kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৬  মে ২০২০। ২ শাওয়াল ১৪৪১

হা দি সে র নি র্দে শ না

নিজের ও অন্যের ক্ষতি কোরো না

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা   

৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিজের ও অন্যের ক্ষতি কোরো না

উবাদা বিন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ফায়সালা দেন অনুমোদিত নয় নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং অন্যকেও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৪০)

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে অপর বর্ণনায় এসেছে, ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্যও করা যাবে না। যে অন্যের ক্ষতি করল আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে তার সঙ্গে শত্রুতা করবে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস: ৩০৭৯)

 

‘ক্ষতি’ প্রতিহত করা ইসলামের মূলনীতি

আলোচ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনদের সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সে নিজেকে যেমন ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে, তেমনি অন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকবে। মোল্লা আলী কারি (রহ.) বলেন, ‘এই কথা স্পষ্ট যে শারীরিক, আর্থিক, পার্থিব ও পরকালীন সব ধরনের ক্ষতি এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।’ (মিরকাতুল মাফাতিহ : ৮/৩১৫৬)

ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতি দূর করা। এই ভিত্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ‘অনুমোদিত নয় নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং অন্যকেও।’ কেননা ইসলামী শরিয়তের ভিত্তি রাখা হয়েছে ‘কল্যাণ লাভ’ ও ‘ক্ষতি প্রতিহত’ করার ওপর। এই নীতির অন্তর্ভুক্ত বিধান হলো ক্ষতির সম্ভাবনা দূর করা এবং ক্ষতি অপরিহার্য হলে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিষয়টি বেছে নেওয়া। (ইসালুস সালিক ফি উসুলিল ইমাম মালিক, পৃষ্ঠা : ৬৪)। উল্লিখিত হাদিসের আলোকে হাদিস বিশারদগণ কয়েকটি শাখাগত বিধান বর্ণনা করেছেন। তা হলো—

এক.      ক্ষতিকর ও হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে নিজেকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেওয়া হারাম।

দুই.      অন্যের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ।

তিন.     জীবন, সম্পদ, পরিবার ও সম্ভ্রম সব ধরনের ক্ষতিকর বিষয় পরিহারযোগ্য।

চার.     ইসলামী শরিয়তের অন্যতম ‘মাকসাদ’ বা উদ্দেশ্য হলো ক্ষতি হওয়ার আগে প্রতিহত করা এবং ক্ষতি হয়ে গেলে তা দূর করা।

পাঁচ.     ইসলামী শরিয়তের সাধারণ বিধান হলো ক্ষতিকর বিষয় নিষিদ্ধ। (https://www.alukah.net/sharia/0/105491/)

 

ইবাদতে ক্ষতি প্রতিহত করার দৃষ্টান্ত

ইসলামী আইন ও বিধি-বিধানবিষয়ক বইগুলোয় মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে ইসলামের মৌলিক বিধানেও ‘রুখসত’ বা অবকাশ দেওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন অসুস্থ ব্যক্তির জন্য অজুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করা, দাঁড়ানোর পরিবর্তে বসে নামাজ আদায় করা, মুসাফিরের জন্য ফরজ রোজা কাজা করা, রাস্তার নিরাপত্তার অভাবে হজ বিলম্বিত করার অবকাশ ইত্যাদি।

 

ক্ষতির ভয় থাকলে বৈধ বিষয়ও পরিহারযোগ্য

যদি কোনো বৈধ কাজে অন্যের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তবে তা পরিহারযোগ্য। পবিত্র কোরআন থেকে এর দুটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে। ক. বৈবাহিক সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করা ইসলামী শরিয়তের মূল প্রত্যাশা। কিন্তু তা যদি অন্যের ক্ষতির কারণ হয়, তবে তা দীর্ঘায়িত করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু তাদের ক্ষতি করে সীমা লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে তাদের আটকে রেখো না।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত :  ২৩১)

দুই. ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী শিশুরা অন্য খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মা চাইলে সন্তানকে পিতার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাতে যদি পিতা বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে তা করা যাবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো পিতাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না এবং উত্তরাধিকারীরও অনুরূপ কর্তৃব্য।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত : ২৩৩)

 

নিজের ক্ষতি কোরো না এবং অন্যের

ইসলামী শরিয়ত নিজের ও অন্যের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছে। যেমনটি আলোচ্য হাদিসে বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দিয়ো না।’ (সুরা :বাকারা, আয়াত : ১৯৫)

অন্যের ক্ষতি করার ব্যাপারে শায়খ আবদুর রহমান বিন নাসির আস-সাদি (রহ.) বলেন, ‘ইসলামী শরিয়তে ক্ষতি নিষিদ্ধ। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্য কথা, কাজ বা অন্য কোনোভাবে কোনো মুসলিমকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বৈধ নয়। তাতে সে লাভবান হোক বা না হোক। এটি সবার জন্য প্রযোজ্য। বৈধ নয় মুসলমানের পথে বা বাজারে এমন কিছু রাখা বা করা, যাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন ডাল পুঁতে দেওয়া, কূপ কনন করা ইত্যাদি।’ (আল কাউয়াইদু ওয়াল উসুলুল জামিআহ, পৃষ্ঠা ৯৯)

 

ক্ষতিকারীর জন্য অভিশাপ

যারা অন্যদের ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয় হাদিসে তাদের অভিশপ্ত বলা হয়েছে। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের ক্ষতিসাধন করে বা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সে অভিশপ্ত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৪১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে অন্যের ক্ষতি করে আল্লাহ তার ক্ষতি করেন এবং যে অন্যের শত্রুতা করে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৬৩৫)। সুতরাং মুমিনের উচিত নিজেকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা এবং অন্যকেও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা।

লেখক : সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা