kalerkantho

বুধবার । ১৩ মাঘ ১৪২৭। ২৭ জানুয়ারি ২০২১। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কোরআনের বর্ণনায়

পাখির দলবদ্ধভাবে বাস ও শূন্যে বিচরণ

প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান   

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পাখির দলবদ্ধভাবে বাস ও শূন্যে বিচরণ

পবিত্র কোরআন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধার। যার বর্ণনায় খুঁজে পাওয়া যায় আধুনিক বিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। পাখিদের দলবদ্ধ বাস ও শূন্যে বিচরণ আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পবিত্র কোরআনেও বিষয়টি স্থান পেয়েছে।

দলবদ্ধভাবে বাস : কোরআনের সুরা আনআমে বলা হয়েছে, ‘আর যত প্রকার প্রাণী জমিনে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখি আকাশের বায়ুমণ্ডলে দুই ডানাযোগে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতোই একেকটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

পশু-পাখির আচার-আচরণ সম্পর্কে জীববিজ্ঞানীরা আধুনিককালে গভীর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করে দেখেছেন, পশু-পাখি দলবদ্ধ হয়ে বাস করে এবং তাদের মধ্যেও সমাজ ও দলবদ্ধতার রীতি রয়েছে। পশু ভূমিতে, পাখি আকাশে দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে এবং পরস্পর সহযোগিতাসহকারে কোনো কোনো কাজ করতে দেখা যায়।

মানুষ একে অপরের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষায় প্রাণীরা কথা বলতে পারে না। কিন্তু তাদের নিজস্ব একটি ভাষা রয়েছে। আকার-ইঙ্গিতে, দেহভঙ্গির মাধ্যমে তারা ভাবের আদান-প্রদান করে। মনের ভাব প্রকাশ করতে এরা কতগুলো ইঙ্গিতময় আওয়াজ বা শব্দও ব্যবহার করে। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে বিরাজমান এই সমাজপ্রথা ও দলবদ্ধতা আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার হলেও দেড় হাজার বছর আগে কোরআনে তা বর্ণিত হয়েছে।

শূন্যে বিচরণ : পবিত্র কোরআনে পাখির শূন্যে বিচরণের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘তারা কি পাখির প্রতি লক্ষ্য করে না? আকাশের শূন্যগর্ভে তারা কিভাবে নিয়ন্ত্রিত রয়েছে? আল্লাহ ছাড়া এমন কে আছেন, যিনি এদের ধরে রাখতে পারেন? বিশ্বাসীদের জন্য এতে বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৭৯)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা কি দেখে না তাদের ওপরে বিচরণশীল পাখিদের? যেগুলো পাখা মেলে ও গুটিয়ে চলে। পরম করুণাময় আল্লাহ ছাড়া এ অবস্থায় তাদের কেউ ধরে রাখতে পারে না; নিঃসন্দেহে তিনি সব কিছুরই ওপর দৃষ্টি রাখেন।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৯)

উল্লিখিত আয়াতদ্বয়ে ‘য়ুমসিকুহুন্না’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যা ‘আমসাকা’ ক্রিয়াপদ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো, ওপরে হাত রাখা, ধরে রাখা, কারো পেছনে ধরা। ফলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহই আপন ক্ষমতাবলে পাখিদের আকাশে ধরে রাখেন, যাতে ভারী ওজনবিশিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও মাটিতে পড়ে না যায় এবং বায়ুমণ্ডলে চলাচল করে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে। কোরআনের এই বক্তব্যের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান-গবেষণায় পাওয়া তত্ত্ব ও তথ্যাবলির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, পাখির চলাচল পুরোপুরি আল্লাহর হুকুরের ওপর নির্ভরশীল।

পৃথিবীতে বহু প্রজাতির পাখি রয়েছে। এদের আকাশের শূন্যগর্ভে চলাচলে বিশেষ উৎকর্ষ দেখা যায়। এই শ্রেণির পাখি বহু দূরে নিখুঁতভাবে গন্তব্যস্থান নির্ধারণ করতে পারে। এ পাখিরা কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই হাজার হাজার মাইল আকাশপথে পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে সেখান থেকে রওনা হয়ে আগের স্থানে ফিরে আসতে পারে। এমনকি এ ধরনের পাখির বাচ্চারা পর্যন্ত—যাদের দেশ-দেশান্তরে গমনাগমনের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তারাও শুধু জন্মগত বা সহজাত বুদ্ধিমত্তার জোরে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারে। দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো পাখিকে পরিযায়ী পাখি বলা হয়। এখানে বাস্তব অর্থে পরিযান বলতে বোঝায় কয়েকটি প্রজাতি পাখির স্থায়ী বাসভূমি থেকে নির্দিষ্ট কোনো অনুকূল পরিবেশস্থলে আকাশপথে যাত্রা এবং সেখানে সাময়িক বসবাসের পর আবার স্থায়ী বাসভূমিতে ফিরে আসা। এ রকম যাতায়াত বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সংঘটিত হয় এবং এ যাতায়াতে এই পাখিরা একই পথ অনুসরণ করে। এ সময় পাখিরা তিন হাজার থেকে ২০ হাজার ফুট উচ্চতায় আকাশের বায়ুমণ্ডলে পথ পাড়ি দেয়। গোল্ডেন প্লোভার প্রজাতির পরিযায়ী পাখি বিরতিহীনভাবে উড়ে এক হাজার ৪০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে।  

অধ্যাপক হ্যামবার্গার তাঁর সুবিখ্যাত বই ‘পাওয়ার অ্যান্ড ফ্রাজিলিটি’তে ‘মাটন বার্ডে’র দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। এরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাস করে। এই পাখিরা দলবদ্ধভাবে যখন নিজেদের স্থায়ী আবাসস্থল থেকে যাত্রা শুরু করে সুদূরের গন্তব্যে যায় এবং সেখান থেকে ফিরে আসে, তখন তাদের মোট পাড়ি দেওয়ার পথ ১৫ হাজার মাইলেরও বেশি হয়। তাদের যাওয়া-আসার রেখাচিত্র দাঁড়ায় অনেকটা ‘৪’-এর মতো। সাড়ে সাত হাজার মাইলেরও বেশি পথ আকাশপথে পাড়ি দিয়ে স্থায়ী আবাসস্থলে ফিরে আসতে তাদের খুব বেশি হলে সপ্তাহখানেক সময় লাগে। এই দীর্ঘ জটিল সফরের পুরো নির্দেশনাই এ শ্রেণির পাখির স্নায়ুমণ্ডলীর মধ্যেই নিহিত থাকে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা    

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা