kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

হ্যান্ডশেক হোক ইসলামী নিয়মে

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হ্যান্ডশেক হোক ইসলামী নিয়মে

হ্যান্ডশেক, যাকে ইসলামী পরিভাষায় মুসাফাহা বলা হয়। মুসাফাহা ইসলামে সুন্নাত। এর মাধ্যমে বান্দাদের মধ্যে পরস্পর ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। বান্দার গুনাহ মাফ হয়।

আল বারাআ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : দুজন মুসলিম পরস্পর মিলিত হয়ে মুসাফাহা করলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২১২)

ইতিহাসবিদের মতে মুসাফাহা বা হ্যান্ডশেকের ইতিহাসটি বেশ পুরনো। ধারণা করা হয়, হ্যান্ডশেকের শুরুটা হয়েছিল দুজন মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক স্থাপনের উপায় হিসেবে।

খ্রিস্টপূর্ব নবম শতকে অ্যাসিরীয় (বর্তমান ইরাক) সম্রাট তৃতীয় শালমানেসেরের শাসনকালের একটি শিলাখণ্ড থেকেও গবেষকরা মুসাফাহার প্রমাণ পেয়েছেন। এই শিলাখণ্ডে দেখা যায়, সম্রাট শালমানেসের একজন ব্যাবিলনীয় শাসকের সঙ্গে মুসাফাহা করছেন। মহাকবি হোমার তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য ইলিয়াড ও ওডিসিতে বহুবার শপথ এবং অঙ্গীকার করার সময় মুসাফাহা করার কথা উল্লেখ করেছেন।

শুধু তাই নয়, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের গ্রিক কবরগুলোর এপিটাফে খোদাই করা ছবিতে মুসাফাহারত মানুষের দেখা পাওয়া যায়। প্রাচীন রোমান মুদ্রায়ও বন্ধুত্ব এবং আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ মুসাফাহার কথা উল্লেখ আছে। তা ছাড়া মুসাফাহা মানুষের মস্তিষ্কে ‘অক্সিটোকিন’ হরমোন নিঃসরণ করে, যা দুজন মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে সহায়ক।

সংস্কৃতিভেদে হ্যান্ডশেকের অর্থও ভিন্ন হয়। পশ্চিমা সমাজে দৃঢ় করমর্দনের মাধ্যমে ব্যক্তির ইতিবাচক এবং সুদৃঢ় মনোভাব ফুটিয়ে তোলা হয়। তবে  আগের সংস্কৃতিতে নরম করমর্দনের প্রচলন বেশি। সেখানে দৃঢ় করমর্দনকে আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মুসাফাহার নিয়ম : ইসলামে মুসাফাহার নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম মেনে যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুসাফাহা করে তাহলে তার সগিরা গুনাহ ঝরে যায় বলে বিভিন্ন হাদিসে আছে। অনেকে মনে করেন, মুসাফাহার সময় হাতে হালকা চাপ দিতে হয়। এ রকম নিয়ম কোনো কিতাবে নেই। হাত হালকা ঝাড়া দেওয়ার কথা কোনো কোনো কিতাবে থাকলেও তা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায় না। মুসাফাহার সুন্নাত পদ্ধতি হলো, প্রথমে সালাম দেওয়া, তারপর উভয় হাতে মুসাফাহা করা।

অনেকে মনে করেন, মুসাফাহার পর নিজের হাতটি এনে নিজের বুকে লাগাতে হয়। শরিয়তে এ ধরনের কোনো নিয়ম নেই। তাই তা থেকে বিরত থাকা উচিত। (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত, হাদিস : ১২/১১৯-১২০)

মুসাফাহার দোয়া : মুসাফাহার অন্যতম অংশ হলো, মুসাফাহা করার সময় একে অপরের জন্য দোয়া করা। এটি আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর আমল। হুজায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই তাঁর সাহাবিদের কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তাঁর সঙ্গে মুসাফাহা করতেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করতেন। (নাসায়ি, হাদিস : ২৬৭)। তাই মুসাফাহার সময় ‘ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম’ পড়ে, একে অপরের জন্য দোয়া করা যেতে পারে। (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ১২/১২১)

পরনারীর সঙ্গে মুসাফাহা : ইসলামের দৃষ্টিতে বেগানা নারীর সঙ্গে মুসাফাহা বা হ্যান্ডশেক করা জায়েজ নেই।

আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না’—এ আয়াত পাঠ করে স্ত্রীলোকদের কাছ থেকে বায়আত নিতেন। তিনি আরো বলেন, যাদের হাতে হাত দেওয়া বৈধ এমন মহিলা বাদে রাসুল (সা.)-এর হাত অন্য কোনো মহিলার হাত স্পর্শ করেনি। (বুখারি, হাদিস : ৭২১৪)

বিদায়কালে মুসাফাহা : বিদায়কালে মুসাফাহা সম্পর্কে কিছু কিছু ওলামায়ে কিরামের মতানৈক্য থাকলেও অধিকাংশ ওলামায়ে কিরামের মতে বিদায়ের সময়ও সালামের মতো মুসাফাহা করার প্রমাণ পাওয়া যায়। (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ১২/১২৪)

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো লোককে নবী (সা.) বিদায় দেওয়ার সময় তাকে নিজের হাতে ধরতেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের হাত নবী (সা.) থেকে না ছাড়াতেন সে পর্যন্ত তিনিও তার হাত ছাড়তেন না। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৪২)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা