kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

কানের সিদ্ধ ও নিষিদ্ধ ব্যবহার

মোস্তফা কামাল গাজী   

২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কানের সিদ্ধ ও নিষিদ্ধ ব্যবহার

দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কান। কানের মাধ্যমে আমরা শুনতে পাই, অপরের কথা বুঝতে পারি। মানুষের বোধ ও উপলব্ধির মাপকাঠি এ কান। এটি পঞ্চেন্দ্রিয়ের অন্যতম একটি অঙ্গ।

কান বলতে কেবল বাইরের অংশটিকে বোঝালেও কানের ভেতরে আরো অংশ রয়েছে। কানকে মোট তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। বহিঃকর্ণ, মধ্যকর্ণ এবং অন্তঃকর্ণ। বহিঃকর্ণের ফের তিনটি অংশ রয়েছে। কানের বাইরের অংশটিকে পিনা বা কর্ণচ্ছত্র বলে। এই অংশটি স্থিতিস্থাপক তরুণাস্থি দিয়ে তৈরি। এ জন্যই একে আমরা ভাঁজ করতে পারি। পিনার পরে একটি সরু ছিদ্রপথ চলে গেছে কানের ভেতরে, আর সেই ছিদ্রপথের শেষ অংশে রয়েছে একটি পর্দা। কানের ভেতরে চলে যাওয়া সরু ছিদ্রপথটিকে বহিঃঅডিটরি মিটাস বা কর্ণকুহর বলে এবং ওই পর্দাটিকে বলে টিম্পেনিক পর্দা বা কর্ণপট।

মধ্যকর্ণে তিনটি অংশ রয়েছে; কর্ণাস্থি, ইউস্টেশিয়ান নালি ও কর্ণছিদ্র। আমাদের কানের ভেতর তিনটি হাড় বা অস্থি আছে। হাড়গুলোর নাম ম্যালিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস এবং ঠিক এই ক্রমেই তারা সজ্জিত থাকে। হাড়গুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। ম্যালিয়াস দেখতে হাতুড়ির মতো। ইনকাস দেখতে নেহাইয়ের মতো এবং স্টেপিস দেখতে ঘোড়ার জিনের পা-দানির মতো স্টেপিস মানবদেহের সবচেয়ে ছোট হাড়।

আমাদের মধ্যকর্ণে দুটি ছিদ্রও আছে। তাদের নাম ফেনেস্ট্রা ওভালিস এবং ফেনেস্ট্রা রোটান্ডা। আমাদের কানের হাড় স্টেপিস কানের ছিদ্র ফেনেস্ট্রা ওভালিসের সঙ্গে লাগানো অবস্থায় থাকে। মধ্যকর্ণের আরেকটি অংশ হলো ইউস্টেশিয়ান নালি। ইউস্টেশিয়ান নালি গলবিলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। আমাদের নাক, কান দুটিই গলবিলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইউস্টেশিয়ান নালি আমাদের কানের মধ্যকার চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। যদি হঠাৎ কোনো বিকট শব্দ আমাদের কানে প্রবেশ করে, সে ক্ষেত্রে ইউস্টেশিয়ান নালি দিয়ে বাড়তি চাপটা বের হয়ে যায়। ইউস্টেশিয়ান নালি না থাকলে বিকট শব্দ হলে আমাদের কানের পর্দা ফেটে যেত।

কানের তৃতীয় ভাগ অন্তঃকর্ণে দুটি অংশ রয়েছে। ইউট্রিকুলাস ও স্যাকুলাস। ইউট্রিকুলাস আমাদের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে এবং স্যাকুলাস শ্রবণে সাহায্য করে।

মহান আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নিয়ামত এই অঙ্গ। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের চোখ, কান ও আত্মা দিয়েছেন যাতে তোমরা অনুগ্রহ স্বীকার কর।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৭৮)

এখানে আল্লাহ তাআলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে আমরা মূলত কিছুই ছিলাম না। নিজের ভালো-মন্দের খবর পর্যন্ত রাখতে পারতাম না। এই অবস্থায় তিনি আমাদের দিয়েছেন চোখ, কান ও অন্তঃকরণ, যেন এগুলো দ্বারা আমরা বুঝতে, জানতে এবং উপলব্ধি করতে পারি।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বারবার কানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এর উপকারিতা বিভিন্নভাবে ব্যক্ত করেছেন। এটি আল্লাহ তাআলার সেরা দানসমূহের অন্যতম। বধিরই কেবল এ নিয়ামতের যথার্থ মূল্য বোঝে। আল্লাহ তাআলা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুণের মধ্যে কানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। কারণ, ঈমান ও বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে এ দুটো অঙ্গের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। অন্তঃকরণ, চোখ ও কান—এই তিনটি বস্তু সৃষ্টি করে মানুষের ওপর যে অসীম করুণা বর্ষণ করেছেন, তা তিনি এভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য কান, চোখ ও অন্তঃকরণ সৃষ্টি করেছেন তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকো।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৭৮)

অন্যত্র বলেছেন, ‘বলো, তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি ও অন্তঃকরণ। তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা মুলক, আয়াত : ২৩)

আল্লাহ তাআলা এ নিয়ামতের কথা উল্লেখ করে আরো বলেন, ‘বলো, আসমান ও জমিন থেকে কে তোমাদের রিজিক দেন? অথবা কে তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিগুলোর মালিক?’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৩১)

কিয়ামতের দিন কান সম্পর্কে মানুষ আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসিত হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই চোখ-কান ও আত্মা এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)

অতি মূল্যবান এই অঙ্গের নিয়ামত সম্পর্কে মানুষ আজ বড্ড উদাসীন। আল্লাহর পবিত্র সত্তার পরিচয় লাভ, তাঁর সৃষ্টিরাজি সম্পর্কে যথার্থ চিন্তা ও গবেষণা, তাঁর নিদর্শনসমূহ অনুধাবন করা থেকে বঞ্চিত। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান জাগতিকভাবে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও মূল্যবান এই অঙ্গ দ্বারা প্রকৃত উপকারিতা ও সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারেনি। উপরন্তু আল্লাহপ্রদত্ত এ গুণ ব্যয় করা হচ্ছে অপাত্রে। নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিকে অকেজো-নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে।

এই অঙ্গের মাধ্যমেই মানুষ এই মহাজগতের বিস্ময় সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছে। এ জন্য এর গুরুত্ব, ব্যবহারবিধি, প্রয়োগস্থল এবং সৃষ্টিগত তাৎপর্য অনেক বেশি। মূল্যায়ন বিচারে এর কোনো বিকল্প বস্তু হতে পারে না। এ জন্য আমরা যারা সুস্থ ও নিখুঁত দেহের অধিকারী তাদের জন্য উচিত, এর প্রয়োগ সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা। গুনাহের সংস্রব থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুনাহের মধ্যে কানের একটি বিশাল অংশ রয়েছে। রাসুল (সা.) হাদিসে বারবার এই অঙ্গের গুনাহ সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চোখ ও কানের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো।’

বর্তমান সমাজে এই অঙ্গের মাধ্যমে অসংখ্য গুনাহ হয়ে থাকে। গান-বাজনা এবং গিবত শ্রবণ এর অন্যতম। তাই আমাদের এসব গুনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষক, জামিয়াতু ইলয়াস আল ইসলামিয়া টঙ্গী, গাজীপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা