kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

যদি এই মাদরাসাগুলো না থাকে

মুফতি মাহমুদ হাসান

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যদি এই মাদরাসাগুলো না থাকে

একজন মুসলিমের জন্য এটি সীমাহীন গর্বের বিষয় যে আল্লাহ তাআলা তাকে ইসলামের রূপে একটি জীবন্ত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান দান করেছেন। মুসলিমদের ১৪০০ বছরব্যাপী দীপ্তিময় একটি সোনালি অতীত রয়েছে। তাদের কাছে বর্ণাঢ্য একটি সভ্যতা ও সংস্কৃতি রয়েছে। কোরআন-সুন্নাহর আকৃতিতে তাদের রয়েছে আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। প্রথম শতাব্দী থেকে এ পর্যন্ত ইসলামী স্কলারদের একনিষ্ঠ মেহনতের বদৌলতে তারা পেয়েছে ইসলামী ফিকহের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার এবং অতুলনীয় জীবনবিধান ও আইনসম্ভার। মুসলিমরাই পৃথিবীকে আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েতের প্রতি পথপ্রদর্শন করেছে। শিরক, কুফর ও অজ্ঞতার অন্ধকার গহ্বর থেকে বের করে ঈমান, একিন ও জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করেছে। ইসলাম মানবতাকে জীবনবিধান দিয়েছে, সভ্যতা শিখিয়েছে, নিরাপত্তা দিয়েছে। মজলুম ও অসহায়দের আশ্রয়সহ সব শ্রেণির মানুষের অধিকার দিয়েছে। মোট কথা, বিশ্বমানবতাকে জীবন ধারণ ও যাপনের পদ্ধতি ও রীতনীতি উপহার দিয়েছে। মুসলিমদের উত্থানে মানবসভ্যতায় যে ইতিবাচক এবং তাদের পতনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, ইতিহাসের একজন সাধারণ পাঠকও তা অস্বীকার করতে পারবে না।

এর বিপরীতে মানববিশ্বে এমন এক দল আগ্রাসী শ্রেণির লোক সর্বদা চলে আসছে, যারা অন্তরে লুক্কায়িত বিদ্বেষ ও শত্রুতাবশত সর্বদা মানবজাতিকে তাদের প্রভুর দিকনির্দেশনা থেকে ফিরিয়ে তাদের মূলোৎপাটন করতে আগ্রহী। আর এই উদ্দেশ্যেই এই আগ্রাসী শ্রেণি যুগে যুগে ঐশী হেদায়েতের বার্তাবাহী মুসলিমদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে লড়াই করেছিল। মুসলিমরা যত দিন আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েতের ওপর অটল ছিল, তত দিন  আল্লাহর সাহায্য তাদের সঙ্গী ছিল। কিন্তু যখন মুসলিম সমাজ আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েত ছেড়ে প্রবৃত্তির পূজা শুরু করে, তখন আগ্রাসী শ্রেণি স্বীয় কূট উদ্দেশ্যে সফলতার মুখ দেখে।

 

মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে ভয়াল ষড়যন্ত্র

সূচনা থেকেই কিছু মানুষ এটিকেই নিজের ‘দায়িত্ব’ হিসেবে বেছে নিয়েছে যে ইসলামের বিধান ও সৌন্দর্যকে কদর্যরূপে পেশ করবে, ইসলামের নবী মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সত্তা ও তাঁর নবুয়তের ওপর অপবাদ দেবে। বরং তারা নিজেদের অসদুদ্দেশ্য অর্জনে কিছু মুখোশধারী মুসলিমও তৈরি করে নিয়েছে, যাদের সরাসরি বা কোনো মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে শিক্ষাদীক্ষা ও পরিপালনের দ্বারা তাদের অন্তরে এমন বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে চলনে-বলনে তারা পশ্চিমা প্রভুদের চেয়েও এক লাইন আগ বাড়িয়ে। পশ্চিমাদের কাজ অনেকটা তাদের মুসলিম নামধারী গোলামরাই চালিয়ে যায়।

 

দ্বিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার

বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে তারা ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক ও রক্ষক মাদরাসাগুলোর এমন মিথ্যা চিত্র এঁকেছে, যার সঙ্গে বাস্তবতার দূরতম সম্পর্কও নেই। অতঃপর কিছু মুসলিম জেনেশুনে বা অজ্ঞতাবশত সাদাসিধাভাবে তাদের প্রপাগান্ডার তীব্রতায় প্রভাবিত হয়ে তাদের সঙ্গে সুর ও তাল দিচ্ছে। পশ্চিমারা ইসলাম ও মুসলিমদের স্বকীয়তাকে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য কৌশলে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা মুসলিমদের মৌলবাদী ও কট্টরপন্থী বলে পরিচিত করছে। আর মুসলিমদের দ্বিনি বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের পথনির্দেশক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষভাবে মাদরাসাগুলোকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের উৎপত্তিস্থল আখ্যা দিয়ে অবিরত প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিষাক্ত প্রপাগান্ডায় পশ্চিমাদের সঙ্গে দেশীয় দোসররাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

এই দ্বিনি মাদরাসাগুলো ১৪০০ বছরব্যাপী ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি ও দ্বিনি ইলমের ধারণ-বাহন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ আঞ্জাম দিচ্ছে। মাদরাসাগুলোর দিন-রাতের মেহনতের বদৌলতে ইসলামের মৌলিক রূপরেখা ধরাপৃষ্ঠে অবিকৃত রয়েছে। তাদের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার কারণেই শত ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধি সত্ত্বেও পাক-ভারত উপমহাদেশকে ‘স্পেন’ বানানো সম্ভব হয়নি। অথচ এই তিক্ত সত্য কথাও মানতে হবে যে বিশ্বে অবস্থিত প্রায় ৬০টি মুসলিম দেশ তাদের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা আগ্রাসীদের দুরভিসন্ধির মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়নি, বরং তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাদের সামনে মাথা নত করে আছে। যেহেতু পশ্চিমা আগ্রাসীদের এ কথা ভালোভাবেই জানা আছে, তাই তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে তাদের সর্বশেষ বাধা মাদরাসার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। আগ্রাসীরা তাদের নিমকহালাল দেশীয় ভৃত্যদের নিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে কিভাবে মাদরাসাকে চলমান সন্ত্রাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে স্বীয় পথ বাধামুক্ত করতে পারে। আর যদি পথ থেকে সরাতে নাও পারে (ইনশাআল্লাহ পারবেও না), তাহলে তাদের পাঠ্যক্রম ও কার্যক্রমে এমন আমূল পরিবর্তন করানোর চেষ্টা করবে, যাতে তারা মন-মস্তিষ্কে তাদের পোষা চাকরদের মতো হয়ে যায় এবং এদের মধ্যে পৃথিবীতে সঠিক ইসলামকে পরিচয় করানোর যোগ্যতা তৈরি না হয় এবং তারা স্বাধীনতার চেতনামুক্ত হয়ে যায়।

মাদরাসাবিরোধী প্রপাগান্ডাকারীদের আমরা সশ্রদ্ধ নিবেদন করি যে বিশ্বে চলমান অস্থিতিশীলতা দ্বিনি মাদরাসাগুলোর কারণে নয়। বরং এ অস্থিতিশীলতা মানবতা ও শান্তির ঠিকাদার হওয়ার দাবিদার পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের মিত্রদের হাতের কামাই। তারাই কারণে-অকারণে অনেক মুসলিম দেশের ওপর হামলা চালিয়ে লাখ লাখ বেসামরিক নিরপরাধ মানুষ হত্যা করেছে। স্বরাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় পলিসির আওতায় বিভিন্ন অজুহাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কিছু দলকে অস্ত্রশস্ত্র ও টাকা-পয়সার জোগান দিয়ে গড়ে তুলেছে, তাদের হাতেই ফুলেফেঁপে তারা বড় হয়েছে। প্রয়োজন ফুরানোর পর তারাই আবার তাদের দমনের নীতি অবলম্বন করেছে। তা ছাড়া পশ্চিমাদের থেকে আমদানীকৃত সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই মুসলিম সমাজে অস্থিতিশীলতার জন্য বড় একটি কারণ। অথচ আজ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির দায় চাপানো হচ্ছে নিরপরাধ মুসলিমদের ওপর—মাদরাসাগুলোর ওপর। যদি এর জন্য মাদরাসাই দায়ী হয়, তাহলে বলুন, মাদরাসাগুলোর ধারাবাহিকতা তো আজকে থেকে নয়, এগুলোর তো হাজার বছরের ইতিহাস আছে। হাজার বছর ধরে এগুলো থেকে বিশ্ব উপকৃত হলো, আর আজ এসে এগুলোর দ্বারা বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে? অথচ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলতে হয় যে তিক্ত সত্য হলো, যেসব প্রতিষ্ঠানকে (স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি) তারা শুভ্র-স্বচ্ছ, নিরপরাধ মনে করে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক দ্বারাই তো আজ মানুষ বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। খুন, ধর্ষণ, মারামারি, ভাঙচুরসহ এমন কোনো অপরাধ নেই,  যা তাদের দ্বারা সংঘটিত হয় না।

 

প্রাচ্যের কবির উদাত্ত আহ্বান

পশ্চিমাদের প্রপাগান্ডায় প্রভাবিত সাদাসিধা মুসলিম ভাইদের প্রাচ্যের কবি, মুসলিম জাতির কবি স্যার ইকবালের একটি আকুল নিবেদন উল্লেখপূর্বক আমার কথা শেষ করতে চাই। আল্লামা ইকবাল (রহ.) (মৃত্যু : ১৯৩৮ ইং) জাতিকে লক্ষ করে বলেন, ‘এই মক্তবগুলোকে এ অবস্থাতেই থাকতে দাও, সাধারণ মুসলিমদের বাচ্চাদের এই মাদরাসাগুলোতেই পড়তে দাও। যদি এই মোল্লা ও দরবেশরা না থাকে, তাহলে জানো কী হবে? যা হবে, তা আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি। যদি ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা এই মাদরাসাগুলোর প্রভাবমুক্ত হয়ে যায়, তাহলে হুবহু এমন অবস্থাই হবে, যেরূপ স্পেনে মুসলিমদের ৮০০ বছরব্যাপী শাসনক্ষমতা চালানো সত্ত্বেও আজ গ্রানাডা ও কর্ডোভার ধ্বংসাবশেষ এবং আলহামরা প্রাসাদের কিছু নিদর্শন ছাড়া মুসলিমদের ও ইসলামী সভ্যতার নিদর্শনাবলির কোনো রেখা সেখানে পাওয়া যায় না; ভারত উপমহাদেশেও আগ্রার তাজমহল ও দিল্লির লালকেল্লা ছাড়া মুসলিমদের ৮০০ বছরব্যাপী শাসনক্ষমতা ও তাদের সভ্যতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ (আওরাকে গুমগাশতাহ, রহীমবখশ শাহিন পৃষ্ঠা : ৯২)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা