kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বুদ্ধিমানরা তর্ক এড়িয়ে চলে

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বুদ্ধিমানরা তর্ক এড়িয়ে চলে

অনর্থক বাগিবতণ্ডা মানুষের অন্তর কঠিন করে তোলে। ইবরাহিম নখয়ি (রহ.) বলেন, এটি এমন একটি দুশ্চরিত্র, যাকে সালফে সালেহীনরা খুব ঘৃণা করতেন এবং এ থেকে অনেক দূরে থাকতেন।

আরবিতে ‘জিদাল’-এর অর্থ হলো—ঝগড়া করা ও কথা-কাটাকাটি করা। অর্থাৎ নিজের কথা সত্য প্রমাণ করার জন্য প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করা। আল্লামা জাজ্জাজ (রহ.) বলেন, আরবি ভাষায় ‘জিদাল’-এর প্রতিশব্দ হলো ‘মিরা’। ভাষাবিদদের মতে, উভয়টির অর্থ একই। তবে ‘মিরা’ দ্বারা অতি নিন্দনীয় বিতর্ক উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে, যা থেকে বিরত থাকার জন্য মহানবী (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করে বলেছেন, তোমরা পরস্পরের বিরোধিতা কোরো না; তাহলে তোমাদের অন্তরগুলো বিভক্ত হয়ে যাবে। (মুসলিম, হাদিস : ৮৫৮)

অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তোমরা মতবিরোধ বা পরস্পরের বিরোধিতা কোরো না; কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা মতবিরোধের কারণেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। (বুখারি, হদিস : ৩৪৭৬ ও ২৪১০)

বিশেষত মূর্খদের এড়িয়ে চলতে আদেশ দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।

অর্থাৎ যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদের সঙ্গে কথা বলে, তখন তারা বলে ‘সালাম’। এখানে ‘জাহেল’ শব্দের অর্থ বিদ্যাহীন ব্যক্তি নয়; বরং যারা মূর্খতার কাজ ও মূর্খতাপ্রসূত কথাবার্তা বলে, যদিও বাস্তবে বিদ্বানও বটে। মূর্খ মানে অশিক্ষিত বা লেখাপড়া না জানা লোক নয়, বরং এমন লোক যারা জাহেলি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং কোনো ভদ্রলোকের সঙ্গে অশালীন ব্যবহার করতে শুরু করেছে। রহমানের বান্দাদের পদ্ধতি হচ্ছে, তারা গালির জবাবে গালি এবং দোষারোপের জবাবে দোষারোপ করে না। (ফাতহুল কাদীর, কুরতুবী, বাদাইউত তাফসির)

কোরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর যখন তারা কোনো বেহুদা কথা শোনে, তা উপেক্ষা করে যায়। বলে, আমাদের কাজের ফল আমরা পাব এবং তোমাদের কাজের ফল তোমরা পাবে। সালাম তোমাদের, আমরা জাহেলদের সঙ্গে কথা বলি না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৫৫)

ফরিদুদ্দিন আত্তার (রহ.) বলেন, ‘মূর্খের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করার মানেই হলো পাথরের ওপর হাত দ্বারা আঘাত করা। এতে হাতই ক্ষতবিক্ষত হবে, পাথরের কী হবে? কারণ তা তো নির্জীব।’

পারস্য কবি শেখ সাদি (রহ.) বলেন, কোনো ‘জ্ঞানী যদি মূর্খের মোকাবেলায় পড়ে, তবে তার কাছ থেকে সম্মানের আশা করা ঠিক নয়। আর কোনো মূর্খ যদি জ্ঞানী লোকের মোকাবেলায় জিতে যায়, তবে আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ পাথরের আঘাতে মতির বিনাশ সহজেই হয়ে থাকে।’ (শেখ সাদি)

কাজেই আমাদের উচিত প্রতিপক্ষের কঠোর কথাবার্তার জবাব নম্র ভাষায়, ক্রোধের জবাব সহনশীলতার সঙ্গে এবং মূর্খতাসুলভ হট্টগোলের জবাব গাম্ভীর্যপূর্ণ কথাবার্তার মাধ্যমে দেওয়া। কারণ ইসলামের শিক্ষা হলো প্রয়োজন বোধ হলে বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনা করতে হবে উপযুক্ত যুক্তি-প্রমাণসহকারে, ভদ্র ও শালীন ভাষায় এবং বুঝবার ও বোঝাবার ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। এর ফলে যার সঙ্গে আলোচনা হয় তার চিন্তার সংশোধন হবে। বিশেষত বর্তমান ভাবধারা প্রচলিত ওয়াজ মাহফিলগুলোর সম্মানিত বক্তাদের চিন্তা করা উচিত বিদ্ধেষমূলক হুংকার না দিয়ে; বরং তিনি কোন ভাষায় কথা বললে শ্রোতার হৃদয় দুয়ার উন্মুক্ত করে সত্য কথা তার মধ্যে বসিয়ে দিতে পারবেন এবং তাকে সঠিক পথের দিশা দিতে সক্ষম হবেন। দ্বিন প্রচারের ক্ষেত্রে এটি কোরআনি নির্দেশনা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে দাওয়াত দাও হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সদ্ভাবে; নিশ্চয়ই তোমার রব, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়েছে, সে সম্পর্কে বেশি জানেন এবং কারা সৎপথে আছে তা-ও তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন। (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

আর এই জন্যই জ্ঞানীরা বলেছেন, ‘তর্কে জেতা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তর্কে না জড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ।’ আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অহেতুক বিরুদ্ধাচরণ থেকে বেঁচে থাকার সুযোগ দান করুন। সেই সত্য-সঠিক বোঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা