kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা সংক্রমণ ও ইসলামের শিক্ষা

মো. মাসুদুর রহমান   

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা সংক্রমণ ও ইসলামের শিক্ষা

করোনা নামক ঘাতক ভাইরাসে মানুষ মৃত্যুর ভয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে ছুটছেন। যেকোনোভাবে নিজের ও তাঁদের জীবন নিরাপদ রাখতে চান সবাই। এ সময় অনেক ব্যক্তি বিদেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। হয়তো তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল করোনা সংক্রমণ এড়ানো অথবা দেশে ছুটি উপভোগ করা। বিদেশ থেকে আগতদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন; আবার তাঁদের মাধ্যমে কিছু স্বজনও সংক্রমিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। মানুষ দেশের মধ্যে আক্রান্ত স্থান থেকেও অন্যত্র পালাচ্ছে। শুধুই ছোটাছুটি। আল্লাহ জানেন, আমাদের পরিণতি কী হবে! মানুষ কি পারবে আল্লাহর আজাব বা গজব এড়াতে?

আমরা ফেরাউন সম্প্রদায়ের ওপর বিভিন্ন আজাবের কথা পবিত্র কোরআন থেকে জানতে পারি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং তাদের ওপর পাঠিয়ে দিলাম তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত প্রভৃতি নিদর্শন একের পর এক।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৩৩)

এ আজাবগুলো প্রতিটি পৃথকভাবে এসেছিল এবং নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বজায় থেকে একের পর এক রহিত হয়ে গিয়েছিল। তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে যে ফেরাউন সম্প্রদায়ের ওপর প্লেগের মহামারি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং যাতে তাদের ৭০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ সেটা ছিল খোদায়ি আজাব।

মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে মানুষ যে ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল, এমন একটি ঘটনার বিষয়ে আমরা পবিত্র কোরআনে দেখতে পাই। ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি কি তাদের দেখনি, যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল? অথচ তারা ছিল হাজার হাজার। তারপর আল্লাহ তাদের বলেন, মরে যাও। তারপর তাদের জীবিত করে দিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের ওপর অনুগ্রহকারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক শুকরিয়া প্রকাশ করে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৪৩)

এ আয়াতের তাফসির থেকে জানা যায়, বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের প্রায় ১০ হাজার লোক কোনো শহরে বসবাস করত। সেখানে এক মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব হয়। তখন লোকজন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সে শহর থেকে পলায়ন করে পার্শ্ববর্তী দুই পাহাড়ের মাঝে প্রশস্ত স্থানে গিয়ে বসবাস করতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদের কাছে দুজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা দুজন প্রশস্ত ময়দানের দুই দিকে অবস্থান করে এমন বিকট শব্দ করলেন যাতে সবাই মরে গেল। কোনো ব্যক্তিই আর জীবিত রইল না।

এ খবর পাশের লোকেরা যখন জানতে পারল এবং গিয়ে দেখল যে তারা সবাই মৃত্যুবরণ করেছে। তখন তাদের পক্ষে এত বিশালসংখ্যক মৃতের দাফন-কাফন করার সাধ্য ছিল না। তাই তারা প্রশস্ত মাঠের চারদিকে দেয়াল নির্মাণ করে দিল। স্বাভাবিকভাবে মৃতদেহগুলো পচে গেল এবং হাড়-কঙ্কাল তেমনি পড়ে রইল। অনেক দিন পর সে স্থান থেকে বনি ইসরাইলের একজন নবী হিজকিল (আ.) সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় এত হাড়-কঙ্কাল একত্রে অল্প স্থানে দেখে বিস্মিত হলেন। তিনি আল্লাহর কাছ থেকে ওহির মাধ্যমে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হলেন। অতঃপর তিনি আল্লাহর কাছে তাদের জীবিত করে দেওয়ার জন্য দোয়া করলেন। মহান আল্লাহ তাঁর নবী হিজকিল (আ.)-এর দোয়া কবুল করে তাদের প্রত্যেককে জীবিত করে দিলেন। তারা সবাই হিজকিল (আ.)-এর সামনে জীবিত হয়ে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয় এবং আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে।

তাই আমরা বলতে পারি, কোনো স্থানে কোনো মহামারি কিংবা কোনো মারাত্মক রোগ-ব্যাধি দেখা দিলে সেখান থেকে পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে জীবন বাঁচানো যায় না; যদি না আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন। এ বিষয়ে হাদিসের নির্দেশনা এমন : ‘যখন তোমরা কোনো এলাকায় প্লেগের  প্রাদুর্ভাবের সংবাদ শোনো, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ কোরো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান করো, তথায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।’ (বুখারি হাদিস : ৫৩১৭ )

মহামারি অভিনব কোনো বিষয় নয়। ইসলামের অন্যতম খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলে এক ভয়াবহ মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। তিনি সিরিয়া যাওয়ার উদ্দেশে বের হন। এরপর তিনি ‘সারগ’ নামক স্থানে পৌঁছলে তাঁর কাছে সংবাদ এলো যে সিরিয়া এলাকায় মহামারি দেখা দিয়েছে। তখন আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) তাঁকে অবহিত করলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমরা কোনো স্থানে এর প্রাদুর্ভাবের কথা শোনো, তখন সে এলাকায় প্রবেশ কোরো না; আর যখন এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, আর তোমরা সেখানে বিদ্যমান থাকো, তাহলে সেখান থেকে পলায়ন করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেয়ো না।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৫৩১৯)

তবে মহামারিতে মুমিনের মনোবল সতেজ থাকা জরুরি। এ সময় একান্ত করণীয় হলো, ধৈর্যধারণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। যথাসম্ভব উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা। কেননা মহামারি আজাব হিসেবে পৃথিবীতে আসে; কিন্তু তা ঈমানদারের জন্য রহমতে পরিণত হয়।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। আল্লাহর নবী (সা.) তাঁকে অবহিত করেন, এটি হচ্ছে এক ধরনের আজাব। আল্লাহ যার ওপর তা পাঠাতে ইচ্ছা করেন, পাঠান। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দেন। অতএব প্লেগ রোগে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধারণ করে এবং এই বিশ্বাস নিয়ে আপন শহরে অবস্থান করতে থাকে যে আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন তা ছাড়া কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না; তাহলে সেই বান্দার জন্য শহীদ ব্যক্তির সওয়াবের সমান সওয়াব। (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৫৩২৩)। 

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘প্লেগ রোগের কারণে মৃত্যুবরণ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শাহাদাত হিসেবে গণ্য হবে।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৫৩২১ ও ৫৩২২)

এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মহামারির কারণে কোনো মুসলমান মারা গেলে তিনি শহীদের মর্যাদা পাবেন, যদি তিনি অধৈর্য হয়ে ওই স্থান ত্যাগ না করেন।

এটাই স্পষ্ট যে দুনিয়াতে আগেও মহামারি ছিল, এখনো আছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে অতি আধুনিক সময়ে কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন বা সোশ্যাল ডিসট্যান্সের প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.)ই সর্বপ্রথম ১৪০০ বছর আগে এর প্রয়োগ করেছেন। ওপরে উল্লিখিত হাদিসগুলো সেটাই প্রমাণ করে।

এই বিচ্ছিন্ন থাকার বেশ কয়েকটি কারণ আছে—

প্রথমত, এ এমন হতে পারে যে সেখানে যাওয়ার পর কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার আত্মীয়-স্বজনের এমন ধারণা হতে পারে যে সেখানে না গেলে ওই ব্যক্তি মরত না। অথচ সেখানেই তার মৃত্যু নির্ধারিত ছিল। এ বর্ণনার মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমানের বিষয়ে সন্দেহ বা সংশয় থেকে রক্ষা করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ওই স্থান ত্যাগ না করতে বলার কারণ হলো, কেউ যদি ওই মহামারির স্থান ত্যাগ করে, তাহলে আরো বহু মানুষের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

এবার বর্তমানের করোনা পরিস্থিতির সঙ্গে কথাগুলো মিলিয়ে নিতে পারেন। কারণ ইসলামে প্রত্যেক মানুষের নিজের জীবনের হেফাজত করা ওয়াজিব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

একজন বিশ্বাসী মুসলমান হিসেবে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমাদের অবশ্যই মরতে হবে। মৃত্যুর বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন সুরার বিভিন্ন আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। এক আয়াতে এসেছে, ‘আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ মরতে পারে না। কেননা, মৃত্যুর জন্য একটা সময় নির্ধারিত আছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৫)

আমরা কি মৃত্যু থেকে পালিয়ে পরিত্রাণ পেতে পারব? অবশ্যই না। তবে আমাদের সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। কারণ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো কোনো স্থানে যাওয়া কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ হতে পারে না, আবার কোনো স্থান থেকে পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়াও মৃত্যু থেকে বেঁচে থাকার উপলক্ষ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। মহামারির ভয়ে পালিয়ে গিয়ে যেমন জীবন বাঁচানো যায় না, তেমনি মহামারিগ্রস্ত স্থানে অবস্থান করাও মৃত্যুর কারণ হতে পারে না। মৃত্যুর একটি সুনির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যার কোনো ব্যতিক্রম হওয়ার নয়।

তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে হবে। আল্লাহর কাছে এমন পরিস্থিতিতে সাহায্য চাইতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

লেখক : উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস্), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা