kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

করোনাভাইরাসের প্রশ্ন নিয়ে দেশের শীর্ষ আলেমদের নিয়ে আলোচনা

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিশ্বের একাধিক মুসলিম ও অমুসলিম দেশে জুমার নামাজ ও জামাতের ব্যাপারে নিরুৎসাহ করা হচ্ছে। কোনো কোনো রাষ্ট্রে তা সাময়িকভাবে স্থগিতও করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মসজিদগুলোয় জুমা ও জামাতের ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ আছে কি না—সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। প্রশ্নটি নিয়ে দেশের শীর্ষ আলেমদের মুখোমুখি হন আতাউর রহমান খসরু

২০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনাভাইরাসের প্রশ্ন নিয়ে দেশের শীর্ষ আলেমদের নিয়ে আলোচনা

আক্রান্ত ব্যক্তি ঘরে নামাজ আদায় করবে

আল্লামা হাফেজ আহমাদ উল্লাহ, প্রধান মুফতি, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম।

বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি আমরা যতটুকু জানি, তাতে জুমা ও জামাতের ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্ধান্তের দরকার নেই। বাইরের যেসব দেশের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে তাদের মতো পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। তা ছাড়া আরব দেশগুলোর সিদ্ধান্ত আমি যথার্থ মনে করি না। ইসলামী শরিয়তে সাধারণভাবে জুমা ও জামাত স্থগিত করার অবকাশ নেই। কোনো এলাকায় পরিস্থিতির অবনতি হলে শুধু সেখানে ভিন্ন হুকুম প্রযোজ্য হতে পারে। কারো ভেতর রোগের লক্ষণ দেখা দিলে সে অপারগ হিসেবে ঘরে নামাজ পড়বে এবং জুমার পরিবর্তে জোহরের নামাজ আদায় করবে।

মুসলিম হিসেবে আমাদের এই বিশ্বাস রাখতে হবে, রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষার ক্ষমতা কেবল আল্লাহর। এটা শুধু মসজিদে না গেলে বেঁচে থাকা যাবে তা নয়। বরং অন্য কোনোভাবেও মানুষ তাতে আক্রান্ত হতে পারে। আমি বরং বলব, আসুন আমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করি, বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তেগফার পাঠ করি।

 

 

পরিস্থিতির অবনতি হলে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ আছে

আল্লামা সাজিদুর রহমান, শায়খুল হাদিস, জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া, বি-বাড়িয়া

সাধারণভাবে জুমা ও জামাত বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি দেশে তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। মানুষের ভিড় মসজিদ ছাড়াও আরো অনেক জায়গায় আছে। বরং এই পরীক্ষায় অল্লাহর দরবারে উত্তীর্ণ হতে হলে মানুষকে আল্লাহমুখী হতে হবে। জুমা ও জামাত বন্ধ হলে মানুষ ইবাদত থেকে বিমুখ হওয়ার ভয় আছে—যা কিছুতেই কাম্য নয়। তবে কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হলে বা তার ভেতর লক্ষণ দেখা দিলে সে যাবে না। এটা তার জন্য ও অন্যদের জন্য ভালো হবে। পরিস্থিতির অবনতি হলে তখন ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ ইসলামে আছে। বুখারি শরিফের একটি হাদিসে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি ও কাদা তৈরি হলে মসজিদে না যাওয়ার অবকাশের কথা বলা হয়েছে। তাই যদি সামগ্রিক পরিবেশের বিপর্যয় দেখা দেয়, তখন জুমা-জামাতের ব্যাপারে বিবেচনা করা যাবে।

কেউ কেউ অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশে জুমা ও জামাত স্থগিত রাখার বিষয়টি উল্লেখ করছেন। আমি তাদের বলতে চাই, সেসব দেশে কি শুধু মসজিদে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে? নাকি সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ না করুন! বাংলাদেশে সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ হলে, তখন মসজিদে হাজির হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।

 

জামাত বন্ধের সাধারণ ঘোষণা ইসলাম সমর্থিত নয়

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ, পরিচালক ও প্রধান মুফতি, মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া, ঢাকা।

মসজিদের মতো জুমা-জামাতও ইসলামের অন্যতম শিআর তথা নিদর্শন। এর মাধ্যমে মুসলিম জনবসতির পরিচয় ফুটে ওঠে। তাই জুমা ও নামাজের জামাত কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা ঠিক হবে না। পবিত্র কোরআনে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে ‘ইকামাতুস সালাতে’র নির্দেশ করা হয়েছে। তাফসিরবিদরা বলেন, নামাজ কায়েম করার অর্থ হলো, মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে তা যথাযথভাবে আদায় করা। সুতরাং মসজিদ বা জামাত বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ ইসলামে নেই। বিশ্বায়নের প্রভাবে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারি নিয়ে মানুষের ভেতর আতঙ্কের পরিমাণ বেশি। গত তিন-চার মাসে এই ভাইরাসে কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে। অথচ অতীতে লাখ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার মতো মহামারিও পৃথিবীতে দেখা গেছে। কিন্তু তখনো মসজিদ বন্ধ হয়নি। সাধারণভাবে মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া ইসলামী শরিয়তে অনুমোদিত নয়। তবে যেটা হতে পারে, কোনো এলাকায় কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হলে সে মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকল। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঘরে অবস্থান করল। ঘরে নামাজ আদায় করল। এ ক্ষেত্রে সে জুমার পরিবর্তে জোহর পড়বে।

আল-হামদুলিল্লাহ! বাংলাদেশে এখনো জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েনি। এখনো মিল-কারখানা ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে হাজার হাজার মানুষ একত্রে কাজ করছে, মার্কেট ও শমিংমল চালু আছে সে তুলনায় মসজিদে জনসমাগমের পরিমাণ খুব কম। তাই আমি মনে করি, মসজিদের জনসমাগম নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এখনো হয়নি। আমার আহ্বান থাকবে মানুষের ভেতর আতঙ্ক তৈরি হয় এমন কাজ না করি এবং নিজেরাও অমূলক আতঙ্কে না ভুগি।

আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, মহামারিসংক্রান্ত হাদিসে ‘বিআরদিন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যা দ্বারা একটি এলাকা বা মহল্লা বোঝায়। দেশ বা মহাদেশ বোঝায় না। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু আক্রান্ত অঞ্চল বা এলাকায় মানুষের যাতায়াত সীমিত করা যেতে পারে, সতর্কতা জারি করা যেতে পারে। এর বেশি কিছু নয়।

তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহামারির মতো বিষয়গুলো মানুষ চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বিশেষত বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে মানুষ আইনের প্রতি সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল নয়, সেখানে নিয়ম করে মহামারিমুক্ত হওয়া যাবে না; বরং মানুষের উচিত হবে মহান আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া। বেশি তাওবা, ইস্তেগফার ও দোয়া করা। মসজিদ খোলা থাকলে আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হওয়ার এই সুযোগ বেশি থাকবে। আমরা খেয়াল করছি, সাধারণ সময়ের তুলনায় এখন মসজিদে মুসল্লিদের সংখ্যা বাড়ছে। সুতরাং বলা যায়, মানুষও চায় মসজিদমুখী হতে, সেখানে যাতায়াত করতে।

 

প্রয়োজনীয় সময় মসজিদে থেকে মুসল্লিরা ঘরে চলে যাবে

মুফতি হিফজুর রহমান, প্রধান মুফতি, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, ঢাকা।

যেহেতু বাংলাদেশে মহামারির ব্যাপকতা অন্যান্য দেশের মতো নয়, তাই এখানে জুমা ও জামাত যথারীতি চলতে পারে। তবে প্রকোপ যদি বাড়ে এবং জুমা-জামাতে অংশ নিলে মানুষের জীবনের শঙ্কা তৈরি হয়, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির আলোকে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবকাশ ইসলামী শরিয়তে আছে। তবে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা যেসব পরামর্শ দিচ্ছেন তা মেনে চলতে কোনো সমস্যা নেই। ইসলামী শরিয়ত তা সমর্থন করে। মসজিদে যারা যাবেন তারা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে যেতে পারেন। আর মসজিদ কর্তৃপক্ষও মসজিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি।

পাশাপাশি এটাও বলব, যেহেতু মানুষের ভেতর ভয় কাজ করছে তাই প্রয়োজনীয় সময়টুকু মসজিদে থেকে মুসল্লিরা চলে আসতে পারেন। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে জুমা ও জামাতের সময়ও কমিয়ে আনা যেতে পারে।

 

কেউ আক্রান্ত হলে তাকে অপারগ মনে করা হবে

মুফতি এনামুল হক কাসেমি, সিনিয়র মুফতি, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।

ফিলহাল বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যে পর্যায়ে রয়েছে তাতে জুমা ও জামাতের বিধানে কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করছি না এবং এই বিষয়ে অগ্রিম আলোচনা করে ‘আতঙ্ক’ ছড়ানোও ঠিক হবে না। যদিও রোগ-ব্যাধির বিস্তার আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, তবু যাদের মাধ্যমে রোগ-ব্যাধি ছড়ানোর ভয় থাকে তারা মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে। তাকে অপারগ মনে করা হবে। যেমন কারো মুখে দুর্গন্ধ থাকলে সে মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। কেননা ফেরেশতা ও মানুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম।

সত্যিই কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে ক্ষেত্র বিশেষে তার জন্য মসজিদে যাওয়া নাজায়েজ হবে। আর কারো প্রচণ্ড ভয় তৈরি হয় এবং সে মসজিদে গেলে রোগে আক্রান্ত হবে—তাহলে সে বেঁচে থাকতে পারে। এটা অবশ্যই ফাতাওয়ার বিষয় নয়। সত্যি বলতে জুমা ও জামাত নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তা আমি এখনো প্রাসঙ্গিক মনে করছি না। সরকার যখন দেশের অন্যান্য জনসমাগমের স্থান নিষিদ্ধ করবে, তখন প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তখন আলেমরা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।

 

জুমা ও জামাত অল্প সময়ে শেষ করা যায়

মাওলানা আ খ ম আবু বকর সিদ্দীক, অধ্যক্ষ, দারুন নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদরাসা, ঢাকা

আমি মনে করি, মসজিদে যাওয়া নিয়ে ভয় পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে যতটা সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করে যাওয়া। সর্বোচ্চ এটা করা যেতে পারে—ইমামরা নামাজের সময় কমিয়ে আনতে পারেন এবং মুসল্লিরা জামাত শেষে দ্রুত ফিরে আসবেন। আবার আক্রান্ত ব্যক্তি মসজিদে থেকে বিরত থাকবে। মনে রাখতে হবে, জামাত ও জুমা শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। শরিয়ত অনুমোদন করে না—এমন অজুহাতে জামাত থেকে বিরত থাকা এবং জুমা ও জামাত স্থগিত করা উচিত হবে না।

 

মুসল্লিদের ব্যক্তিগত সতর্কতা অবলম্বন জরুরি

মোহাম্মদ শফিউল্লাহ কুতুবী, সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে এই ভাইরাসের প্রকোপ ‘চরম’ পর্যায়ে পৌঁছেনি। তাই আমি মনে করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাত ও জুমার নামাজের জামাত অব্যাহত রাখা উচিত। কারো ভেতর ‘আলামত’ দেখা দিলে সে ঘরে অবস্থান করবে তবে মুসল্লিরা চাইলে মসজিদে কম সময় অবস্থানের নীতি অবলম্বন করতে পারেন।

ইমাম নামাজের সময় কমিয়ে আনতে পারেন। ছোট ছোট সুরা তিলাওয়াত, ছোট খুতবা ও আলোচনা ইত্যাদি হতে পারে। মসজিদ কর্তৃপক্ষ মসজিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিতে পারে। কার্পেটসহ সেসব জিনিস পরিষ্কার করা কঠিন তা উঠিয়ে মেঝেতে নামাজের ব্যবস্থা করতে পারেন। যেন প্রত্যেক নামাজের পর তা পরিষ্কার করা যায়।