kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

মেহমানের করণীয় মেজবানের করণীয়

মুফতি তাজুল ইসলাম   

১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মেহমানের করণীয় মেজবানের করণীয়

মেহমানদারি নবীদের আদর্শ। ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আমার ফেরেশতারা (পুত্রসন্তানের) সুসংবাদ নিয়ে ইব্রাহিমের কাছে এলো। তারা বলল, সালাম। সেও বলল, সালাম। সে অবিলম্বে কাবাবকৃত গোবৎস (ভুনা গরুর গোশত) নিয়ে এলো।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬৯)

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মেহমানদারির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিজ ঘরে মেহমানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে তিনি মেহমানদের কোনো ধনী সাহাবির বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। নবী হওয়ার আগে থেকেই তিনি অতিথি সেবায় সচেষ্ট ছিলেন। সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হয়ে অনেকটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন মহানবী (সা.)। খাদিজা (রা.) তখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এভাবে—‘আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো রক্ষা করেন আত্মীয়তার বন্ধন, বহন করেন অন্যের বোঝা, উপার্জনক্ষম করেন নিঃস্বকে, আহার দেন অতিথিকে, সাহায্য করেন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৩)

 

মেজবানের করণীয়

এক. মেহমান এলে খুব দ্রুত তাঁকে স্বাগত জানাবে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধিরা মহানবী (সা.)-এর কাছে আগমন করে, মহানবী (সা.) তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কারা? তারা বলল, আমরা (আবদুল কায়েস গোত্রের) রবিআ শাখার লোক। মহানবী (সা.) বললেন, ওই জাতিকে মারহাবা! ওই প্রতিনিধিদলকে মারহাবা! এটা তোমাদের অপরিচিত কোনো জায়গা নয়। এখানে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩)

দুই. মেহমানের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা। মেহমান কারো কাছে গিয়ে মেজবানের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসবে না। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কেউ কারো ঘরে গিয়ে তার অনুমতি ছাড়া তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮৩)

তিন. মেহমান আলেম হলে তাঁকে অত্যধিক সম্মান করা। আল্লাহ বলেন, ‘যাদেরকে ধর্মীয় জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদায় উন্নীত করবেন।’ (সুরা : মুজাদালা, আয়াত : ১১)

চার. মেজবান ও বাড়ির কর্তা নিজেই মেহমানদারির কাজে অংশগ্রহণ করা। ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, তিনি নিজেই দ্রুত আগত মেহমানদের জন্য মেহমানদারির ব্যবস্থা করেছেন।

পাঁচ. খাবার নিয়ে কোনো লৌকিকতা প্রদর্শন করবে না। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আমরা উমর (রা.)-এর কাছে ছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের লৌকিকতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করা হয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭২৯৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট। আর তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৯২, মুসলিম, হাদিস : ২০৫৮)

 

মেহমানের করণীয়

এক. মেহমানের উচিত হলো, তাঁর চক্ষু সংযত রাখা ও দৃষ্টি অবদমিত রাখা। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)

দুই. মেহমানের উচিত হলো, তাঁর আওয়াজ ও কণ্ঠস্বর নিচু রাখা। অহেতুক চিল্লাপাল্লা না করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রেখো। নিশ্চয়ই কণ্ঠস্বরের মধ্যে গাধার কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৯)

তিন. খাবার শেষ হলে মেহমান এ দোয়া পাঠ করবে—আল্লাহুম্মা বারিক লাহুম ফিমা রযাকতাহুম। ওগিফর লাহুম ওর্হামহুম।’ (মুসলিম, হাদিস : ২০৪২)

অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি তাদের রিজিকে বরকত দান করুন, তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের ওপর অনুগ্রহ করুন।

চার. খাবার শেষ হলে মেহমান কোনো কাজ না থাকলে চলে যাবে। অহেতুক বসে থেকে মেজবানের কাজে বিঘ্নতা সৃষ্টি করবে না। মহানবী (সা.)-এর এক ঘটনা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘খাওয়াদাওয়া শেষে তোমরা চলে যাও। তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। কারণ তোমাদের এই আচরণ নবীকে পীড়া দেয়। সে তোমাদের উঠিয়ে দিতে সংকোচবোধ করে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৩)

পাঁচ. মেহমানের উচিত হলো, দীর্ঘদিন অবস্থান করে মেজবানকে বিরক্ত না করা। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। মেহমানের পারিতোষিক (বিশেষ মেহমানদারি) এক দিন ও এক রাত। (স্বাভাবিক) মেহমানদারি তিন দিন। এর অতিরিক্ত মেহমানদারি সদকাস্বরূপ। মেহমানের জন্য বৈধ নয় যে সে মেহমান হতে হতে মেজবানকে বিরক্ত করে ফেলবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১৩৫; মুসলিম, হাদিস : ৪৮)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা