kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

মহানবী (সা.)-এর হাসি-কান্না

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মহানবী (সা.)-এর হাসি-কান্না

সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ, আবেগ-অনুভূতি মানবজীবনেরই অংশ। একজন মানুষ হিসেবে মহানবী (সা.)ও মানবীয় এসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর জীবনেও ছিল হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি।

হাসি-কান্না আল্লাহর সৃষ্টি

ব্যক্তির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ ও বিষাদের মধ্যে কারো কোনো দখল নেই; বরং স্রষ্টার ইচ্ছায় সে হাসে, কাঁদে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর তিনি হাসান ও কাঁদান এবং তিনিই মারেন ও বাঁচান।’ (সুরা নামল, আয়াত : ৪৩-৪৪)

 

আসমান-জমিনও কাঁদে

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবী কেউ তাদের জন্য কান্না করেনি এবং তাদেরও অবকাশ দেওয়া হয়নি।’ (সুরা দুখান, আয়াত : ২৯)

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, অবিশ্বাসী ও পাপিষ্ঠদের মৃত্যুতে আসমান-জমিন খুশি হয়। আর মুমিনদের মৃত্যুতে কাঁদে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘প্রবাসে মৃত্যুবরণ করার কারণে যে মুমিন ব্যক্তির জন্য কোনো ক্রন্দনকারী থাকে না, তার জন্য আসমান ও জমিন কান্না করে।’ (ইবনে জারির)

আলী (রা.) বলেন, ‘সৎ লোকের মৃত্যুতে আকাশ ও জমিন কাঁদে। (তাফসিরে ইবন কাসির)

 

হাসির প্রকারভেদ

হাসি তিন প্রকার। ১. অট্টহাসি, যে হাসির আওয়াজ দূর থেকে শোনা যায়, ২. সাধারণ হাসি, যে হাসি আওয়াজ হয়, তবে দূর থেকে আওয়াজ শোনা যায় না, ৩. মুচকি হাসি, যে হাসিতে কোনো আওয়াজ নেই। সর্বোত্তম হাসি হলো মুচকি হাসি আর অট্টহাসি মাকরুহ।

 

মহানবী (সা)-এর হাসি

মহানবী (সা.) মুচকি হাসতেন। কখনো অট্টহাসি দিতেন না। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মহানবী (সা.) বেশির ভাগ সময় মৃদু হাসতেন।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ২১৭/১)

আবদুল্লাহ ইবনে হারিস বর্ণনা করেন, ‘আমি মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বেশি মৃদু হাসতে আর কাউকে দেখিনি।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ২১৮/২)

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) আমার ইসলাম গ্রহণের পর থেকে কখনো আমাকে তাঁর মজলিসে প্রবেশ করতে বাধা দেননি। আর যখনই আমাকে দেখতেন তখনই হাসতেন।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ২২১/৫)

মহানবী (সা.) বলেন, আমি ওই ব্যক্তি সম্পর্কে অবগত আছি, যে সবশেষে জাহান্নাম থেকে বের হবে। এ ব্যক্তি হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নাম থেকে বের হবে। কেননা জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করার দরুন সোজা হয়ে চলতে পারবে না। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করার আদেশ দেওয়া হবে। জান্নাতে গিয়ে সে দেখবে, সকলে স্ব-স্ব স্থান দখল করে বসে আছে। সেখান থেকে ফিরে এসে জায়গা না থাকার কথা আল্লাহকে জানাবে। আল্লাহ বলবেন, দুনিয়ার ঘরবাড়ির কথা স্মরণ আছে কি? সে বলবে হ্যাঁ, হে প্রভু! তখন বলা হবে, তোমার মনে যা চায় তুমি তার আকাঙ্ক্ষা করো। সে যা ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা করবে। অতঃপর ঘোষণা করা হবে, তুমি যা কিছুর আকাঙ্ক্ষা করেছ সেগুলো এবং তার সঙ্গে দুনিয়ার দশগুণ বড় জান্নাত তোমাকে দেওয়া হলো। সে বলবে, হে আল্লাহ! আপনি রাজাধিরাজ হয়ে আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? সেখানে তো বিন্দুমাত্র জায়গাও নেই অথচ আপনি দুনিয়ার দশগুণ বড় জান্নাত আমাকে দান করছেন? আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) যখন ওই ব্যক্তির উক্তি উচ্চারণ করছিলেন, তখন দেখতে পেলাম তিনি হাসছেন এবং তাঁর দাঁত মোবারক প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। (শামায়েলে তিরমিজি)

 

মহানবী (সা.)-এর কান্না

মহানবী (সা.) বিভিন্ন সময় কান্না করেছেন। তিনি অনুচ্চ আওয়াজে কান্না করতেন। কখনো বিলাপ করে কান্না করতেন না। বেশির ভাগ সময় তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনারত অবস্থায় কাঁদতেন।

নামাজে কান্না : আবদুল্লাহ ইবন সিখখির (রা.) বলেন, ‘আমি মহানবী (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি নামাজরত ছিলেন। তাঁর বক্ষদেশ থেকে জ্বলন্ত চুলার পানি ভরা পাত্র থেকে যেরূপ আওয়াজ আসে সেরূপ আওয়াজ আসছিল।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ৩০৭/১)

আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) বর্ণনা করেন, একবার মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় সূর্যগ্রহণ হয়। মহানবী (সা.) মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া শুরু করেন। এ নামাজে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন মনে হয়েছে যেন আর রুকুতে যাবেন না। অতঃপর রুকুতে যান। এত দীর্ঘ সময় রুকু করেন মনে হয়েছে যেন রুকু থেকে আর দাঁড়াবেন না। এরপর রুকু থেকে উঠে কাওমায় (রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানো) এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, মনে হলো যেন আর সিজদা করবেন না। সিজদা এত দীর্ঘ করলেন মনে হলো যেন সিজদা হতে মাথা উঠাবেন না। অনুরূপভাবে সিজদা থেকে উঠে দুই সিজদার মধ্যে এত দীর্ঘ সময় বসে থাকেন মনে হলো আর সিজদা করবেন না। এভাবে দ্বিতীয় রাকাতও দীর্ঘ সময় নিয়ে আদায় করেন এবং কাঁদতে থাকেন। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩০৯/৩)

আয়াত শুনে কান্না করা : মহানবী (সা.) একবার আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)-কে বলেন, হে আবদুল্লাহ! তুমি আমাকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাও। আবদুল্লাহ বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, আর আমি আপনাকে কোরআন পড়ে শোনাব! মহানবী (সা.) বলেন, আমার মন চায় অন্যের মুখে কোরআন তিলাওয়াত শুনি। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) যখন তিলাওয়াত করতে করতে সুরা নিসার আয়াত ‘ফা কাইফা ইজা জি-না মিন কুল্লি উম্মাতিম বি শাহিদিন ওয়া জি-না বিকা আলা হাওলায়ে শাহিদা’ পর্যন্ত পৌঁঁছেন, তখন তিনি (রাসুল) কাঁদতে থাকেন। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩০৮/২)

প্রিয়জনের জন্য কান্না করা : উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর মৃত্যুর পর মহানবী (সা.) তাঁর ললাটে চুম্বন করেন। তখন মহানবী (সা.)-এর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১১/৫)

আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘মহানবী (সা.)-এর কন্যা উম্মে কুলসুম ইন্তেকাল করার পর, তার কবরের পাশে বসে ছিলেন, তখন তাঁর চোখ মোবারক থেকে অশ্রু ঝরছিল।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১২/৬)

 

উচ্চ আওয়াজে কাঁদতে নিষেধ

মহানবী (সা.)-এর কোন এক কন্যা মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলে তিনি তাকে স্বীয় কোলে উঠিয়ে নেন। তখন মহানবী (সা.)-এর সামনেই তার মৃত্যু হয়। মহানবী (সা.)-এর দাসী উম্মে আইমান, তখন উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে থাকেন। মহানবী (সা.) তাকে বললেন, তুমি আল্লাহর নবীর সামনে এভাবে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদছ! উম্মে আইমান বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপানাকেও তো কাঁদতে দেখছি। মহানবী (সা.) বললেন, এটা ওই নিষিদ্ধ কান্না নয়। এটা আল্লাহর রহমত। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১০/৫)

 

লেখক :  প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা