kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

বিশ্বসভ্যতায় বায়তুল হিকমাহর ঋণ

মোহাম্মাদ শফিউল্লাহ কুতুবী

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্বসভ্যতায় বায়তুল হিকমাহর ঋণ

বিশ্বসভ্যতাকে বায়তুল হিকমাহ অনেক কিছুই দিয়েছে। সমকালীন অন্যান্য জাতি যে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ছিল এই সংস্কৃতিকেন্দ্র সভ্যতাকে তা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। আহরিত জ্ঞানভাণ্ডারে যে বিষয়াদি মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর সাব্যস্ত হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে উপকারীগুলো গ্রহণ করা হয়েছে। সমকালীন বিশ্বসভ্যতা থেকে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, চিকিৎসা, দর্শন ও সাহিত্যের মতো বিষয় কেবল মানবসভ্যতার উপাদেয়গুলোকে আহরণ করা হয়েছে উদারভাবে। বেশির ভাগ অনুবাদ ও সংকলন গ্রিক, ফারসি ও হিন্দি থেকে করা।

ঐতিহাসিক জুরজি যায়দান (১৮৬১-১৯১৪ খ্রি.) বলেন, প্রত্যেক জাতির কাছে রক্ষিত সর্বোত্তম শিল্পসম্পদগুলোই সংগৃহীত হয়েছিল। সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের গ্রন্থ নির্বাচন করা হয়েছে। যেমন—দর্শন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, যুক্তিশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, জাদুবিদ্যা বিষয়ে নাবাতি সভ্যতা ও কালদানির ওপর; সাহিত্য, আইন, ইতিহাস বিষয়ে পারসিয়ানদের ওপর; চিকিৎসায় ভারতীয়দের ওপর; ভূমি উন্নয়ন, কৃষি, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, লোককাহিনিতে আনবাত ও কালদানের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। রসায়ন, শল্যবিদ্যায় মিসরিদের ওপর নির্ভরতা ছিল। এভাবে জ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার গ্রহণ করা হয় আসুরিয়ান, ব্যাবিলনীয়, মিসরি, পারস্য, ভারতীয় ও গ্রিক সভ্যতার কাছ থেকে। সংগৃহীত সম্পদকে যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সারনির্যাসের উপকরণে গড়ে উঠেছে সুরম্য বিশ্বসভ্যতার মজবুত ইমারত, যা ‘আহরিত জ্ঞান-বিজ্ঞান’ হিসেবে পরিচিত (জুরজি যায়দান, তা.বি: ৩/১৮২)।

এই সংগ্রহ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ঐতিহাসিক জুরজি যায়দান বলেন, মুসলমানরা অপরাপর জাতিসমূহের সব কিছু ঢালাওভাবে নেননি; যেমন—পারস্য সাহিত্যভাণ্ডার থেকে তারা রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস, অবদান, কীর্তি সম্পর্কিত বিষয়াবলি, শাহনামার তরজমা ইত্যাদি নিয়েছেন, কিন্তু হিরোদোেসর ইতিহাস বিষয়ে কিছুই নেয়নি, যেমনটি বর্জন করেছে। ইগ্রাবুন, ইলইয়াসা-হুমিরোস, উজিস্তার ভূগোলবিষয়ক গ্রন্থাদি।

ঐতিহাসিক জুরজি যায়দান আরো বলেন, ইলইয়াসার গ্রন্থগুলো বর্জনের কারণ হলো এসবের মধ্যে বহুত্ববাদী তত্ত্ব আর দেব-দেবীদের অলীক কাহিনির আধিক্য ছিল। চিন্তা, গবেষণা ও দর্শনের আহরিত এসব উপাদানকে মুসলমানরা তাদের নিজস্ব উত্তরাধিকারলব্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে এভাবে পরাগায়ণ ঘটিয়েছেন, যার মাধ্যমে পুরো মানবজাতির জন্য অনন্য উপকারী, এক অভূতপূর্ব সাহিত্য আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের ফসল ফলানো সম্ভবপর হয়েছে। অন্যদিকে চিকিৎসা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রকৌশল, গণিতসহ গবেষণালব্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উম্মোচিত করেছে।

সবাই এ কথা স্বীকার করে নিয়েছেন যে বীজগণিতের ক্ষেত্রে আল-খাওয়ারেজমির অবদান সর্বপ্রধান। তাঁর ‘আল-মুকাবিলা’ এ বিষয়ে লিখিত প্রথম গ্রন্থ। আল-খাওয়ারেজমির পর প্রাচ্য-প্রতীচ্যের অনেক শিক্ষাবিদ রেফারেন্স বুক ও উৎসগ্রন্থ হিসেবে তাঁর বইয়ের ওপর নির্ভর করেছেন (আল বারকুবি, ১৯৬৪ : ৯৯)। এই গ্রন্থ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি নিজ গ্রন্থে বলেন, ‘খলিফা মামুনুর রশিদ আমাকে বীজগণিত সম্পর্কে তুলনামূলক বিশ্লেষণধর্মী এমন একটি গ্রন্থ রচনায় উৎসাহিত করেছেন, যেখানে হিসাববিজ্ঞানের সূক্ষ্ম বিষয়াদির সমাধান, এতত্সংক্রান্ত জরুরি সূত্রগুলোর বর্ণনা, উত্তরাধিকার বণ্টন, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি পরিমাপ, নদী জরিপ, প্রকৌশলবিদ্যা ইত্যাদির তত্ত্বীয় আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

মামুনুর রশিদের শাসনামল ও বায়তুল হিকমাহর পরিবেশ-পরিধি দুটোই ছিল জ্যোতির্বিদ্যার মৌলিক ভিত্তি রচনা ও উৎকর্ষের যুগ। এ সময়কালে প্রকৃত জ্যোতির্বিদ্যার সুষ্ঠু বিকাশ, প্রয়োজনীয় উন্নতি ও তার প্রতিটি অংশ আপন অবস্থানে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ফলে এটি ইসলামী সভ্যতার একটি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নিজস্ব জ্ঞানসম্পদে পরিণত হয়। গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যার ক্রমবিকাশের বেলায় একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, শীর্ষ মুসলিম প্রকৌশলী ও জ্যোতির্বিদগণ কেবল তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে তাঁদের কাজ শেষ করেননি; বরং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এটাকে একটা সুবিন্যস্ত ও পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রে রূপ দিয়েছেন।

বায়তুল হিকমাহর এক দল বিশেষজ্ঞ ভূমি জরিপকাজের জন্য বেরিয়ে পড়েন। খলিফা মামুনুর রশিদ ভূমির উচ্চতা, অক্ষাংশ, দ্রাঘিমা রেখা ইত্যাদি পরিমাপের জন্য এক দল বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত করেছিলেন। তারা উত্তর ইরাকের টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী সিনজার এলাকায় একটি সার্ভে কাজ পরিচালনা করেন। কম্পাস, ফিতা, স্কেল, রশি প্রভৃতি যন্ত্রপাতি তাঁদের সঙ্গে ছিল। তাঁরা পৃথিবীর উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর উচ্চতাসহ বিভিন্ন ভৌগোলিক বিষয়াদি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ইঙ্গিত ও রেখা অঙ্কন করেন। প্রয়োজনীয় স্তম্ভ ও চিহ্ন স্থাপন করে দিয়েছেন। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর উচ্চতা মাপার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে রশি ফেলে স্কেলের সাহায্যে উচ্চতা নির্ণয় করেছিলেন। যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ধাপের রেখা অঙ্কন সম্ভব হয়েছে। প্রথম স্তম্ভটির গোড়ায় রশির যে মাথাটি ধরা হয়েছে রশির অপর প্রান্তের উচ্চতা প্রমাণ করেছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর উঁচু-নিচুর তারতম্য। ঠিক একই সময়ে আরেক দল বিশেষজ্ঞ অনুরূপ কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তবে ভিন্ন জায়গায়। উভয় দল তাদের সার্ভে কাজ সমাপ্তির পর যখন ফিরে এলো পৃথিবীর উচ্চতা, গোলার্ধ, দূরত্ব, পরিমাপ ইত্যাদিতে উভয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে যথার্থতা ছিল সন্তোষজনক।

আমরা উল্লেখ করেছি, খলিফা মামুনুর রশিদ কর্তৃক রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস সংকলনের জন্য আসমায়ি এবং আরবি ব্যাকরণ, ভূগোল, টেকনিক্যাল, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণার জন্য ইমাম ফাররাকে নিয়োজিত করার কথা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এ শাখাগুলো পরবর্তীকালে সভ্যতা নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাসবেত্তা আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৭) যথার্থই মন্তব্য করেছেন, মামুনের রাজত্বকাল সন্দেহাতীতরূপে ইসলামের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল ও গৌরবময় যুগ (Ameer Ali, 2001:278)

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে আব্বাসীয় খলিফা মামুনুর রশিদের হাতে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ বায়তুল হিকমাহর অবস্থান ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা এবং এর প্রসারে বিশ্বসভ্যতার জন্য বাতিঘরতুল্য। তৎকালে ‘বায়তুল হিকমাহ’ মধ্যযুগ ও আধুনিক বিশ্বের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গৌরব অর্জন করেছিল। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজ্ঞানচর্চার ব্যাপকতা লাভ করে। বাগদাদ এ সময়ে ইউরোপ ও এশিয়ার জ্ঞানপিপাসুদের মিলনস্থলে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানে মুসলমানদের মৌলিক গবেষণা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের আধুনিক বিজ্ঞানে অবদান রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা