kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

হাদিসের নির্দেশনা

উপদেশ কেন দেবেন কিভাবে দেবেন

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা   

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উপদেশ কেন দেবেন কিভাবে দেবেন

আবু রুকাইয়া তামিম বিন আউস আদ-দারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই নবী (সা.) বলেন, ‘দ্বিন হলো সদুপদেশ বা কল্যাণ কামনা।’ আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কার জন্য?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, মুসলমানের নেতার জন্য এবং সর্বসাধারণ মুসলিমের জন্য।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২০৫)। আলোচ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা ও সদুপদেশের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তিনি তাঁকে দ্বিন তথা ইসলামের প্রধান একটি দিক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

 

ইসলামে উপদেশের গুরুত্ব

আলোচ্য হাদিস থেকে ইসলামে সদুপদেশের গুরুত্ব বুঝে আসে। এ ছাড়া কোরআন-হাদিসে মুসলিম উম্মাহকে সদুপদেশের বিভিন্ন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন—

এক. সদুপদেশ রাসুলদের মিশন : পবিত্র কোরআনে নুহ (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং তোমাদের সদুপদেশ দিই।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৬২)

দুই. সদুপদেশ ঈমানের নিদর্শন : উপদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে পছন্দনীয় কাজে উদ্বুদ্ধ করা আর অপছন্দনীয় বিষয় থেকে বিরত রাখা। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা নিজের জন্য যা পছন্দ করো, তোমার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করো।’ (আল জামিউ বাইনাস সাহিহাইন, হাদিস : ১৯১৪)

তিন. মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের হক : নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক মুমিনের ওপর অন্য মুমিনের ছয়টি অধিকার রয়েছে। ১. অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে, ২. মারা গেলে তার জানাজায় উপস্থিত হবে, ৩. দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করবে, ৪. যখন সাক্ষাৎ হবে তাকে সালাম করবে, ৫. হাঁচি দিলে তার উত্তর দেবে (দোয়া পাঠ করবে), ৬. উপস্থিত-অনুপস্থিত সব সময় তার কল্যাণ কামনা করবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৭৩৭)

 

কল্যাণ কামনার ব্যাখ্যা

আলোচ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) পাঁচ শ্রেণির জন্য কল্যাণ কামনার কথা বলেছেন। যার প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে।

আল্লাহর জন্য কল্যাণ কামনা : আল্লাহর জন্য কল্যাণ কামনার অর্থ আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর সঙ্গে শরিক না করা, তাঁর গুণাবলির প্রতি অবিশ্বাস না করা, তাঁকে সব পরিপূর্ণ ও অত্যুচ্চ গুণে গুণান্বিত করা, আল্লাহকে সব অপূর্ণতা থেকে মুক্ত বলে জানা, তাঁর আনুগত্যে অটল থাকা ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা।

কিতাব ও রাসুলের জন্য কল্যাণ কামনা : আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের কল্যাণ কামনার অর্থ হলো, তাঁর রিসালাতের সত্যায়ন করা, সেসব বিষয়ের ওপর ঈমান আনা, যা তিনি নিয়ে এসেছেন। তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা। তাঁর অধিকারগুলোর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা দান করা। তাঁর পথ ও সুন্নাহ জীবিত রাখা, তাঁর কিতাব, শরিয়ত ও শিক্ষার প্রসার ঘটানো।

মুসলিম শাসকের কল্যাণ কামনা : সত্য পথে তাঁদের সাহায্য করা ও সে ব্যাপারে তাঁদের অনুসরণ করা। সঠিক পথের নির্দেশনা তাঁদের সামনে তুলে ধরা। কোনো বিষয়ে তাঁরা উদাসীন হলে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া ও সতর্ক করা। তাঁদের সুপথ প্রাপ্তির জন্য দোয়া করা।

মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা : তা হলো, ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের নির্দেশ দেওয়া। তাদের কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা। দ্বিনি শিক্ষার ব্যবস্থা করা। তাদের দোষ গোপন করা ও তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। কল্যাণকামিতার জায়গা থেকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। আর যা নিজের জন্য অপছন্দনীয় তা তাদের জন্যও অপছন্দ করা।

মুসলমানদের মধ্যে উপদেশ দান চালু থাকা উচিত, কেননা তা ঈমানকে পরিপূর্ণ করে। আবু দারদা (রা.) বলতেন, ‘যদি তোমরা চাও তা হলে অবশ্যই তোমাদের উপদেশ দেব। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তাঁর সেসব বান্দা প্রিয়, যারা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর বান্দাদের ভালোবাসে ও জমিনে নসিহতের আমল করে।’ (সিরাজুল মুলুক : ১/১৬৩)

 

উপদেশ যেমন হওয়া প্রয়োজন

মানুষের জন্য কল্যাণকামিতা ও উপদেশ দয়া ও সহমর্মিতা, সততা ও নিষ্ঠার জায়গা থেকেই হওয়া আবশ্যক। তার সঙ্গে যদি বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বার্থ জড়িত থাকে তবে তা প্রকাশ্যে ও জনবহুল স্থানে হওয়া প্রয়োজন। যেমন নবী-রাসুলরা দ্বিন প্রচার করতেন। আর যদি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য হয়, তবে তা একান্তে ও গোপনে হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইকে গোপনে নসিহত করে সে যেন তাকে সংশোধন করল এবং তাকে সুন্দর করল। আর যে ব্যক্তি তাকে প্রকাশ্যে নসিহত করল সে যেন তাকে অসম্মান করল এবং তাকে দোষী সাব্যস্ত করল।’ (শরহু মুসলিম : ১১/৩০)

 

লেখক : সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিসি), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা