kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

নবী-রাসুলদের দেশাত্মবোধ

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নবী-রাসুলদের দেশাত্মবোধ

দেশ আল্লাহর অমূল্য নিয়ামত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। সেখানে তোমাদের জন্য আবাসনের (দেশের) ব্যবস্থা করেছেন।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬১)

মানুষ স্বভাবগতভাবেই তার মাতৃভূমিকে ভালোবাসে। যত দূরেই যাক, মাতৃভূমির প্রতি এক অদৃশ্য টান তার মধ্যে থেকেই যায়। যাঁরা প্রবাসে থাকেন, কোনো দেশি মানুষ পেলেই তাঁর মনটা অনেক বড় হয়ে যায়। এর কারণ, তিনি তাঁর মাতৃভূমিকে ভালোবাসেন। তাঁর দেশকে ভালোবাসেন।

আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলরাও তাঁদের মাতৃভূমিকে ভীষণ ভালোবাসতেন। এ কারণেই তাঁদের গোত্রের লোকেরা তাঁদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করার হুমকি দিত। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা কুফরি করেছে, তারা তাদের রাসুলদের বলল, আমরা তোমাদের আমাদের ভূখণ্ড থেকে অবশ্যই বের করে দেব, অথবা তোমরা অবশ্যই আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে। অতঃপর তাদের রব তাদের কাছে ওহি পাঠালেন, আমি অবশ্যই জালিমদের ধ্বংস করে দেব। আর নিশ্চয়ই আমি তাদের পর তোমাদের জমিনে বাস করতে দেব। এটা তার জন্য, যে আমার অবস্থানকে ভয় করে এবং ভয় করে আমার ধমকের।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ১৩-১৪)

ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, যখনই কোনো উম্মত তাদের নবীদের অস্বীকার করেছে ও তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে, তাদের ওপর আজাব এসেছে।

মাতৃভূমির প্রতি মানুষের এই টান মহান আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে মাতৃভূমি ত্যাগকে তিনি বড় কোরবানি বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি আমি তাদের ওপর লিখে দিতাম যে তোমরা নিজেদের হত্যা করো কিংবা নিজ গৃহ (মাতৃভূমি) থেকে বের হয়ে যাও, তাহলে তাদের কমসংখ্যক লোকই তা বাস্তবায়ন করত। আর যে উপদেশ তাদের দেওয়া হয়, যদি তারা তা বাস্তবায়ন করত, তাহলে সেটি হতো তাদের জন্য উত্তম এবং স্থিরতায় সুদৃঢ়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৬৬)

উল্লিখিত আয়াতের মূল বক্তব্য হলো, যারা শরিয়ত মেনে চলতে গিয়ে সামান্য কষ্ট সহ্য করতে পারে না, তারা দেশত্যাগ কিংবা জীবন উৎসর্গের মতো বড় কোনো কোরবানি করতেই পারবে না।

মাতৃভূমি একটা মানুষের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভূমিতে আঘাত করা ও মাতৃভূমি থেকে কাউকে বিতাড়িত করা অমার্জনীয় অপরাধ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘দ্বিনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের তোমাদের বাড়ি-ঘর (মাতৃভূমি) থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করছেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। (সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)

বনি ইসরাঈলদের মধ্যে অজ্ঞতা এত বেশি বিস্তার লাভ করেছিল এবং তারা অমুসলিম জাতির নিয়ম, আচার-আচরণে এত বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েছিল যে খিলাফত ও রাজতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্যবোধ তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা একজন খলিফা নির্বাচনের নয়; বরং বাদশাহ নিযুক্তির আবেদন করেছিল। তারা বলেছিল, ‘আমাদের কী হয়েছে যে আমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করব না, অথচ আমাদেরকে আমাদের গৃহসমূহ থেকে বের করা হয়েছে এবং আমাদের সন্তানদের থেকে (বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে)?...(সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৪৬)

উল্লিখিত আয়াতে বনি ইসরাঈল মাতৃভূমির প্রতি তাদের অগাধ ভালোবাসা থেকেই তারা এ কথা বলেছে।

শুধু তা-ই নয়, আল্লাহর দ্বিনের জন্য মাতৃভূমি হারানো মুহাজিরদের মহান আল্লাহ বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এই সম্পদ নিঃস্ব মুহাজিরদের জন্য এবং যাদের নিজেদের ঘরবাড়ি ও ধন-সম্পত্তি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ এরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির অন্বেষণ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সাহায্য করে। এরাই তো সত্যবাদী।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৮)

মুসা (আ.) তাঁর মাতৃভূমিকে এত ভালোবাসতেন যে তিনি ফেরাউনের মৃত্যুর পর আবার আপন ভূমিতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর মুসা যখন মেয়াদ পূর্ণ করল এবং সপরিবারে যাত্রা করল, তখন সে তুর পর্বতের পাশে আগুন দেখতে পেল। সে তার পরিবার-পরিজনকে বলল, ‘তোমরা অপেক্ষা করো, আমি আগুন দেখতে পেয়েছি, সম্ভবত আমি তা থেকে তোমাদের কাছে আনতে পারব কোনো খবর, অথবা একটি জ্বলন্ত অঙ্গার, যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পারো।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৯)

এ সফরে মুসা (আ.)-এর তুর পাহাড়ের দিকে যাওয়া দেখে অনুমান করা যায়, তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্ভবত মিসরের দিকে যেতে চেয়েছিলেন। কারণ মাদিয়ান থেকে মিসরের দিকে যে পথটি গেছে, তুর পাহাড় তার ওপর অবস্থিত। সম্ভবত মুসা (আ.) মনে করে থাকবেন, ১০টি বছর চলে গেছে, যে ফেরাউনের শাসনামলে তিনি মিসর থেকে বের হয়েছিলেন সে মারা গেছে, এখন যদি আমি নীরবে সেখানে চলে যাই এবং নিজের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে অবস্থান করতে থাকি, তাহলে হয়তো আমার কথা কেউ জানতেই পারবে না। মুসা (আ.) এ কাজ করেছিলেন মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা থেকেই।

আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-ও তাঁর মাতৃভূমিকে খুব ভালোবাসতেন। একবার রাসুল (সা.) মক্কাভূমিকে উদ্দেশ করে বলেন, কতই না পবিত্র ও উত্তম শহর তুমি এবং আমার কাছে কতই না প্রিয়। আমার স্বজাতি যদি তোমার থেকে আমাকে বিতাড়িত না করত, তবে আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কোথাও বসবাস করতাম না। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৯২৬)

তাই আমাদের উচিত মাতৃভূমিকে ভালোবাসা এবং মাতৃভূমিকে বাঁচানোর জন্য যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের সম্মান করা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা