kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মোবাইল ফোন ব্যবহারে করণীয় ও বর্জনীয়

মুফতি তাজুল ইসলাম ও মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



মোবাইল ফোন ব্যবহারে করণীয় ও বর্জনীয়

মোবাইল ফোনে কে আগে সালাম দেবে?

 

হাদিসে এসেছে, ‘কথা বলার আগে সালাম।’ তাই যে আগে কথা শুরু করবে, সে-ই সালাম দেবে। সাধারণত ফোন রিসিভকারীই আগে কথা বলে। তাই সে-ই আগে সালাম দেবে। অবশ্য কখনো রিসিভকারী যদি রিসিভ করে কথা না বলে বা কোনো কারণে কলকারী কথা শুনতে না পায় বা বুঝতে না পারে তখন কলকারীও সালামের মাধ্যমে মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।

 

 

অপরিচিত নারীর সঙ্গে সালাম আদান-প্রদান

গাইরে মাহরাম নারীর সঙ্গে প্রয়োজনে পর্দায় থেকে কথা বলা জায়েজ; যদি ফেতনার আশঙ্কা না থাকে। তাই মোবাইল ফোনে নারীদের সঙ্গে কথা বলতে হলে সালাম দিয়েই কথা শুরু করবে। যে আগে কথা বলবে সে সালাম দেবে। অনেক সময় যার নম্বরে কল করা হচ্ছে তিনি যদি বড় ও সম্মানী ব্যক্তি হন তখন তিনি সালাম দিলে এ সালামের উত্তর দেওয়া হয় না, বরং কলকারী উল্টো তাঁকে সালাম দেয়। এটি ভুল নিয়ম। তাই বড় ও সম্মানী ব্যক্তি রিসিভ করে সালাম দিলে অপর প্রান্ত থেকে এর শুধু উত্তরই দেবে। পাল্টা সালাম দেবে না। (সুনানে তিরমিজি : ২/৯৯)

 

উভয় পক্ষের সালাম মুখোমুখি হলে

যদি রিসিভকারী ও কলকারী উভয় একই সঙ্গে সালাম বলে, তবে প্রত্যেককেই উত্তর দিতে হবে। কিন্তু কেউ যদি আগে সালাম দেয়, তবে অপর পক্ষের জন্য উত্তর দেওয়া নির্ধারিত। সে ভুলে বা ইচ্ছাকৃত পাল্টা সালাম দিলে দ্বিতীয় ব্যক্তির সালাম উত্তর হিসেবে গণ্য হবে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ৫/৩২৫; রদ্দুল মুহতার : ৬/৪৯৬; শরহুল মুহাজ্জাব : ৪/৪৬৩)

 

মসজিদে মোবাইলের ব্যবহার

মসজিদ আল্লাহর ঘর। সেখানে অন্য ইবাদতের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা বৈধ নয়। অবশ্য ইবাদতের উদ্দেশ্যে এসে অন্য ইবাদতকারীর ক্ষতি না হয় এভাবে বৈধ কথাবার্তা বলার অবকাশ আছে। তবে মসজিদে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না বলাই উচিত। মসজিদে প্রবেশের আগেই রিংটোন বন্ধ করে দেওয়া উত্তম। বিশেষ করে, কেউ ইবাদতে মগ্ন থাকলে বা জামাতের সময় হলে এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া খুবই জরুরি। (আল-মুহাল্লাহ : ৩/১৬০; শরহুল মুনিয়া, পৃষ্ঠা ৬১০; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ৫/৩২১; ফাতহুল বারি : ১/৬৫৩; ইলামুস সাজিদ, পৃষ্ঠা ৩২৬)

 

আজান, জিকির, তিলাওয়াত রিংটোন হিসেবে ব্যবহার

তিলাওয়াত, জিকির ও তাসবিহ সব কিছুই মর্যাদাপূর্ণ বিষয়। আজান আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও তাসবিহ সংবলিত কিছু বাক্যের সমষ্টি, যা শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ ‘শিআর’ বা প্রতীক। এগুলোর ব্যবহার শুধু ইসলামী শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী হতে হবে। মোবাইল ফোনের রিংটোন হিসেবে এগুলোর প্রয়োগ অপব্যবহারের অন্তর্ভুক্ত। ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য বিক্রেতার জোরে জোরে সুবহানাল্লাহ বলা, তেমনি প্রহরী জেগে আছে—এ কথা বোঝানোর জন্য জোরে জোরে জিকির করা ইসলামী আইনজ্ঞরা অপব্যবহার হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সে হিসেবে মোবাইল ফোনে কল এসেছে—এটি বোঝাতে আজান, জিকির ও তিলাওয়াত ব্যবহারও একটি ভুল ব্যবহার।

এ ছাড়া রিং এলে কোরআনের তিলাওয়াত বেজে  উঠছে;  কিন্তু  অনেক  ক্ষেত্রে ব্যস্ততার দরুন তিলাওয়াতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ হয় না। আবার কল রিসিভ করার ব্যস্ততা তো আছেই। এসব কারণে তিলাওয়াতের আদব রক্ষা করে তা শোনা হয় না। দ্রুত রিসিভ করার কারণে তিলাওয়াত এমন স্থানে থেমে যায় যে ফলে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চারিত অংশের বিবেচনায় আয়াতের অর্থ বিকৃত হয়ে যায়। আবার মোবাইল ফোন নিয়ে টয়লেট কিংবা বাথরুমে প্রবেশের পর রিং এলে অপবিত্র স্থানে আল্লাহর পবিত্র কালাম, জিকির ও আজান বেজে ওঠে। এতে আল্লাহর কালামের অসম্মান হয়। (আত-তিবয়ান ফি আদাবি হামালাতিল কোরআন, পৃষ্ঠা ৪৬; হক্কুত-তিলাওয়াত, পৃষ্ঠা ৪০১; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ৫/৩১৫; আলাতে জাদিদা : ১/৩৭৬)

 

মোবাইল মেমোরিতে কোরআন তিলাওয়াত ডাউনলোড করা

মেমোরি কার্ড বা মোবাইল মেমোরিতে তিলাওয়াত ডাউনলোড বা রেকর্ড করা জায়েজ। এতে কোনো অসুবিধা নেই। এর হুকুম অন্যান্য রেকর্ডারের মতোই। তবে যখন তিলাওয়াত চালানো হবে তখন মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করতে হবে। অন্য কাজে ব্যস্ত থেকে তিলাওয়াতের রেকর্ড ছেড়ে দেওয়া তিলাওয়াতের শিষ্টাচার পরিপন্থী কাজ।

 

মোবাইলের স্ক্রিনে ছবি রাখা

স্ক্রিনে ছবি সেভ করে রাখলে ছবির প্রদর্শনী হয় এবং ছবি খুলে রাখা হয়, যা রহমতের ফেরেশতার আগমন থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। এ ছাড়া  ইসলামী শরিয়তে ছবির প্রকাশ ও প্রদর্শন নিষেধ করা হয়েছে। স্ক্রিনে মানুষ বা কোনো প্রাণীর ছবি সেভ করে রাখা যাবে না। স্ক্রিনের ছবিটি যদি কোনো মহিলার হয়, তবে গাইরে মাহরামের (যাদের সঙ্গে পর্দা ফরজ) জন্য ছবিটি দেখা এবং অন্যদের দেখানোর কারণেও গুনাহ হবে। এই বিষয়ে সতর্কতা আবশ্যক। (সহিহ বুখারি : ২/৮৮০; সহিহ মুসলিম : ২/২০০; আল-মাদখাল লি-ইবনিল হাজ : ১/২৭৩; বাদায়িউ সানায়ে : ১/৩০৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩৫৯; আলবাহরুর রায়িক : ৬/১৭২)

 

স্ক্রিনে আয়াত ও জিকিরের ক্যালিগ্রাফি রাখা

মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আল্লাহর নামের ক্যালিগ্রাফি বা লিখিত আয়াত কিংবা অন্য কোনো জিকির ইত্যাদি সেভ করে রাখা ঠিক নয়। কেননা এতে আল্লাহর নামের সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয় থাকে। মোবাইল ফোন সাধারণত সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করা হয় না। অনেক সময় বসার স্থানে, নিচেও থাকে, চার্জের প্রয়োজনেও নিচে রাখতে হয় ইত্যাদি। তাই এ ধরনের কোনো কিছু স্ক্রিন সেভারে রাখা ঠিক হবে না। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫০)

মিসড কল

বিনা প্রয়োজনে মিসড কল দিলে অনর্থক নেটওয়ার্ক ব্যস্ত রাখা হয়। বিনা প্রয়োজনে মিসড কল দিয়ে নেটওয়ার্ক ব্যস্ত রাখা উচিত নয়। এতে মোবাইল কম্পানিরও সমস্যা হয়। বিনা প্রয়োজনে মিসড কল দিলে মানুষ বিরক্ত হয়। তার কাজে ব্যাঘাত ঘটে। এসব কারণে বিনা প্রয়োজনে মিসড কল দেওয়া গুনাহ। তবে প্রয়োজনে মিসড কলের ব্যবহার বৈধ। যেমন কারো সঙ্গে এমন কথা হলো, তুমি প্রস্তুত হলে কিংবা অমুক স্থানে পৌঁছলে বা অমুক জিনিস পেলে অথবা অমুক ব্যক্তি এলে আমাকে মিসড কল দেবে। এসব ক্ষেত্রে মিসড কল দিলে সমস্যা নেই। অথবা কেউ যদি সহযোগিতার জন্য বলে, ‘তুমি আমাকে মিসড কল দিলেই আমি ব্যাক করব, তোমার কল করার প্রয়োজন নেই।’ এ ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা নেই।

 

ভুল নম্বরে ফ্লেক্সি হলে টাকা কে দেবে?

যে নম্বরে ফ্লেক্সি করা হবে সে নম্বরেই টাকা জমা হবে। ভুল নম্বরে করা হলে ভুল নম্বরে যাবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে টাকা উদ্ধার না করা গেলে দেখতে হবে কার ভুল হয়েছে। সাধারণত ফ্লেক্সিকারী গ্রাহকের নম্বর ভিন্ন খাতায় প্রথমে নোট করা হয়। সেটি কখনো দোকানি নিজে লেখে, কখনো গ্রাহকের হাতে লেখায়। দোকানি লিখলে গ্রাহকের জন্য ওই লেখা মিলিয়ে নেওয়া কর্তব্য। এরপর খাতার নোট করা নম্বরে ফ্লেক্সি না করে ভুলে অন্য নম্বরে করলে দায় দোকানির। এ বাবদ গ্রাহক থেকে কিছুই নিতে পারবে না। হ্যাঁ, গ্রাহক যদি স্বেচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু দিতে চায়, তবে তা নিতে বাধা নেই।

আর খাতায় যা লেখা হয়েছে দোকানি যদি সে নম্বরেই ফ্লেক্সি করে থাকে, তবে এ ভুলের ক্ষতিপূরণ গ্রাহককে দিতে হবে। অবশ্য দোকানি খাতায় ভুল নম্বর নোট করেছে—এ কথা প্রমাণিত হলে এ ভুলের দায় দোকানির, গ্রাহকের নয়।

 

রিচার্জ কার্ড নির্ধারিত মূল্য থেকে কমবেশিতে বিক্রি করা যাবে?

ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত মূল্য থেকে দুই থেকে চার টাকা বেশিতে মোবাইল রিচার্জ কার্ড বিক্রি করেন। আবার কেউ কেউ নির্ধারিত মূল্য থেকে কিছু কমও রাখেন। এভাবে কমবেশিতে মোবাইল কার্ড বিক্রি করা জায়েজ। এটি সুদ নয়। কেননা মোবাইল কার্ডের গায়ে যে মূল্য লেখা থাকে, তা মূলত একটি নির্ধারিত পরিমাণ টেলিযোগাযোগ সুবিধার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যান্য সেবার মতো এটিও একটি বিক্রয়যোগ্য সেবা। কার্ডের গায়ের দাম যেহেতু টাকা নয়, তাই তা কমবেশিতে বিক্রি করা সুদও নয়। তবে কোনো কম্পানি থেকে কোনো পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারিত করে দিলে ওই নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি করা উচিত। কমবেশি করা ঠিক নয়। কেননা এতে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। (ফাতহুল কাদির : ৬/১৫৯; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম : ১/৪০০)

 

মোবাইল ফোনে ভিডিও গেমস

মোবাইল ফোনেই ভিডিও গেমস? খেলার বিভিন্ন প্রগ্রাম থাকে। ক. এমন ভিডিও গেমস, যাতে কোনো জীবজন্তুর ছবি থাকে না। যেমন—বিমান, হোন্ডা, হেলিকপ্টার, রকেট, নৌযান, সাবমেরিন, গাড়ি, জাহাজ, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি। এসব প্রাণহীন বস্তু দিয়ে বিভিন্ন রকমের খেলা হয়। অথবা জীবজন্তু হলেও খুব ছোট কিংবা অস্পষ্ট হওয়ার কারণে নাক, কান, চোখ, মুখ ইত্যাদি বোঝা যায় যায় না, শুধু নকশার মতো মনে হয়। নিম্নোক্ত শর্ত সাপেক্ষে বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে এসব জিনিস বা অস্পষ্ট প্রাণী দিয়ে তৈরি করা ভিডিও গেমস খেলা জায়েজ। শর্তগুলো হলো—১. তাতে জুয়া না থাকা, ২. নামাজ নষ্ট না হওয়া, ৩. বান্দার হক নষ্ট না হওয়া, ৪. লেখাপড়া ও জরুরি কাজে কোনো ধরনের বিরূপ প্রভাব না পড়া, ৫. খেলার প্রতি নেশাগ্রস্ত বা সারাক্ষণ তাতে বিভোর হয়ে না থাকা।

খ. এমন ভিডিও গেমস, যাতে জীবজন্তুর ছবি স্পষ্ট থাকে। ছবির কারণে এসব গেমস খেলা এমনিতেই জায়েজ নেই। তদুপরি ওপরের শর্তাবলিও যদি সেখানে অনুপস্থিত থাকে, তবে তো কোনো কথাই নেই। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ১৭/৩১৮; এমদাদুল মুফতি, পৃষ্ঠা ৮৩০)

 

পাওনাদারের ভয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা

সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা জুলুম ও মারাত্মক অন্যায়। টালবাহানা যেভাবেই করা হোক না কেন, তা নাজায়েজ। নির্ধারিত তারিখে টাকা দিতে না পারলে আগেই তাকে না জানানো অথবা সে যেন যোগাযোগ করতে না পারে সে জন্য মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখা কিংবা মোবাইল ফোন খোলা রেখে শুধু পাওনাদারের নম্বরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখা বা সিম পরিবর্তন করে ফেলা ইত্যাদি। হ্যাঁ, ঋণগ্রহীতা যদি সময়মতো ঋণ পরিশোধে অসমর্থ হয়, তাহলে তার উচিত নিজেই পাওনাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিনয়ের সঙ্গে সময় বাড়িয়ে নেওয়া; যাতে পাওনাদার পেরেশান না হয় এবং সে যেন ঋণের টাকা প্রাপ্তির ব্যাপারে পূর্ণ আশ্বস্ত থাকে। (সহিহ মুসলিম : ২/১৮; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম : ১/৫০৮; মুসনাদে আহমদ : ২/১৮; আউনুল মাবুদ : ২/১২৯)

 

গভীর রাতে কল করা

কেউ কেউ রাত ১১-১২টার পর কিংবা আরো গভীর রাতে ফোন করে। একটিবারও ভেবে দেখে না আমি যাঁর কাছে কল করছি তিনি হয়তো এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লিখেছেন, খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কারো নামাজ, ঘুম বা জরুরি কাজের সময় ফোন করা জায়েজ নেই। কারণ এভাবে ফোন করলে তাকে অনুমতি ছাড়া কারো ঘরে প্রবেশ ও তার স্বাধীনতা বিনষ্ট করার মতোই কষ্ট দেওয়া হয়।

তাই যখন-তখন ফোন করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া অবশ্যই পরিহারযোগ্য। তা ছাড়া এশার নামাজের পর দুনিয়াবি কথাবার্তা বলাও শরিয়ত পছন্দ করে না। তবে যদি কেউ নিশ্চিন্ত হয় আমি যাঁকে কল করছি তিনি এখন জেগে আছেন এবং তাঁর সঙ্গে এ সময় কথা বললে কোনো অসুবিধা হবে না, তাহলে তাঁকে কল করা দূষণীয় নয়। অনুরূপ কোনো কথা যদি এমন জরুরি হয়, যা এখনই বলা দরকার, তবে তা-ও বলায় কোনো অসুবিধা নেই। (মা’আরিফুল কোরআন : ৬/৩৯৪; সুনানে তিরমিজি : ১/৪২)

 

মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া নাজায়েজ

দুষ্টুমি করে হলেও কাউকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া কিংবা নানা কথা বলে ভয় দেখানো বৈধ নয়। আর অন্যায় উদ্দেশ্যেও নয়। এটি মারাত্মক পাপের কাজ। হাদিসে এসেছে, একবার কিছুসংখ্যক সাহাবি নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গে সফর করছিলেন। পথিমধ্যে কোনো জায়গায় বিশ্রামের সময় সফরসঙ্গীদের একজন ঘুমিয়ে পড়লেন। অপর এক সাহাবি ঘুমন্ত সাহাবির সঙ্গে রাখা রশি আনতে গেলে তিনি ঘাবড়ে গেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানকে ভয় দেখানো জায়েজ নেই।’ (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩০)

 

একই সঙ্গে কতবার রিং দেওয়া যাবে?

অন্য প্রান্ত থেকে রিসিভ না করলে ফোনকারী একের পর এক রিং দিতেই থাকে। এভাবে ক্রমাগত রিং দেওয়া মোটেও উচিত নয়। নিয়ম হলো, তিনবার পর্যন্ত রিং দিয়ে ক্ষান্ত হয়ে যাওয়া। একবার পূর্ণ রিং দেওয়ার পর যখন অপর প্রান্ত থেকে রিসিভ হলো না তখন দ্বিতীয়বার রিং দেওয়ার আগে একটু চিন্তা করে নেওয়া এখন নামাজের সময় নয়তো? অথবা এটি তার আরাম বা জরুরি কোনো কাজের সময় নয়তো? এমন কোনো সময় হলে আর রিং না করা। এমন সময় না হলেও অন্তত কয়েক মিনিট বিরতি দিয়ে আবার রিং করা, যাতে তিনি নামাজে থাকলে বা অন্য কোনো বিশেষ জরুরি কাজে থাকলে তা থেকে অবসর হওয়ার সুযোগ পান। দ্বিতীয়বার ফোন রিসিভ না করলে খানিক বিরতি দিয়ে তৃতীয়বার রিং করা। এরপর আর রিং না করা। বিষয়টি অনেকটা ‘অনুমতি’ নেওয়ার মতো। কারো ঘরে ঢোকার সময় তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও যদি অনুমতি না পাওয়া যায়, তবে ফিরে আসার বিধান। তেমনি মোবাইল ফোনে রিং দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনবার পর্যন্ত রিং দিয়ে আর রিং না দেওয়া উচিত। অবশ্য একান্ত জরুরি হলে ভিন্ন কথা। (ফাতহুল বারি : ১১/৩৩)

 

মানুষের সামনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা

স্ত্রীর সঙ্গে বা একান্ত পারিবারিক কথা বলার সময় নিরিবিলি স্থান বেছে নেওয়াই উত্তম। কেননা এতে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত গোপন কথা প্রকাশের ভয় থাকে না। হাদিসে স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা অপরকে শোনানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ওই স্বামী, যে তার স্ত্রীর কাছে গমন করে এবং ওই স্ত্রী, যে স্বামীর কাছে গমন করে, অতঃপর সে স্ত্রীর গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেয়।’ (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৭৬)

হ্যাঁ, যদি জরুরি কোনো কথা হয় বা যে কথা স্বামী-স্ত্রীর একান্ত গোপনীয় বিষয় নয়, তা অন্যের সামনে বলতে কোনো দোষ নেই।

 

চোরাই মোবাইল ফোনসেট ক্রয়-বিক্রয়

ছিনতাই বা চুরি করা মোবাইল ফোনসেট জেনে-শুনে কেনা জায়েজ নেই। কেউ কিনলে এই ফোনসেট ক্রেতার জন্য ব্যবহার করা বৈধ নয়, বরং মালিক চেনা থাকলে তা মূল মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে ক্রেতা বিক্রেতার কাছ থেকে মূল্য ফেরত নিতে পারবে। মালিকের সন্ধান পাওয়া না গেলে যার থেকে কিনেছে তার কাছে মোবাইল ফোনসেট ফেরত দিয়ে মূল্য ফিরিয়ে নিতে পারবে। কারো কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া সেট হাতে পেলে তার একটি নিয়ম রয়েছে। তা ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ নেই। (আল মুহিতুল বোরহানি : ৭/৫৯; বাদায়িউস সানায়ে : ৬/৪৫; ফাতাওয়ায়ে খানিয়া : ৩/৪১৮, ফাতহুল কাদির : ৫/১৬৯)

 

ভিওআইপি সংযোগ নিয়ে বিদেশে কম খরচে কথা বলা

ভিওআইপি বা এই ধরনের লাইনে কথা বলা বৈধ নয়। কেননা এতে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ লাইন ব্যবহার করা হয়। সরকারের আদায়যোগ্য ফি অনাদায় থাকে এবং সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ব্যবসায় সহায়তা করা হয়। এ ছাড়া এতে অনেকগুলো টিঅ্যান্ডটি চোরাই লাইন থাকে। ভিওআইপি ব্যবসায়ীরা কোনো চোরাই লাইন ব্যবহার করলে এই খাত থেকে উপার্জিত অর্থ হালাল হবে না। তবে চোরাই লাইন ব্যবহার না করলে সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করে এই ব্যবসা করার জন্য গুনাহ হবে। তবে ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ অবৈধ গণ্য হবে না।

 

মিউজিক, গানের কলির রিংটোন

মিউজিক, বাদ্য ইত্যাদি গানের সঙ্গে শোনা বা গান ছাড়া পৃথকভাবে শোনা কবিরা গুনাহ। তাই যেকোনো ধরনের বাদ্য, মিউজিক টোন বা রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। তেমনি অবৈধ গানের কলি বা অংশবিশেষও রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা নাজায়েজ। মিউজিক বা গান রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করলে নিজে শোনার গুনাহ তো আছেই, সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকদের বাদ্য, গান শোনানোর গুনাহও হয়। এ ছাড়া এমন রিংটোন মসজিদে বেজে উঠলে মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়। তাই রিংটোন হিসেবে এর ব্যবহার নিতান্তই পরিহারযোগ্য। গান বা মিউজিক ছাড়া অন্যান্য শব্দ রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। (সুরা : লোকমান, আয়াত : ৬; সহিহ বুখারি : ২/৮৩৭; আলগিনা ফিল-ইসলাম, পৃষ্ঠা ৮৭; ফাতহুল কাদির : ৬/৪৮২)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা