kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মুসলিম বিশ্বে ঔপনিবেশিক শিক্ষার প্রভাব

সাইয়েদ ওয়াজেহ রাশিদ হাসানি নদভি (রহ.)   

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুসলিম বিশ্বে ঔপনিবেশিক শিক্ষার প্রভাব

বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শিক্ষা মানবসভ্যতার জন্য একটি সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শিক্ষার কারণে শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোই নয়, বরং উন্নত রাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এতে সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা হচ্ছে ঔপনিবেশিক শিক্ষা ধর্ম ও নৈতিকতা বিবর্জিত হওয়ার কারণে। শিক্ষা যখন ধর্ম ও নৈতিকতা বিবর্জিত হয়, তখন স্বার্থপর ও আপন বৃত্তে আবদ্ধ একটি জাতিসত্তার বিকাশ ঘটে। আর কেউ আত্মচিন্তার দেয়াল ভেদ করতে পারলেও সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে বের হতে পারে না। তার চিন্তাভাবনা ও প্রচেষ্টা তাদের ওপর আবর্তিত হতে থাকে। একসময় তারা আরো বেশি আত্মমুখী ও কট্টর সাম্প্রদায়িক চিন্তায় আক্রান্ত হয়। অথচ সে ভাবে, একটি বৈশ্বিক ও স্বাধীন সমাজে বসবাস করছে। যে সমাজে আঞ্চলিক, সাম্প্রদায়িক ও গোত্রীয় বৈষম্য নেই। মানুষকে বোঝানো হচ্ছে, সে একটি সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করছে অথচ তাদের হৃদয় ঘৃণা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য উদগ্রীব।

আধুনিক সমাজব্যবস্থায় গোত্রীয় ও আঞ্চলিক বিভাজন দূর করার নানামুখী উদ্যোগ দেখা গেলেও দিন দিন তা বাড়ছেই। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টার পরও আত্মমুখী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব হুমকি হয়ে উঠছে এবং বৈশ্বিক সম্প্রীতির চেয়ে আঞ্চলিক সম্প্রীতি-সমঝোতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্ণবৈষম্যবিরোধী তুলুম আন্দোলন হলেও উন্নত বিশ্বের রাজনীতি ক্রমেই বর্ণাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। উন্নত বিশ্বেও সামাজিক বিভক্তি এখন স্পষ্ট। স্বাধীনতার বিপরীতে সবখানেই দাসত্ব নানারূপে, নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করছে। উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ও সমাজকাঠামোয় বল্গাহীন ব্যক্তিস্বাধীনতা এখন তাদের সামাজিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এতে সামাজিক বিভক্তি প্রকট হচ্ছে। কোনো সন্দেহ নেই, তা হচ্ছে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষার ফল হিসেবে। কেননা এই শিক্ষার প্রাণসত্তায় মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার কোনো স্থান নেই। আত্মবিভোরতা, ভোগবাদ ও আধিপত্যবাদের বিষ ছড়িয়ে আছে এই শিক্ষার অণুতে-রেণুতে। ফলে পৃথিবীতে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। পৃথিবীতে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন মারণাস্ত্রের মজুদ বেশি, যা পুরো মানবসভ্যতাকে সীমাহীন অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মুসলিম দেশগুলোও এই ধ্বংসযাত্রার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ভয়াবহ সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা দেখা যাচ্ছে এবং যার সমাধানে বিশ্ব নেতৃত্ব, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সামরিক শক্তি ব্যর্থ হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে (উগ্র) জাতীয়তাবাদ, আধিপত্য ও (উম্মাহ চিন্তার বাইরে) বিচ্ছিন্ন চলার মনোভাব। বিচ্ছিন্নতা ও সংঘাত মুসলিম বিশ্বের একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে, যা একদিকে শক্তির মহড়া বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পরস্পরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের কোথাও বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো শক্তির উত্থান হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল তার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাকে আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ দিতে সব ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা চোখে পড়ে। যদিও তা শেষ পর্যন্ত দেশ ও জাতির জন্য আত্মঘাতী হয়ে ওঠে।

বিচ্ছিন্নতাই মুসলিম বিশ্বের জন্য, সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ সামগ্রিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব বহু দূর পর্যন্ত এগিয়ে যেতে এবং পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক শক্তি হতে পারত। মুসলিম বিশ্বের সংকট কাটিয়ে উঠতে মানবিক মূল্যবোধ ও সম্মান, ভ্রাতৃত্ব ও বৃহত্তর চিন্তার বিকাশের মাধ্যমে, তা সৃষ্টি করতে পারে শুধু ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ সংবলিত শিক্ষা। ধর্ম ও নৈতিকতাই মানবীয় সাম্য ও ঐক্যের মূল ভিত্তি। বিশ্বাসের ঐক্য মানুষকে আঞ্চলিকতার সংকীর্ণতা থেকে বের করে নিয়ে এসে বৃহত্তর ঐক্যের পথ দেখাতে পারে। মূলত পৃথিবী থেকে ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর এবং মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের শিকার হওয়ার পর তাদের ওপর নতুন শিক্ষা কারিকুলাম ও জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়। যার প্রভাবে মুসলিম বিশ্ব উম্মাহ চিন্তা থেকে বের হয়ে আসে এবং সেখানে (উগ্র) জাতীয়তাবাদী চিন্তার উন্মেষ ঘটে। এতে মুসলিম বিশ্ব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃত্তে ভাগ হয়ে যায়। অর্ধশতাব্দীকাল না যেতেই মুসলিম দেশগুলোর একলা চলো নীতি তাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে। এই মহাসংকট থেকে বের হয়ে আসতে হলে মুসলিম বিশ্বে সর্বাত্মক ধর্মীয় জাগরণ প্রয়োজন। শিক্ষা ও সামাজিক জাগরণের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে আত্মমুখী চিন্তা থেকে বের করে আনা অপরিহার্য। (সংক্ষেপিত)

ভাষান্তর : মুফতি আবদুল্লাহ নুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা