kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

হাজি খাজা শাহবাজ খাঁ মসজিদে এক প্রহর

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাজি খাজা শাহবাজ খাঁ মসজিদে এক প্রহর

ছবি ও লেখা : রিদওয়ান আক্রাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে যাব তিন নেতার মাজারে। যদিও মূল উদ্দেশ্য ওটা নয়। ওই মাজারের পেছনেই রয়েছে ৩৪০ বছরের পুরনো এক মসজিদ। মোগল ঢাকার সোনালি সময়ে তৈরি মসজিদটি। যে রাস্তা ধরে যাব ওখানে চলছে মেট্রো রেলের কাজ। ফলে চাইলেই হুট করে রাস্তার অন্য প্রান্তে চলে যাওয়া যায় না। টিএসসি থেকেই ঠিক করে নিলাম, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সংলগ্ন ফুটপাত ধরে হাঁটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মেট্রো রেলের কাজের সুবিধার্থে ফুটপাত খানিকটা ছোট হয়ে এসেছে। সেটা ধরে খানিক হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম তিন নেতার মাজারে। এই স্মৃতিসৌধের ফাঁক দিয়ে দিব্যি মসজিদখানা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু যাব কোথা দিয়ে? প্রবেশপথ খুঁজে পাচ্ছি না। ওখানকার এক চা দোকানিকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি পথ বাতলে দিলেন। মাজারের বাঁ পাশ দিয়ে সরু একটি গলি চলে গেছে, সেটা ধরে গেলেই নাকি পেয়ে যাব হাজি খাজা শাহবাজ খাঁ মসজিদের প্রবেশপথ।

বেশি দূর যেতে হলো না, দুই কদম হাঁটতেই পেয়ে গেলাম মসজিদের প্রবেশপথ। মসজিদটা খানিকটা উঁচু জায়গায় তৈরি করা হয়েছে। সম্ভবত সেই সময় বন্যার কথা মাথায় রেখে এমনটা করা হয়েছে। কয়েক ধাপ পেরিয়ে ঢুকে গেলাম ভেতরে মসজিদ প্রাঙ্গণে। ভেতরটা বেশ শান্ত। বেলা সাড়ে ১১টা বাজে। জোহরের নামাজের ঢের বাকি। এর পরও মসজিদের দরজা খোলাই আছে। চাইলে যে কেউ নামাজ আদায় করতে পারবে। ঢাকার অন্যান্য প্রাচীন মসজিদগুলোতে এই সুযোগ নেই বললেই চলে। শুধু নামাজের সময় খুলে দেওয়া হয় এই ঐতিহাসিক মসজিদগুলো।

মোগল যুগে নির্মিত মসজিদগুলোর বেশির ভাগই তিন গম্বুজবিশিষ্ট এবং আয়তাকার ভূমি নকশার ওপর নির্মিত। হাজি খাজা শাহবাজ খানের মসজিদটি সেগুলো থেকে ব্যতিক্রম নয়। মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে এটির প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে। হাজি খাজা শাহবাজ খান ছিলেন ঢাকার সেসময়ের অভিজাত ব্যবসায়ী। ‘মালিক-উত-তুজ্জার’ বা ‘ব্যবসায়ী রাজপুত্র’ নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। জানা যায়, তিনি নাকি আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারীও ছিলেন। নিজের জীবদ্দশাতেই ১৬৭৯ সালে এই মসজিদ এবং এর পাশে নিজের জন্য মাজার তৈরি করেন। এই মাজারে তাঁর কবরও আছে।

উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এই মসজিদের আয়তন ৬৮ ফুট। মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্ট কোনাকৃতির মিনার রয়েছে। মসজিদের প্রবেশের তিনটি পথ রয়েছে পূর্ব দেয়ালে। দক্ষিণ ও উত্তর দেয়ালে রয়েছে একটি করে দরজা। পাথর ও মার্বেলের অভাবের কারণে বাংলাদেশে মোগল আমলে তৈরি স্থাপনার মধ্যে ইটের বেশ ব্যবহার দেখা যায়। এ অঞ্চলের জলবায়ুর আর্দ্রতার কারণে মসজিদগুলোর স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য পাথর দিয়ে আবরণ দেওয়া হতো। এই বৈশিষ্ট্যটি এ মসজিদেও চোখে পড়ল। প্রতিটি দরজার চৌকাঠ কালো পাথরের। দরজাগুলো ভেতরের কিছু অংশ এবং বাইরের ভিত্তি দেয়ালের নিচের অংশে প্রায় চার ইঞ্চি পুরু অলংকৃত কালো পাথরের ব্যবহার দেখা যায়। মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি আকর্ষণীয় মেহরাব আছে। প্রধান মেহরাবের অলংকরণ বেশ সুন্দর।

মসজিদের পাশেই রয়েছে হাজি খাজা শাহবাজের মাজার ইমারতটি। এটি এক গম্বুজবিশিষ্ট। বর্গাকারে নির্মিত এর প্রতিটি বাহু বাইরের দিকে ২৬ ফুট লম্বা। ইমারতটির চারদিকে চারটি অষ্ট কোনাকৃতির মিনার রয়েছে। দক্ষিণ দিকে তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে। ইমারতটির নির্মাণকৌশল যদিও মোগল ঘরানার, তবু এর সঙ্গে মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে বাংলাদেশের চিরাচরিত বাংলোর। এটি বারান্দা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ দিকে এটি ১১-১২ ফুট চওড়া। মাজার ইমারতটি এখনো বেশ অটুট রয়েছে। এই মাজারটি দেখভালের জন্য একটি পরিবার আছে। তাদের সঙ্গে খানিকটা বাতচিত করে ফিরতি পথ ধরলাম।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা