kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

কোরআনের দৃষ্টিতে যারা মানবিক মানুষ

সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে হাসানি নদভি   

২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কোরআনের দৃষ্টিতে যারা মানবিক মানুষ

কোরআন মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ একটি সর্বজনীন গ্রন্থ। তা কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্থান বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার মানবিক শিক্ষা বৈশ্বিক ও বিশ্বজনীন। যার মাধ্যমে মানুষ মনুষ্যত্ব ও মানবিক জীবন লাভ করতে পারে। কোরআনের শিক্ষা ও নির্দেশনার বড় অংশই এমন যা সব সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য। যেমন, জুলুমের প্রতিদানে জুলুম না করা, শত্রুর সঙ্গেও ভালো আচরণ করা, প্রদর্শনপ্রিয়তা পরিহার করা, কার্পণ্য ও অর্থ অপচয় থেকে বিরত থাকা, অসহায় মানুষের সেবা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, মা-বাবার সেবা করা, ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান করা, পরনির্ভরতা থেকে বেঁচে থাকা ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা এসব গুণাবলি অর্জন করেছিলেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বে মদিনায় একটি সাম্যভিত্তিক মানবিক ও আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। যারা এক শতাব্দীর মধ্যে পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়। পবিত্র কোরআনে সেই সমাজ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ও সম্পত্তি থেকে উত্খাত হয়েছে। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যাশ্রয়ী। আর তাদের জন্যও যারা মুহাজিরদের আগমনের আগে এই নগরে বসবাস করেছে এবং ঈমান এনেছে। তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য অন্তরে কোনো আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। অভাবগ্রস্ত হওয়ার পরও তারা তাদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফলকাম। (সুরা হাশর, আয়াত : ৮-৯)

অন্য আয়াতে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর প্রসংশায় বলা হয়েছে, ‘আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকার পরও তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের খাবার খাওয়ায়।’ (সুরা দাহর, আয়াত : ৮)

ভালোর চর্চা ও মন্দের পরিহার করাও কোরআনের দৃষ্টিতে মানবিকতার অন্তর্ভুক্ত। এটা উম্মতে মুহাম্মদির ওপর অর্পিত একটি দায়িত্বও বটে। মুসলমান নিজেরাও কল্যাণের পথে চলবে এবং অন্যকে কল্যাণের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করবে। কেননা পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে ভালো-মন্দের ব্যাপারে সচেতনতা না থাকলে তা সামগ্রিক কল্যাণ নষ্ট করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে নিষেধ কোরো। আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)

কোনো পথহারা পথিককে পথ দেখানো, রাস্তা থেকে কাঁটা, পাথর বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা দূর করাও ইসলামের দৃষ্টিতে মানবিকতার দাবি। তবে এই কল্যাণকামিতা হতে হবে নিঃস্বার্থ। এর বিনিময়ে প্রশংসার প্রত্যাশা করা, খ্যাতি ও সুনামের আশা রাখা আর তা না পেয়ে কাউকে খোঁটা দেওয়া অমানবিক। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানগুলো নষ্ট কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬২)। এই আয়াত থেকে আরো বোঝা যায়, কোনো কোনো আর্থিক দানের চেয়ে উত্তম কথা বলা এবং ভালো আচরণ করা বেশি পুণ্যের। তাই কথা বা আচরণের মাধ্যমের কাউকে কষ্ট দিলে এই পুণ্য নষ্ট হয়ে যায়। কোরআনের শিক্ষা হলো, মানুষ মানুষের উপকার করবে কোনো প্রকার সংকোচ ও স্বার্থচিন্তা ছাড়া। সে হাসিমুখে দান করবে এবং আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান আশা করবে।

কোরআনের মানবিক শিক্ষা কোনো আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। তা সাধনা ও চর্চার বিষয়। ব্যক্তিগত জীবন থেকেই মানবিকতার চর্চা শুরু হবে। ফলে কোরআন একদিকে যেমন মানুষকে বিনয় ও নম্রতা শিখিয়েছে, তেমনি আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে অভাবগ্রস্ত দুস্থ মানুষকে ধৈর্যের শিক্ষা দিয়েছে। যেন সবার সম্মিলনে ভারসাম্যপূর্ণ একটি সমাজ গঠন করা সম্ভব হয়। পৃথিবীর শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য ইসলাম সব শ্রেণির ওপর মানবিক কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছে। কেবল বিনয়, নম্রতা ও অল্পতুষ্টি নয়; ইসলাম মানুষকে প্রত্যয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দৃঢ়তা, সৎসাহস ও আত্মসচেতনতাও শেখায়। কোরআনের মানবিক শিক্ষার সৌন্দর্যই হচ্ছে তা সামগ্রিক ও মানব প্রকৃতির অনুকূল, ফলে তা সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য। মানবিক এই শিক্ষা ঈমানের অংশ। যার পূর্ণতার ওপর মুসলিম উম্মাহর উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভরশীল। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৯)

পাক্ষিক তামিরে হায়াত থেকে আতাউর রহমান খসরুর ভাষান্তর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা