kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এক আলেমের ঐতিহাসিক সংলাপ

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এক আলেমের ঐতিহাসিক সংলাপ

মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী আল-আযহারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য একজন মানুষ। তাঁর আরো পরিচয় আছে। তিনি গণভবন ও সচিবালয় মসজিদের ভূতপূর্ব ইমাম ও খতিব। তিনি বাংলাদেশ জমিয়াতুল মুদাররেসিনের সাবেক সভাপতি, তিনি বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সভাপতি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লেখক, গবেষক ও সম্পাদক। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর একটি ঐতিহাসিক সংলাপের কথা তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় তুলে ধরেছেন। পাঠকের জন্য সেটির ভাষ্য তুলে ধরা হয়েছে

 

বাইরে থেকে অনেকেই ধারণা করে থাকেন, বঙ্গবন্ধু বুঝি খুবই একগুঁয়ে লোক, যুক্তির চেয়ে গায়ের জোরেই বুঝি তিনি বেশি কথা বলতেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যাঁরা মিশেছেন, তাঁদের ধারণা এমনটি হওয়ার কথা নয়। আমার সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় অনেক সময় আমিই বরং চড়াও হয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু তিনি পরম ধৈর্য সহকারে শুনে গেছেন। এমনকি একপর্যায়ে মাথা নিচু করে দিয়ে বলেছেন, ঠিক এভাবে তো ব্যাপারটি আমি কোনো সময় চিন্তা করিনি মওলানা সাহেব!

অথবা তাঁর নয়ন-জুড়ানো একটি হাসি দিয়ে বলেছেন, এ জন্যই তো আপনাকে আমার এত ভালো লাগে মওলানা সাহেব! আপনার এ সূক্ষ্ম সৃষ্টি সত্যিই অপূর্ব!

সর্বপ্রথম যখন ১০ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলার বুকে পদার্পণ করেন, তার অল্প কয়দিনের মধ্যেই জমিয়াতুল মুদাররিসিনের প্রতিনিধিদল আমারই নেতৃত্বে পুরনো গণভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাত্কারে মিলিত হয়। তিনি আমাদের বিশেষ করে আমাকে ও মওলানা ওয়ারিছুদ্দীন মরহুমকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে চিত্কার করে বলে উঠলেন : আমার মওলানা সাহেবরা আমাকে দেখতে এসেছেন!

আমরা তখন তাঁর কাছে মাদরাসা শিক্ষার দুরবস্থার চিত্রটি তুলে ধরলাম। মাদরাসাগুলো বন্ধ। ছাত্রদের রাজাকার বলে আর শিক্ষকদের দালাল বলে সর্বত্র বিড়ম্বনা করা হচ্ছে। অথচ এর জন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণেরও প্রয়োজন হচ্ছে না। দাড়ি-টুপি থাকলেই হলো। এমন অবস্থায় ছাত্র-শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে মাদরাসাগুলো বিরান হয়ে যাচ্ছে!

তিনি আফসোস করে বললেন, হায়! এ কথাগুলো তো কেউ আমাকে বলছে না! আমি বললাম : এ কথাগুলো আপনার কাছে বলার জন্যই তো গোটা দেশের আলেম-ওলামা (তখন ৩০-৪০ জন উপস্থিত ছিলেন) আমাকে নিয়ে আপনার দরবারে হাজির হয়েছেন! তিনি এই অবস্থার প্রতিকারের আশ্বাস দিলেন।

এ ব্যাপারে জমিয়াতুল মুদাররেসিনের মুখপাত্র (সভাপতি/পরে সাধারণ সম্পাদক) হিসেবে আমি অনেকবার আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিকভাবে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হয়েছি। প্রথমবারেই আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুজিব ভাই! (তখন আমরা তাঁকে এভাবেই সম্বোধন করতাম) এ দেশের দুই লাখ মসজিদের দুই লাখ ইমাম, দুই লাখ মুয়াজ্জিন, তাঁদের চার লাখ সহধর্মিণী আর কম করে হলেও অন্তত প্রতি ইমামের ১০ জন করে অনুসারী ও তাঁদের দু-চারটি করে সন্তান যদি আপনাকে তথা আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতেন বা বিরুদ্ধে তাদের ভোটগুলো প্রয়োগ করতেন, তাহলে এত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে আপনি জিতলেন কী করে? তাহলে হয় আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে এরাও আপনার নৌকায় বিপুলসংখ্যক ভোট দিয়েছেন, নতুবা আপনাদের পক্ষে ভোট কারচুপি হয়েছে।

তিনি বললেন, মাওলানা সাহেব! আপনারা সবাই দোয়া না করলে আর ভোট না দিলে আমরা কি জয়ের মুখ দেখতে পারতাম? আমি বললাম, শুধু তা-ই নয়, আপনার পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তির জন্য আমাদের অনেকেই দোয়া করেছেন, রোজা রেখেছেন। তিনি বললেন, তা না হলে ওই জল্লাদের কারাগার থেকে আমার তো জীবন্ত আসার কথা ছিল না।

আমি বললাম, আমাদের আলেম সমাজের অল্প কিছু লোক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু ৯৫ শতাংশ মানুষ ইমাম বা মাদরাসা শিক্ষক, তো এ ব্যাপারে একেবারেই নির্বিকার। তাঁরা তাঁদের মসজিদ-মাদরাসা আর জীবনসংগ্রাম নিয়েই ব্যস্ত। অল্প কয়েকজন রাজনীতিবিদের বিরোধী ভূমিকার জন্য গোটা আলেম সমাজকে স্বাধীনতা ও দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার কি কোনো যুক্তি আছে?

আমি বললাম, আমাদের কিছু ছেলেকে রাজাকার বানানো হয়েছে। এরা যে সবাই মাদরাসার ছাত্র তাও নয়, গ্রামের বেকার যুবকদের ধরে ধরে পাকিস্তানি বাহিনী জোর করে রাজাকার বানিয়েছে। কিন্তু আলবদরের সদর দপ্তর তো আলিয়া মাদরাসায় ছিল না। ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাহলে কি এ অপরাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেবেন? বিদ্বেষী রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে দু-চারজন মাওলানা বাদে সবাই তো ইংরেজি শিক্ষিত লোক। অধ্যাপক গোলাম আযম, সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, অ্যাডভোকেট ফরিদ আহমদ, মাহমুদ আলী, এস এম সুলায়মান, অ্যাডভোকেট শফিকুল হক, এঁদের কেউই তো মাদরাসা শিক্ষিত নন। তাহলে সব আক্রোশ এই মৌলভী-মাওলানাদের ওপর কেন?

মাওলানা সাহেবদের একটা বিরাট দল কি আওয়ামী উলামা পার্টি করেননি? ওই পার্টির সভাপতি মাওলানা অলিউর রহমান সিলেটি কি রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে নৃশংসভাবে নিহত হননি? হায়! বেচারার লাশটাও আর পাওয়া গেল না।

বঙ্গবন্ধু বুকে হাত দিয়ে বললেন, মাওলানা সাহেব! আমার বুকে খুব লাগছে! আমি বললাম, তাহলে একতরফাভাবে আলেম-উলামাকে স্বাধীনতার শত্রু বলে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস কেন চালানো হচ্ছে?

বঙ্গবন্ধু স্বীকার করলেন : এই প্রবণতাটা আসলেই ভুল।

(সূত্র : বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা ও ইসলামপ্রীতি, মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী আল-আযহারী, হাজি ম্যানশন, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা