kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মানুষের জন্য আসমানি জ্ঞান অপরিহার্য কেন

আতাউর রহমান খসরু   

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানুষের জন্য আসমানি জ্ঞান অপরিহার্য কেন

মানুষ যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরো বহুদূর এগিয়ে যায়, পৌঁছে যায় সমুদ্রের গভীরতম স্থানে, উন্মোচন করে মহাকাশের সব রহস্য, তবু কি মানুষ ও মানবসভ্যতা আল্লাহর প্রদত্ত ঐশী শিক্ষা থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারবে? নাকি এই শিক্ষার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে? যেমন এই সময়ের বহু মানুষের দাবি। তারা নবী-রাসুল (আ.)-এর ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাঁদের প্রচারিত জ্ঞানের প্রতি সংশয় পোষণ করে এবং জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ঐশী জ্ঞানের ওপর প্রাধান্য দেয়। আল্লাহ কোরআনে এই শ্রেণির মানুষের তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, ‘তাদের কাছে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের রাসুলগণ আগমন করতেন, তারা তখন তাদের জ্ঞানের দম্ভ করত। তারা যা নিয়ে হাসি-বিদ্রুপ করত, তা-ই তাদের বেষ্টন করল।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৮৩)

শুধু অমুসলিম ও অবিশ্বাসীরাই নয়; বরং ঈমানের দাবিদার বহু মানুষ দ্বিনি শিক্ষা ও ধর্মীয় জীবনযাপনের প্রয়োজন অনুভব করে না। তারা কোরআন ও হাদিসের নানা বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের চেষ্টা করে এবং বলতে চায়, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার এই স্তরে এসে ঐশী জ্ঞান তার আবেদন হারিয়েছে; বরং তা উন্নয়ন ও প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

 

ঐশী শিক্ষাই সব কল্যাণের আধার

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘পার্থিব যেকোনো বিষয়ের চেয়ে বান্দার জন্য আবশ্যক হলো, রাসুলগণ ও তাঁদের শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাঁরা যা নিয়ে এসেছেন তা সত্যায়ন করা এবং তাঁদের আদেশ মান্য করা। কেননা পার্থিব ও অপার্থিব কল্যাণের চাবি আল্লাহ তাঁদের হাতেই দিয়েছেন এবং তাঁদের এড়িয়ে ভালো ও মন্দের পার্থক্য সবিস্তারে জানা সম্ভব নয়। তাঁদের বাতলানো পথ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন অসম্ভব। কথা, কাজ ও নৈতিকতার যাবতীয় কল্যাণ তাঁদের প্রদর্শিত পথ ও শিক্ষায়ই নিহিত। নবী-রাসুলগণ অন্য সবার জন্য পরিমাপক। তাঁদের কাজ দিয়ে নিজের কাজকে, তাঁদের কথা দিয়ে নিজের কথাকে এবং চরিত্র দিয়ে নিজের চরিত্রকে যাচাই করে নিতে হবে। তাঁদের আনুগত্যের মাধ্যমেই সত্যের অনুসারীরা ভ্রান্তদের থেকে পৃথক হবে। নববী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেহের জন্য আত্মার, আত্মার জন্য জীবন এবং চোখের জন্য জ্যোতির প্রয়োজনীয়তা থেকে বেশি। মানবজাতির যেকোনো প্রয়োজন থেকে ঐশী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন পথ হারিয়ে ফেলে এবং নিজের ধ্বংস নিজের চোখে দেখতে পারে, রাসুলগণের আনা শিক্ষা থেকে বিচ্যুত মানুষের অবস্থা এর চেয়েও বিপজ্জনক। তবে এই বিপদ অনুভূত হওয়ার জন্য সপ্রাণ হৃদয় প্রয়োজন।’ (জাদুল মাআদ : ১/৬৯)

 

চাই জাগ্রত হৃদয়

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘মানবজাতির জন্য রিসালাত বা আসমানি শিক্ষা ও হেদায়াত অপরিহার্য। এই প্রয়োজনটি সব প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। রিসালাত পৃথিবীর আত্মা, তার আলো ও জীবন। আত্মা, আলো ও জীবন ছাড়া পৃথিবীর কল্যাণ কিভাবে সম্ভব? রিসালাতের সূর্য ছাড়া পৃথিবী অভিশপ্ত ও অন্ধকার। তেমনিভাবে সেই হৃদয়ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন, যাতে রিসালাতের সূর্য আলো ফেলেনি। তার জীবন ও জীবনসত্তা অন্ধকারে নিমজ্জিত। সে মৃত। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত ছিল, পরে আমি যাকে জীবিত করেছি এবং যাকে মানুষের মধ্যে চলাচলের জন্য আলো দিয়েছি, সে কি ওই ব্যক্তির মতো যে অন্ধকারে আছে এবং সেখান থেকে বের হতে পারছে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১২২)। আল্লাহ এখানে ঈমানের বর্ণনা দিয়েছেন। মুমিন প্রথমে অজ্ঞতার মধ্যে ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে রিসালাতের প্রাণশক্তি ও ঈমানের আলো দ্বারা জীবিত করেছেন। তাকে সভ্য সমাজে চলার মতো জ্যোতির্ময় (জ্ঞানী) করেছেন। আর অবিশ্বাসীদের অন্তর মৃত এবং তারা রয়েছে অন্ধকারে। (মাআলিমু উসুলিল ফিকহ ইন্দা আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, পৃষ্ঠা ৭৮)

 

মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধি কি ওহির ঊর্ধ্বে?

মানুষ তার বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে ভালো-মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম—এ কথা কোনো মুসলিম অস্বীকার করে না। আল্লাহ মানুষকে এই শক্তি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। যেমন তাদের দিয়েছেন ইন্দ্রিয় শক্তি। যার মাধ্যমেও তারা উপকারী ও ক্ষতিকর, সুন্দর ও কুৎসিত ইত্যাদির পার্থক্য বুঝতে পারে। তাই আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো, মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক আপন সীমায় গ্রহণযোগ্য; যতক্ষণ তা ঐশী জ্ঞানের বিপরীত না হয়। আর যখন উভয়ের ভেতর সংঘাত দেখা দেবে, তখন আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানই চূড়ান্ত বিবেচিত হবে। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘মানব মেধাপ্রসূত জ্ঞান-বিজ্ঞান কখনো রাসুলগণের আনীত বিধি-বিধান ও শিক্ষার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। কেননা অসংখ্য যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা নবী-রাসুলদের সত্যতা প্রমাণিত। তাঁরা আল্লাহর নামে শুধু সত্যই প্রচার করেন। তাঁদের কাছে প্রেরিত বাণীগুলো আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত। দ্বিন ও দ্বিনি শিক্ষার প্রচারে তাঁদের ওপর মিথ্যার অপবাদ দেওয়া বৈধ নয়। এ ব্যাপারে সব আসমানি ধর্মের অনুসারী (মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি) একমত। সুতরাং মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধির বিপরীতে ঐশী শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়।’ (মাকামুল আকলি ইন্দা শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, পৃষ্ঠা ৬৩)

 

মানবীয় জ্ঞানের দুর্বলতা

ইসলাম মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধিকে চূড়ান্ত মনে করে না। কারণ মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা জীবনের সব কল্যাণ, পৃথিবীর সব সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়। যেমন—স্রষ্টার পরিচয় ও পরকালীন জবাবদিহির ওপর পৃথিবীর শৃঙ্খলা ও মানবজাতির কল্যাণ নিহিত। অথচ তা ঐশী জ্ঞান ছাড়া জানা সম্ভব নয়। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞান একটি আপেক্ষিক বিষয়। সব মানুষের জ্ঞান যেমন সমান নয়, আবার সব কল্যাণের ব্যাখ্যা সবার কাছে সমান নয়; বরং তা অস্থিতিশীল ও পরিবর্তনযোগ্য। তা স্থান-কাল-সময় ও পরিবেশ-প্রতিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানবীয় জ্ঞান তার আবেদন হারায়। তাই মানুষের চূড়ান্ত কল্যাণ শুধু মহান স্রষ্টার পক্ষেই নির্ধারণ করা সম্ভব। যার কাছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য, জাগতিক ও মহাজাগতিক সব রহস্যের দ্বার উন্মোচিত। সুতরাং চূড়ান্ত সত্তা-প্রদত্ত জ্ঞান উপেক্ষা করে মানবীয় জ্ঞানের ওপর নির্ভর করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এ কথাই বলেছেন নিম্নের বাক্যে, ‘নবীগণ সেই জ্ঞান নিয়ে এসেছেন, যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি অর্জনে অক্ষম।’ (আল-আকিদাতু ফি দাওয়িল কোরআনি ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৩৬)

 

ওহি কি মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধি অস্বীকার করে?

ইসলাম মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধির জন্য একটি সীমা-পরিসীমা নির্ধারণ করে দিলেও তার গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করে না; বরং তার বিকাশকে উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনে মানুষকে চিন্তাভাবনা ও গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে কোরআনে জ্ঞান-বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার ধারক বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়। যেমন—‘আফালা তাকিলুন’ (তোমরা কি বুঝবে না?), ‘আফালা তুবসিরুন’ (তোমরা কি ভেবে দেখবে না?), ‘আফালা তাতাফাক্কারুন’ (তোমরা কি চিন্তা করবে না?) ও ‘আফালা তাজাক্কারুন’ (তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?) এভাবেই মহান আল্লাহ তাঁর দেওয়া জ্ঞান-বুদ্ধির কল্যাণকর ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা