kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

নওমুসলিমের কথা

ধর্মযাজক থেকে যেভাবে মুসলিম হন মুহাম্মদ শরিফ

ড. ইকবাল কবীর মোহন   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিশিষ্ট ইসলাম প্রচারক মুহাম্মদ শরিফ শ্রীলঙ্কার অধিবাসী। তিনি একটি ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজক আর মা রোমান ক্যাথলিক। মা তাঁকে একজন ধর্মযাজক হিসেবে গড়ে তোলেন। খ্রিস্টান পণ্ডিত হিসেবে কলম্বোর বহু ধর্মীয় সভায় বক্তব্য রাখেন। তিনি তাঁর শিক্ষাজীবনে এবং পরবর্তী সময়ে ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে খ্রিস্টীয় মতবাদে পরস্পরবিরোধী সংঘাত দেখতে পান এবং তাতে তাঁর সংশয় তৈরি হয়। ১৯৭০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি পোপের কাছে তাঁর সমস্যাগুলোর কথা জানাতে থাকেন। কিন্তু পোপের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর তিনি পাননি। ছয় বছর পর তিনি রোমান ক্যাথলিকের সংস্পর্শ ত্যাগ করেন এবং প্রটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ে যোগ দেন। কিন্তু তারাও তাকে হতাশ করে।

এ সময় চাকরির সূত্রে তিনি সৌদি আরবের দাহরানে যান। সেখানে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে সচেষ্ট হন। তিনি যখন ঈসা (আ.)-কে মুসলিমদের কাছে তুলে ধরতেন তখন তারা বলত, ‘আমরা ইতোমধ্যেই ঈসা (আ.)-কে গ্রহণ করেছি।’ মুসলমানের এই দাবি অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন মুসলিমরা ঈসা (সা.)-কে একজন নবী হিসেবে বিশ্বাস করে। তবে তারা তাঁকে আল্লাহর পুত্র মনে করে না। তিনি জেনে আশ্চর্য হলেন, কোরআনে ঈসা (আ.)-এর নাম ২৫ বার উল্লেখ করা হয়েছে অথচ মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম মাত্র চার থেকে পাঁচবার এসেছে।

মুহাম্মদ শরিফ রিয়াদ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের মাজমায় চাকরি করতেন। তিনি একটি নতুন কাজ পেতে একজন পাকিস্তানি ইঞ্জিনিয়ারের দ্বারস্ত হন। ইঞ্জিনিয়ার একদিন শরিফকে তাঁর বাসায় রাতের খাবারে দাওয়াত দেন। শরিফ বাসার ড্রইংরুমে ইংরেজিতে অনূদিত কোরআনের একটি কপি দেখতে পান। কোরআনের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ হয় এবং তা পড়তে থাকেন। পাকিস্তানি ইঞ্জিনিয়ার শরিফকে বলেন, ‘আপনি কোরআনের কপিটি উপহার হিসেবে নিতে পারেন।’

কোরআনের সুরা ‘ফাতিহা’ পাঠ করার পর তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। কোরআনের দ্বিতীয় সুরা ‘বাকারা’তেই তিন তাঁর অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন। শরিফ বুঝতে পারলেন, নবী মুহাম্মদ (সা.) নতুন কোনো ধর্ম নিয়ে আসেননি; বরং তাঁর আনীত দ্বিনেরই পূর্ণতা দান করেছেন তিনি। ইসলাম ঈসা (আ.)-কে যথাযথ সম্মান দিয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণার পর তাঁর সামনে ইসলাম সত্য ধর্ম প্রমাণিত হয়। ১৯৮৪ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর স্থানীয় মুসলিমদের কাছ থেকে তিনি ইসলামের বিধি-বিধান শিখতে থাকেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মসজিদের ইমাম তাঁকে বিশেষ সহযোগিতা করেন।

মুহাম্মদ শরিফের মতে, ইসলাম গ্রহণ করা ছিল তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং এই কাজে প্রস্তুতি হিসেবে ইসলামের ওপর ব্যাপক পড়াশোনা শুরু করেন। প্রচুর পরিমাণ ইসলামী সাহিত্য সংগ্রহ করেন তিনি। বহুসংখ্যক মানুষ তাঁর মাধ্যমে সত্যের দিশা লাভ করে। শরিফ বলেন, ‘ইসলামী দাওয়াতি কাজের জন্য কোনো বিশেষ ধরনের লোক হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেক মুসলিমই একজন ইসলাম প্রচারক। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে আমাদের তাই শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, উপস্থিত ব্যক্তিরা অনাগতদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেবে। তাই ‘যদি আমরা মুসলমান হই তা হলে রাসুলের বাণী অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য।’

মুহাম্মদ শরিফ একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারতেন। সিংহলি, তামিল, উর্দু, হিন্দি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, জার্মান, গ্রিক ও হিব্রু তার মধ্যে অন্যতম। তিনি মনে করতেন, ভাষাগত দক্ষতা দাওয়াতি কাজের জন্য আবশ্যক। মুহাম্মদ শরিফের প্রচেষ্টায় তাঁর মা-বাবা ও ভাইরা ইসলাম গ্রহণ করে।

শরিফ বলেন, রোমান ক্যাথলিকদের যে বাইবেল রয়েছে তার ৭৩টি সংস্করণ এবং অর্থোডক্সদের বাইবেল ৮০টি সংস্করণে বিদ্যমান। কিন্তু পবিত্র কোরআনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর কোনো সংস্করণ নেই। তিনি বলেন, খ্রিস্টান, হিন্দু এবং বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মমতের ভিত্তিতেই তিনি আল্লাহর একত্ববাদ ও মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রমাণ করতে সক্ষম। হিব্রু ভাষায় লেখা ওল্ড টেস্টামেন্টে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম আছে। তিনি আরো দাবি করেন, বৌদ্ধ মতবাদের মৌলিক শিক্ষাও ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

মুহাম্মদ শরিফ বলেন, কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা তার মূল কাঠামো ও বিষয় নিয়ে আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। কোরআন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উপহার দিয়েছে। কোরআনের শিক্ষা মানবজাতিকে মুক্তি দিতে পারে। তাই তিনি মুসলিম জাতিকে কোরআনের পথে মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার আহ্বান জানান।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা