান্ত হয়। আলহামদুলিল্লাহ, পরিচ্ছন্নতায় এগিয়ে থাকার কারণে মুসলিম দেশগুলোতে এই ভাইরাসের ভয়াবহতা অনেক কম। তবে আত্মতৃপ্তিতে বসে থাকার সুযোগ নেই। কারণ অনেক মুসলিম ইসলামকে শুধু কোরআন-হাদিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। ইসলামকে তারা ব্যাবহারিক জীবনে চর্চা করে না। আল্লাহ আমাদের সঠিক ইসলাম বুঝে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।

ভাষান্তর : মুফতি ইবরাহীম সুলতান

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা