kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

মধ্যযুগে ইউরোপে মুসলিম চিকিৎসাব্যবস্থা

বেলায়েত হুসাইন   

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মধ্যযুগে ইউরোপে মুসলিম চিকিৎসাব্যবস্থা

আরবি ভাষায় রচিত চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রাচীন বইগুলো খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দী থেকে লাতিন ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে। এতে পাশ্চাত্য সমাজে ধীরে ধীরে আরবি ভাষায় লিখিত মুসলিমদের বইপত্র জনপ্রিয়তা পায়। ঐতিহাসিক সত্য হলো, আরব মুসলিমদের বই পড়েই ইউরোপীয়রা আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের বহু মূল্যবান তথ্য জানতে পারে। তাদের সামনে জ্ঞানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়। মুসলিম লেখকদের বই পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ায় ইউরোপের বহু লেখক আরব মুসলিমদের বই অনুবাদে মনোযোগী হন। সে সময় মুসলিম বিজ্ঞানী ও গবেষকরা জ্ঞানের সব শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও আরবীয় চিকিৎসারীতি ইউরোপে বিশেষ সাড়া জাগায়। খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সিলেবাসে তা বিশেষ জায়গা করে নেয়। যেকোনো সময়ের তুলনায় তার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায় এবং তা ইউরোপীয় জ্ঞানের জগতে বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলে। শুধু ইবনে সিনার ‘আল কানুনু ফিত তিব্বি’ লাতিন ভাষায় ৬০ ফরম্যাটে প্রকাশিত হয়েছিল।

কেউ কেউ ধারণা করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের আরবি বইপত্র মধ্যযুগ পর্যন্ত ইউরোপেই সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমা তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায় ‘আল কানুনু ফিত তিব্বি’ অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসভুক্ত ছিল। ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইবনে সিনার এই বইয়ের পাঠদান হতো। কিছুদিন বইটি নিয়মিত সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়ার পর আবার তা মূল সিলেবাসে নিয়ে আসা হয়।

চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রথম বই অনুবাদ করেন হানিন ইবনে ইসহাক (১৯৪-২৬০ হিজরি)। কনস্টান্টাইন আফ্রিকান এই চিকিৎসক সর্বপ্রথম Eye Structure নামক বইটি গ্রিক থেকে লাতিন ভাষায় রূপান্তর করেন।

প্রখ্যাত চিকিৎসক ইসহাক ইবনে সুলাইমান আল ইসরাইলি (মৃত্যু ৩২০ খ্রি.) চিকিৎসাশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই রচনা করেন। ‘আল হামিয়্যাত’, ‘আল আগজিয়াতু’ ও ‘কিতাবুল বাউল’ উল্লেখযোগ্য। মিসরীয় বংশোদ্ভূত লেখক ইবনে আবি আসিবিয়া (৬০০-৬৬৮ হি.) ইসহাক ইবনে সুলাইমানের একাধিক গ্রন্থ অনুবাদ করেন। বইয়ের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক নিয়ে ইসহাক ইবনে সুলাইমান ইসরাইলির দারুণ একটি গল্প আছে। তিনি বইয়ের সঙ্গে এমন ভাব রাখতেন—যা সন্তান ও পিতার মধ্যকার সম্পর্ককেও হার মানায়। তাঁর ‘আল হামিয়্যাত’ বইটি সম্পর্কে বলতেন, এটি তাঁকে তাঁর সন্তানদের থেকেও বেশি স্মরণ করে। তাঁর বইগুলো লাতিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলে তিনি এই উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর আরো কয়েকটি বই লাতিনে অনুবাদ করা হয়।

বাগদাদের চিকিৎসক খ্যাত ইসহাক ইবনে ইমরানের বইও সে সময় ইউরোপে সমাদৃত হয়। ওষুধ তৈরি ও রোগ নির্ণয়ে বিশেষ পারদর্শী এই লেখকের বইয়ের প্রচুর চাহিদা ছিল। আরব ও অনারবে তিনি সর্বত্র  পাঠকপ্রিয় ছিলেন। তাঁর ‘আল মালিখুলিয়া’ গ্রন্থটি লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়। আরব লেখকরা বলেন, এত সমৃদ্ধ বই আগে কেউ দেখেনি।

মরক্কোর চিকিৎসক ইবনে জিজারের একাধিক বই লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়। চতুর্দশ শতকের শুরু থেকে বিভিন্ন অনুবাদক তাঁর অসংখ্য বইয়ের অনুবাদ করেন। ‘জাদুল মুসাফির’ তাঁকে অসামান্য খ্যাতি এনে দেয়। এ ছাড়া আরো যেসব মুসলিম চিকিৎসকের বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—আল আলিম আল কিনদি, ইয়াকুব ইবনে ইসহাক, ইউহানা ইবনে মাসাভিয়া, খালাফ ইবনে আব্বাস আজ জাহরাবি প্রমুখ। 

এই সময় মুসলিম চিকিৎসকদের অনেকেই ইউরোপীয় চিকিৎসকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তাঁদের কেউ ইবনে সিনার মতো গ্রহণযোগ্যতা পাননি। তার পরেই স্থান ছিল হুসাইন বিন আবদুল্লাহর (মৃত্যু ৪২৮ হি.)। চিকিৎসাশাস্ত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী তথ্য ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে এই দুজনই অতুলনীয় খ্যাতি লাভ করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা