kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

অনলাইনে প্রতারণা

প্রতারণা মুমিনের কাজ নয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতারণা মুমিনের কাজ নয়

ইসলামে নিজ হাতে উপার্জিত খাবার গ্রহণে অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাবার থেকে উত্তম কোনো খাবার নেই; আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জিত খাবার খেতেন।’ (বুখারি : ২০৭২)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘ঈমান আনার পর হালাল উপার্জন অন্যতম কর্তব্য।’ (শুআবুল ঈমান : ৮৩৬৭)

উপার্জনের জন্য যুগ যুগ ধরে মানুষ বিভিন্ন পেশা অবলম্বন করে আসছে। বর্তমানে জনপ্রিয় একটি পেশা হলো ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমান বিশ্বে তরুণদের কাছে এটি একটি লোভনীয় পেশা। মানুষের এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু লোক নতুন নতুন ফাঁদ পাতা শুরু করেছে। এমন অনেক ওয়েবসাইট আত্মপ্রকাশ করছে, যারা আমাদের সরলমনা তরুণদের স্বপ্ন চুরি করছে। তাদের প্রতারিত করছে। তাদের ব্যবহার করে প্রতারিত করছে তাদের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের।

উদাহরণস্বরূপ, কিছু ওয়েবসাইট এমন আছে, যেগুলো মানুষকে সহজে আয়ের লোভ দেখিয়ে তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এই ওয়েবসাইটগুলো থেকে আয় করা অনেক সহজ ভেবে অনেকেই তাদের ফাঁদে পা দেয়। এ ধরনের ওয়েবসাইটগুলোতে অ্যাকউন্ট করা খুব সহজ। কোনো ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হয় না। প্রতিবার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে দু-চারটি বিজ্ঞাপন দেখলেই অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যায় ৫০ থেকে ১০০ ডলার। এত সহজেই যখন উপার্জন করা সম্ভব, তাহলে কে চাইবে এই সুযোগ হাতছাড়া করতে? আবার কাউকে রেফার করে যদি এখানে অ্যাকাউন্ট করানো যায়, তাহলে রয়েছে বোনাসের ব্যবস্থা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো প্রতারণার বিভিন্ন চকচকে ফাঁদমাত্র। যেখানে মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রতারিত করা হয়। যেমন, কেউ এই  ওয়েবসাইটগুলোতে ইনকাম করেই তা উত্তোলন করতে পারে না। প্রথমত সেখানে থাকা বিভিন্ন পেমেন্ট মেথডের মাধ্যমে উপার্জিত টাকাগুলো দেশে আনার চেষ্টা করতে হয়। এর সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো, পেপাল কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদি।

যখনই গ্রাহক তাদের টাকা উত্তোলনের জন্য নিজেদের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দেন, তখনই বাধে বিপত্তি। তাদের কার্ডের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হ্যাকারদের হাতে। ফলে তাদের কার্ডে থাকা অর্থগুলোও হ্যাকাররা হাতিয়ে নেয়।

তবে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষেরই যেহেতু ক্রেডিট কার্ড নেই, তাদের প্রতারিত করার জন্য রয়েছে ভিন্ন আয়োজন। তারা প্রথমে হাজার হাজার ডলার ইনকামের আশায় প্রতারকচক্রের ওয়েবসাইটে থাকা বিজ্ঞাপনগুলো ভিজিট করে, তাদের ভিডিও শেয়ার করে, তাদের নিয়ে ভালো ভালো রিভিউ বানায়, যার মাধ্যমে প্রতারকরা খুব আরামে বসেই অন্যদের বিনা পয়সায় খাটিয়ে ইনকাম করতে পারে। দ্বিতীয় ধাপ হলো, তারা যখন ডলার উত্তোলন করতে যাবে, তখন তাদের শর্ত দেওয়া হবে যে আপনি অন্তত ৫০ জন রেফার না করলে আপনার অর্থগুলো ট্রান্সফার করা যাবে না। আর সর্বশেষ ধাপ থাকে, আপনার অ্যাকাউন্টের অর্থগুলো যথাযথভাবে পেতে আমাদের অ্যাকাউন্টে কিছু ডলার প্রেরণ করুন। স্বাভাবিকভাবে মানুষ হাজার ডলার পাওয়ার জন্য সামান্য কিছু ডলার প্রেরণ করতে পারে। আর যখনই মানুষ তাদের অ্যাকাউন্টে ডলার পাঠায়, এরপর তাদের অ্যাকাউন্টই হারিয়ে যায়।

এ ধরনের ব্যবসা এর আগেও বাংলাদেশে ছিল। যারা মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছে। এত কিছুর পরও দেশের সরলমনা স্বপ্নবাজ ছেলেরা কোনো কাজে দক্ষতা অর্জন না করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পা দিচ্ছে। অথচ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, মুমিন একই গর্তে দুইবার দংশিত হয় না। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৬২)

এবং কোনো মুমিন ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে এ ধরনের কাজের জন্য কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস নম্বর : ১০২)

শুধু এই পদ্ধতিতেই নয়। আরো অনেক পদ্ধতিতে বাংলাদেশের যুবকদের প্রতারিত করা হচ্ছে। যুবকদের উচিত এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পা না দিয়ে দক্ষতা অর্জন করা। হালালভাবে উপার্জন করা। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার দক্ষ ফ্রিল্যান্সার গড়তে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সেখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে আস্তে আস্তে সামনে এগোনো যেতে পারে।

উপার্জনের জন্য কারো দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে প্রতারণার পথ বেছে নেওয়া মুমিনের কাজ নয়। এগুলো কপট লোকদের অভ্যাস। কোরআন ও হাদিসে এদের মুনাফেক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যার মধ্যে চারটি স্বভাব আছে, সে প্রকৃত মুনাফিক। আর যার মধ্যে এ চারটি থেকে কোনো একটি স্বভাব আছে, সেটি ত্যাগ করা পর্যন্ত তার মধ্যে কপটতার একটি স্বভাব বিদ্যমান। ওই চার স্বভাব হলো, যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, তখন সে তা খেয়ানত করে; যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে; যখন সে অঙ্গীকার করে, প্রতারণা করে, আর যখন সে বিবাদে জড়ায়, গালাগাল করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪, মুসলিম, হাদিস : ৫৮)

যারা এ ধরনের ব্যবসায় নামে, তাদের খুব বেশি মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। প্রতারণার আশ্রয় নিতে হয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে এমন ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা