kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় মুসলমানদের অবদান

আতাউর রহমান খসরু

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় মুসলমানদের অবদান

বর্তমানে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হলে সিগমুন্ড ফ্রয়েড, ইভান পাভল্ভ ও কার্ল রজার্সের নাম যেভাবে উচ্চারিত হয়, যেসব মুসলিম মনীষী এই শাস্ত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন তাঁদের নাম সেভাবে উচ্চারিত হয় না। উনিশ শতকে এসে তাঁদের নাম দুঃখজনকভাবে আড়াল করা হয়েছে এবং এই ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ শাস্ত্রের উদ্ভবই হয়েছে উনিশ শতকে—যখন নানা কারণে মানুষের মনোবৈকল্য দেখা দিয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, মানুষ এর আগেও মনস্তাত্ত্বিক সংকটে ভুগেছে এবং তার চিকিৎসা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই জানে না, বিশেষত ইউরোপের মানুষ যে ইসলামপূর্ব মিসরে যুগ যুগ ধরে মানসিক রোগের চিকিৎসা, মাথার খুলিতে সার্জারির চর্চা ছিল। তবে পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের মানুষ যখন মাথার খুলিতে ‘ধাতব অস্ত্রোপচার’ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ইসলামী ভূখণ্ডের চিকিৎসকরা মানসিক রোগের যৌক্তিক, মানবিক ও ‘মেডিকিন্যাল’ চিকিৎসা দিয়েছেন। এসব চিকিৎসক নিজেদের ‘মনোবিজ্ঞানী’ বা ‘মনোচিকিৎসক’ দাবি না করলেও ‘মনোবিজ্ঞান’-এর উদ্ভাবন ও উন্নয়নে তাঁদের অসামান্য অবদান ছিল।

 

পৃথিবীর প্রথম মানসিক হাসপাতাল

গ্রিক চিকিৎসক ও ‘অ্যানাটমিস্ট’রা প্রথম মানসিক ভারসাম্যহীনদের ওপর গবেষণা করেন এবং মানসিক রোগ চিহ্নিত করেন। তবে মুসলিমরাই মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রথম বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। অষ্টম খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। যেখানে অন্যান্য রোগের মতো মানসিক রোগের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো এবং তা ছিল সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক। কোনো মন্ত্রতন্ত্র বা ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে নয় বা মাথার খুলিতে অস্ত্রোপচার করেও নয়। মানসিক চিকিৎসায় যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো, তার বেশির ভাগই আধুনিক যুগের মনোচিকিৎসকরা ব্যবহার করে থাকেন। যেমন—ওষুধ প্রয়োগ, হিলিং বাথ, অকুপেশনাল থেরাপি, মোটিভেশনাল ডিসকাশন ইত্যাদি।

হাসপাতাল বা বিমারিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম চিকিৎসকরা মানসিক রোগের চিকিৎসার পদ্ধতি ও মানসিক রোগীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে অভাবনীয় অবদান রাখেন। তাঁরা বোঝাতে সক্ষম হন, মানসিক রোগ অন্য শারীরিক সমস্যার মতোই একটি সমস্যা এবং তার বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক চিকিৎসা প্রয়োজন। অবশ্য ইসলাম শুধু ‘মনোরোগ’ নয়; সমগ্র চিকিৎসাশাস্ত্রকে কুসংস্কারমুক্ত করে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলেছে। ইসলামের আগে কোনো ধর্ম ঘোষণা করেনি ‘সব রোগের আরোগ্য আছে, যখন সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, আল্লাহর ইচ্ছায় রোগের আরোগ্য হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২০৪)। মনোরোগ চিকিৎসায় অবদান রাখা তিনজন মুসলিম মনীষী ও তাঁদের অবদানের কথা তুলে ধরা হলো—

 

ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.)

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে সিনার অসামান্য অবদান সর্বজনস্বীকৃত। মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন ধরনের মনোরোগের চিকিৎসায় তিনি প্রথম নকশা বা কাঠামো তৈরি করেন এবং এ ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলসহ গ্রিক দার্শনিকদের সূত্র ও মতামতের বিশ্লেষণ করেন। সেগুলোর উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। তিনি অ্যারিস্টটলের ‘থ্রি সউল’ (তিন আত্মা) ধারণাকে স্বীকৃতি দেন। তা হলো, দ্য ভেজেটেটিভ (উদ্ভিজ্জ), দ্য সেনসিটিভ (সংবেদনশীল) ও দ্য রেশিওনাল (বিচারশক্তিসম্পন্ন)।

তিনি আত্মার শ্রেণিবিন্যাসের এই তত্ত্বের বিশ্লেষণে বলেন, ভেজেটেটিভ ও সেনসিটিভ (উদ্ভিজ্জ ও সংবেদনশীল) আত্মার সঙ্গে মানুষের পার্থিব কর্মকাণ্ড সম্পৃক্ত আর রেশিওনাল বা বিচারশক্তিসম্পন্ন আত্মার মাধ্যমে মানুষ স্রষ্টাকে চেনার ও তাঁর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার শক্তি অর্জন করে। মূলত তৃতীয় প্রকারের আত্মাই মানুষকে অন্যান্য প্রাণী (পশু) থেকে পৃথক করেছে।

ইবনে সিনা ‘মানুষের ভেতর সাতটি ইন্দ্রিয় সক্রিয়’ তত্ত্বটি প্রমাণ করেছেন। তা হলো, ‘কমন সেন্স’, ‘রেটেনটিভ ইমাজিনেশন’, ‘কম্পসাইট এনিম্যাল ইমাজিনেশন’, ‘কম্পসাইট হিউম্যান ইমাজিনেশন’, ‘স্টেমেটিভ পাওয়ার’, ‘মেমোরি’ ও ‘প্রসেসিং’। এগুলোর মাধ্যমে মানুষ বিচার-বিবেচনা, চিন্তা ও বিশ্লেষণে সক্ষম হয়। ইবনে সিনার এই তত্ত্বটি থেকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। তাঁর ‘সেভেন সেন্স’ তত্ত্বটি খ্রিস্টীয় নবম শতকে ‘দ্য থিওরি অব রিজোনিং’কে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল।

তাঁর রচিত ‘আল কানুন ফিত-তিব্ব’ বা ‘দ্য ক্যানন অব মেডিসিন’ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০০ বছরের বেশি সময় চিকিৎসা বিভাগের পাঠ্য ছিল।

 

আল রাজি (৮৫৪-৯২৫ খ্রি.)

মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় অবদান রাখা অপর মুসলিম বিজ্ঞানী আল রাজি। তিনি বাগদাদে স্থাপিত মানসিক হাসপাতালের মনোচিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর ‘আল মানসুরি’ ও ‘আল হাভি’ বইয়ে একাধিক মানসিক রোগের বিবরণ ও তার চিকিৎসা পদ্ধতি তুলে ধরেছেন। তাঁর ‘দ্য বুক অব মেডিসিন’-এর ‘ব্যাক ফ্লাপ’-এ লেখা আছে, তিনি রোগ নিরাময়ে ‘সাইকোলজি অব সেলফ-এজটিম’ (আত্মসম্মানের মনোবিজ্ঞান) তত্ত্ব ব্যবহারের জন্য পরিচিত।

 

ইমাম গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১ খ্রি.)

শিশুদের নিয়ে ওয়াটসনের বিখ্যাত নিরীক্ষা এবং তার ভিত্তিতে ‘শিশুরা পারিপার্শ্বিক কারণে ভীত হয়’ মত দেওয়ার শত বছর আগে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ‘মন্দ অভিজ্ঞতা শিশুর মনে ভয় পুঞ্জীভূত করে।’ তিনি নিজের ওপর তাঁর ‘দ্য মেথড অব ইন্ট্রোসপেকশন’ (আত্মদর্শন পদ্ধতি) প্রয়োগ করেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সর্বপ্রথম ক্ষুধা ও ক্রোধের মতো মানবীয় গুণাগুণ মানুষকে কেমন আচরণ করতে বাধ্য করে এবং তা নিরাময়ের পদ্ধতি কী, তা বিশ্লেষণ করেন। তার বহু পরে মাসলো ও হুল এ বিষয়ে আলোচনা করেন।

একসময় মানসিক রোগী—যাদের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন ছিল পরিবার ও সমাজ তাদের পরিত্যাগ করত বা ‘শয়তান’ তাড়ানোর নামে অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো, কিন্তু মুসলিমরা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে যখন তাদের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার ব্যবস্থার করল, তখন সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলো। মানুষ ঝাড়ফুঁকের পরিবর্তে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ও মনোরোগের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসায় মনোযোগী হলো। এভাবেই আধুনিক মনোবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হলো। জটিল জটিল মনোরোগের চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুধ আবিষ্কৃত হলো। আজকের ঐতিহাসিকরা মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দিক বা না দিক মুসলিমরা তাদের অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ!

সূত্র : মুসলিম মেমো

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা