kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

গুজব যখন গজব

মুফতি কাসেম শরীফ

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গুজব যখন গজব

‘সত্য-মিথ্যা যাচাই আগে, ইন্টারনেটে শেয়ার পরে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ পালিত হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস-২০১৯। এ নিয়ে কালের কণ্ঠের ইসলামী জীবন বিভাগের বিশেষ আয়োজন।

বিশ্বায়নের যুগে গোটা পৃথিবী হাতের মুঠোয়। সর্বত্র তথ্যের ছড়াছড়ি। পৃথিবী চলছে ডিজিটাইজেশন তথা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ সত্য-মিথ্যার মধ্যে পরখ করা সহজ করে দিয়েছে। কথা ছিল, তথ্য-প্রযুক্তি আমাদের জীবন শুদ্ধতায় ভরে দেবে, গভীর অন্ধকার ভেদ করে আলোর মশাল প্রজ্বালন করবে, জীবনকে সহজ ও সাবলীল করবে। কিন্তু দিন যতই গড়াচ্ছে, মানুষ প্রযুক্তির ‘আদর্শ ব্যবহার’ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, অন্যদিকে গুজব ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে অথবা মনের অজান্তে অনেকে গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে। এসব গুজব শুধু মিথ্যার পরিধিই বিস্তৃত করছে না, সহিংসতাও উসকে দিচ্ছে।

 

বাংলাদেশের আলোচিত কিছু গুজব

বাংলাদেশের বেশ কিছু গুজব সব সীমানা ভেঙে সর্বাধিক মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এর কয়েকটি হলো—পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বহুমুখী গুজব রটে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে গুজব ছড়ায়। ২০১৩ সালে মার্চে আলোচিত ইসলামী বক্তা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে গুজব রটে। এই খবর সারা দেশে নৃশংসতা উসকে দেয়। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিখোঁজ’ শিরোনামে একটি খবর বেনামি কিছু ওয়েবপোর্টাল ও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সরকারি ভাষ্যে এই খবরকে গুজব বলে নিশ্চিত করা হয়। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের দিনগুলোতে কমোডে বা বেসিনে হারপিক ও ব্লিচিং পাউডার ঢেলে এডিস মশা মারার একটি বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও হারপিকের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জানায়, এই তথ্যের কোনো সত্যতা নেই।

ঢাকার শাপলা চত্বরে যৌথ বাহিনীর অপারেশনে হেফাজতে ইসলামীর কর্মীদের মৃতের সংখ্যা নিয়ে নানা মিথ ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এসব গুজব।

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যু-পূর্ববর্তী অসুস্থতা নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর ইন্তেকাল এসব গুজবের কফিনে পেরেক এঁটে দেয়।

পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এর জের ধরে ‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ছেলেধরা সন্দেহে কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে এটা নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করে সরকার। ছেলেধরা গুজবের রেশ না কাটতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন দিন বিদ্যুৎ বন্ধ থাকবে মর্মে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, খবরটি সঠিক নয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রগ কাটা’র খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি হতাহতের সংখ্যা নিয়েও গুজব রটে। সে সময় এটি খুবই প্রভাব বিস্তারকারী গুজব ছিল।

এটা সত্য যে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়েও বিভিন্ন ধরনের গুজব রটার কথা শোনা যায়। কিন্তু এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই—ইতিহাস তারই সাক্ষ্য দেয়।

 

১৯৭১-এ বহু গুজব রটে!

১৯৭১ বাঙালির জীবনের বাঁকবদলের বছর। ৭১-কে বাদ দিয়ে বাঙালির ইতিহাস রচিত হতে পারে না। কিন্তু এই ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে ছিল গুজবের ছড়াছড়ি। জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে একটি শর্টনোট উল্লেখ করছি। ৩০ মার্চের ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন, ‘দিনরাত কি এক দুঃস্বপ্নের ঘোরে কাটছে। আর গুজবই যে কতো। একটা করে গুজব শুনি আর ভয়ে আঁতকে উঠে হুটোপুটি লাগিয়ে দিই।’ (জাহানারা ইমাম, একাত্তরের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ৫০)

১০ এপ্রিলের ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন, ‘স্বাধীন বাংলা বেতারের বরাত দিয়ে আকাশবাণী যত খবর বলে, সব বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না। ওদের কিছু খবর ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নীলিমা ও সুফিয়া আপার মৃত্যু সংবাদটা ভুল ছিল।’ (একাত্তরের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ৬০)

বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ই মার্চ এক ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় দিন। ওই দিনকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ে বহু গুজব। এর মধ্যে অন্যতম একটি গুজব ছিল রেসকোর্সে আসার পথেই কমান্ডো আক্রমণে হত্যা করা হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। মুহুর্মুহু গর্জনে ফেটে পড়ছে জনসমুদ্রের উত্তাল কণ্ঠ। কিন্তু বিকেল ৩টার কিছু পরে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রোডের ঐতিহাসিক বাসভবন থেকে মোটরবহর নিয়ে ইতিহাসের মহানায়ক এসে পৌঁছলেন রৌদ্রকরোজ্জ্বল রেসকোর্স ময়দানে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনালগ্নে অমৃতবাজার পত্রিকা ২৭ মার্চ টিক্কা খানের মৃত্যু নিয়ে একটি গুজবমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২৮ মার্চ তৎকালীন দৈনিক যুগান্তর প্রধান শিরোনাম করে, ‘ঢাকায় পাক সামরিক শাসক নিহত’। কিন্তু পরে জানা যায়, এটি ছিল গুজব।

১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল আগরতলার দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়—‘রওশন আরা মৃত্যুহীন’। এই মৃত্যু নিয়ে রচিত হয় সাহিত্য। কেউ কবিতা লিখলেন তো কেউ গান, কেউ নাটক। সৈয়দ শামসুল হক লিখলেন ‘রোশেনারা’ কবিতা। পরে জানা যায়, এটি ছিল গুজব। এ বিষয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘পরবর্তীতে ভারতের জনমানসে রওশন আরা এত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, কখনো সাহস হয়নি বলার, বিকচের এই গল্পটি মিথ্যে।’

ঐতিহাসিক এসব তথ্য সামনে থাকলে এ কথা বলা খুবই সহজ যে বহু আগে থেকেই, এমনকি প্রযুক্তি আসার আগে থেকেই বাঙালির মধ্যে একধরনের গুজবপ্রিয়তা ছিল। তাই এসব গুজবের সঙ্গে ধর্মের সংযোগ খোঁজা গর্হিত অপরাধ।

 

গুজব প্রতিরোধে ইসলাম

নিজস্ব চিন্তা কিংবা দল-মতের রংচং মাখিয়ে খবর আংশিক বা পুরোপুরি পরিবর্তন করে উপস্থাপন করা ইসলাম কিছুতেই সমর্থন করে না। এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো, কোনোরূপ সংযোজন-বিয়োজন ছাড়াই খবর পরিবেশন করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৭০)

সংবাদের তথ্য যাচাই ও সত্যতা নিরূপণ করা প্রত্যেকের অপরিহার্য কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা, যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে যাতে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হতে না হয়।’ (সুরা : হুজরাত, আয়াত : ৬)

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যা শুনবে, তা-ই (যাচাই করা ছাড়া) বর্ণনা করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (মুসলিম শরিফ : ১/১০)

সত্য গোপন করাকে ইসলাম পাপ হিসেবে বিবেচনা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন কোরো না, আর যে ব্যক্তি তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৩)

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে খবর প্রচার করা প্রত্যেকের অপরিহার্য কর্তব্য। এ বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য এমন : ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর—এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)

মহান আল্লাহ আমাদের গুজবের মহামারি থেকে হেফাজত করুন।

 

লেখক : ধর্ম বিভাগীয় প্রধান, দৈনিক কালের কণ্ঠ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা