kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

প্রগতি, বিজ্ঞান ও ইসলাম

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রগতি, বিজ্ঞান ও ইসলাম

প্রগতির ইংরেজি প্রতিশব্দ Progress, শব্দটি লাতিন শব্দ Prograde থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ অগ্রগতি, উত্কর্ষ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। প্রগতির আভিধানিক অর্থ সবার কাছে প্রায় একই। তবে পারিভাষিক অর্থে যত মতানৈক্য। এই মতপার্থক্য মূলত আদর্শিকভাবে হয়েছে। তাই প্রগতি বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট অগ্রগতি অভীষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এমন উচ্চতায় পৌঁছানো, যা অবিরামভাবে সম্মুখপানে অগ্রসর হয়। আবার বর্তমান প্রগতিশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য হলো, প্রগতি মানেই সব ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয়সহ যাবতীয় বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।

আধুনিক প্রগতিবাদ আন্দোলন ১৮ শতকের দিকে ইংল্যান্ডের হব্স, লক এবং ফ্রান্সের ভল্টেয়ার, রুশো প্রমুখ চিন্তাবিদ ধর্মের বিরুদ্ধবাদী চেতনায় বারি সিঞ্চন করেন।

এই প্রগতির ছোঁয়া লাগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তরণের লক্ষ্যে শিল্পবিপ্লবের সময় থেকে।

প্রগতি সম্পর্কে অগাস্ট কোৎ সামাজিক প্রগতিকে মানুষের চিন্তাধারার প্রগতির সঙ্গে সমার্থক বলে বিবেচনা করেছেন। মনোজগতে মানুষের প্রগতির মানবসমাজের প্রগতির মাপকাঠি। জার্মান দার্শনিক হেগেন বলেন, ‘আত্মোপলব্ধিই মনুষ্যত্বের অগ্রগতি প্রকাশের প্রণালী।’ তিনি গুরুত্ব দিতেন মানুষের ব্যক্তিগত উপলব্ধির ওপর। কাল মার্ক্সের মতে, সমাজের একটি স্তর থেকে অন্য স্তরে পৌঁছতে উৎপাদন কৌশলের যে পরিবর্তন, তা-ই প্রগতি। প্রগতি হলো এমন একটি সামাজিক পরিবর্তন, যা অনুপ্রাকৃতিক নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মোটকথা, প্রগতি হচ্ছে বিবর্তন ও সামাজিক পরিবর্তনের পরিচালক।

ইসলাম ও প্রগতিবাদ

মুসলমানদের দৃষ্টিতে প্রগতি হলো ১৪০০ বছর আগের সেই আইয়্যামে জাহেলিয়াতের তমসাচ্ছন্ন ঘোর অন্ধকার থেকে উত্তরণের নাম। এই সংজ্ঞা মতে, ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে যাবতীয় সংকীর্ণতা পেছনে ফেলে মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রদর্শিত আদর্শের অগ্রগতিকেই প্রগতি বলে, যা চিরন্তন ও সর্বজনীন।

ইসলামী প্রগতিবাদ চিরন্তন, সর্বজনীন ও আধুনিকতার কোনো ধরনের কমতি নেই, এটি শাশ্বত অত্যাধুনিক। পক্ষান্তরে তথাকথিত আধুনিক প্রগতিবাদ পরিবর্তনশীল ভঙ্গুর বিজাতীয় মতবাদ। ইসলামী প্রগতিবাদ গ্রহণ করলে দুইভাবে লাভবান হওয়া যাবে। ১. ইহকালীন  শান্তি-শৃঙ্খলার মধ্যে সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করা। ২. পরকালীন মুক্তি এবং এর সুফল অনন্তকাল ভোগ করা। কিন্তু যদি আধুনিক প্রগতি গ্রহণ করি, তবে এর বিপরীত হবে। কেননা আমরা যদি দ্বিন ইসলামকে বাদ দিয়ে প্রগতিশীল হতে চাই, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বিন তালাশ করে, তার কাছে থেকে তা কখনোই কবুল করা হবে না এবং ওই ব্যক্তি আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা : আলে ইমরান : ৮৫)

ইসলামী প্রগতিবাদ অপরিবর্তনশীল

আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষ আছেন যাঁরা ইসলামকে চিরন্তন প্রগতিশীল মনে করেন, তবে ইসলামের যোজন-বিয়োজনের প্রয়োজনও অনুভব করেন। আর তা পবিত্র কোরআন ও হাদিসের ভুল অর্থ ও অপব্যাখ্যার মাধ্যমে করে থাকেন। আবার তাঁরা বিজাতীয় মতবাদকে সরাসরি গ্রহণ না করে ঘুরিয়ে তা গ্রহণ করেন। তাঁদের মতে, যুগের সঙ্গে বা সামাজিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। অথচ দ্বিন ইসলামকে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য মনোনীত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মনোনীত দ্বিন হচ্ছে ইসলাম।’ (সুরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ১৯)

আর এই দ্বিনের মধ্যে কোনো ধরনের রদ-বদল বা যোজন-বিয়োজন করার প্রশ্নই আসে না। দ্বিন ইসলাম  চিরস্থায়ী পূর্ণাঙ্গ ও সংযোজন-বিয়োজনমুক্ত সর্বজনীন প্রগতিশীল। এ সম্পর্কে  মহান আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বিন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩)

জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইসলামী প্রগতির অবদান

প্রগতি যেহেতু অগ্রগামী, সেহেতু ইসলামী শরিয়া মোতাবেক জ্ঞান-বিজ্ঞানের  উত্কর্ষও এর মধ্যে পরিগণিত হয়। বিগত যুগে ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমেই মুসলমানরা বিশ্ব নেতৃত্বে সমাসীন হয়েছিল। অথচ আজ আধুনিক শিক্ষার নামে তাদের শুধু বিদেশিদের লেজুড় হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। নিজের ঘরে খাঁটি সোনা থাকতে তারা অন্যের মেকি সোনার পেছনে ছুটছে। একটি হিসাবে জানা যায়, পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন বিষয়ে নিম্নোক্ত আয়াতগুলো বিদ্যমান রয়েছে। যেমন—১. মেডিসিনে ৩৫৫টি, ২. বায়োলজি ও বোটানিতে ১০৯টি, ৩. অ্যাস্ট্রোনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিকসে ৮২টি, ৪. কেমিস্ট্রিতে ৪৩টি, ৫. মেটেরিওলজিতে ৩৪টি, ৬. জিওলজিতে ৩৩টি, ৭. ওসিয়ানোগ্রাফিতে ৩১টি, ৮. জুলোজিতে ২৮টি, ৯. জিওগ্রাফিতে ১৭টি, ১০. আর্কিওলজিতে ৮টি, ১১. এয়ারোনটিকসে ৮টি এবং ১২. সোসিওলজিতে ৩০০টি। সর্বমোট ৯৪৮টি।

আরেকটি হিসাবে এসেছে, কোরআনের শতকরা ১১টি আয়াত বিজ্ঞান বহন করে। প্রকৃত অর্থে কোরআন ও হাদিসের প্রতিটি শব্দ ও বাক্যই বিজ্ঞান বহন করে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে যা গোপন নয়। শুধু উৎসাহ ও সহযোগিতা দেওয়ার অভাবে এবং যথার্থ গবেষণার অভাবে কোরআন ও হাদিসের কল্যাণভাণ্ডার থেকে মানবজাতি বঞ্চিত রয়েছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলমানরা দীর্ঘ এক হাজার বছর যাবৎ বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছে। উইলিয়াম ড্রেপার স্বীয় Intellectual development of Europe গ্রন্থে বলেন, খুবই পরিতাপের বিষয়, পাশ্চাত্যের জ্ঞানীরা বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান ও অগ্রগতিকে ক্রমাগতভাবে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের এই বিদ্বেষ বেশিদিন চাপা থাকেনি। নিশ্চিতভাবে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান আকাশের নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা