kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বায়তুল হিকমাহ

বিশ্বের মূল্যবান গ্রন্থগুলো যেভাবে আরবিতে ভাষান্তর হয়

মোহাম্মদ শফিউল্লাহ কুতুবী

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্বের মূল্যবান গ্রন্থগুলো যেভাবে আরবিতে ভাষান্তর হয়

খলিফা মামুনের উদ্যোগে বিশ্বের মূল্যবান গ্রন্থগুলো আরবিতে অনূদিত হতে থাকে। অনুবাদকদের দুটি দল আলাদাভাবে কাজ করত। এক দলের কাজ ছিল ফারসি, হিবরু, গ্রিক, ভারতীয়, প্রাচীন মিসরীয় প্রভৃতি অনারবি ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদকর্ম সম্পাদন করা। অপর দলের কাজ ছিল অনারবি এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় তরজমা। পরে আবার সে ভাষা থেকে আরবিতে তরজমা করত আরেক দল অনুবাদক। অনুবাদকদের মধ্যে যাঁরা আরবিতে পারঙ্গম ছিলেন না তাঁদের সহযোগী হিসেবে আরবিতে দক্ষ একদল লোক সমান্তরালে কাজ করে যেত। তাদের কাজ ছিল পাঠকদের জন্য অনূদিত বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য, সাবলীল, সহজপাঠ্য হিসেবে উপস্থাপন করা।

বায়তুল হিকমাহর অনুবাদকমণ্ডলীর প্রধান ছিলেন হুনায়ন ইবন ইসহাক (৮০৮-৮৭৩ খ্রি.)। তাঁর সম্পর্কে কিফতি বলেন, হুনায়ন ছিলেন অনুবাদকদের অন্যতম প্রধান। তিনি বিভিন্ন গ্রন্থকে আরবি ও হিবরু ভাষায় অনুবাদ করতেন। তিনি একাধারে হিবরু, আরবি ও গ্রিক ভাষায় সমান পারদর্শী, উঁচু মাপের কবি, শক্তিমান ভাষাবিদ ও সুদক্ষ বক্তা ছিলেন। তিনি বাগদাদ থেকে উচ্চশিক্ষার সন্ধানে বসরা, ইরান প্রভৃতি এলাকা সফর করেন। ইমাম খলিল ইবন আহমদের (মৃ. ৭৮৬ হি.) সান্নিধ্য গ্রহণ করে বিভিন্ন শাস্ত্র ও আরবি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। ‘কিতাবুল আইন’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি তিনিই বাগদাদে প্রথম এনেছিলেন এবং খলিফা মুতাওয়াক্কিল বিল্লাহর (৮২১-৮৬১) পক্ষ থেকে এর অনুবাদের দায়িত্বও তাঁর ওপর অর্পিত হয়েছিল। সঙ্গে নিয়োজিত করা হয় একদল দক্ষ অনুবাদক; যাদের অনূদিত বিষয়ের তিনি সম্পাদনা ও পরিমার্জন করতেন (কিফতি, ১৯৬৫ : ১১৮)। মামুনের দরবারে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হুনায়ন ইবন ইসহাক (ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৯৮৬ : ২১/২৬১-২৬২)। ইবন আবি উসাইবিয়াহ (মৃ. ১২৭০ খ্রি.) বলেন, ‘খলিফা মামুনুর রশিদ সম্মানী হিসেবে তাঁকে অনূদিত গ্রন্থের সমান ওজনের স্বর্ণ প্রদান করতেন’ (ইবন আবি উসাইবিয়াহ, ১৯৬৫ : ২৬০)।

দার্শনিক আবু সুলাইমান সাজিস্তানি (মৃ. ৯৮৫ খ্রি.) বলেন, মুসা ইবন শাকের (১২৮৭-১৩৬২)-এর সন্তান যথা মুহাম্মদ, আহমদ, হাসান প্রমুখ অনুবাদককে জনপ্রতি ৫০০ দিনার পর্যন্ত সম্মানী দিতেন। যাদের মধ্যে হুনায়ন ইবন ইসহাক, হাবিশ ইবন হাসান (মৃ. ৯১২ খ্রি.), সাবিত ইবন কুররা (৮৩৬-৯০১ খ্রি.) উল্লেখযোগ্য।

অনুবাদকমণ্ডলীর সহযোগী হিসেবে দুই শ্রেণির পাণ্ডুলিপিকার নিয়োজিত ছিল। একদল হলো যারা বায়তুল হিকমাহর গ্রন্থগুলোর অনুলিপি তৈরি করত, আরেক দল অন্যদের ফরমায়েশি পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দিত। এর বিনিময়ে তারা পারিশ্রমিক পেত। অনেক সময় বায়তুল হিকমাহর বাইরের লোক তাদের দিয়ে অনুলিপি তৈরি করাতেন। কখনো কোনো লেখকের পক্ষে লেখার ব্যাপারটি কষ্টকর হলে তাঁরা শুনে শুনে অনুলিপি তৈরি করে দিতেন। এভাবে বায়তুল হিকমাহর লেখকরা দিন-রাত তাঁদের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যেতেন। ইবন নাদিমের মতে, ইলান শাউবি ছিলেন বায়তুল হিকমাহর একজন অন্যতম অনুলিপিকার। শাউবি ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত। তিনি কুলজিবিদ্যা ইত্যাদিতেও বিজ্ঞ ছিলেন। তিনি বায়তুল হিকমাহ গ্রন্থাগারে খলিফা হারুনুর রশিদ ও মামুনুর রশিদের আমলে অনুলিপি প্রস্তুতকরণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। (ইবন নাদিম, ১৯৭৮ : ১৫৪)

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ মতে, একজন গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপক ছাড়াও বায়তুল হিকমাহর ব্যবস্থাপনা বিভাগে একদল দায়িত্বশীল ছিল—যাদের কাজ ছিল সংগৃহীত গ্রন্থাবলির যথাযথ সংরক্ষণ, বিন্যাস, রেজিস্টার ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয় তদারকি করা। তাদের খাজেন বলা হতো (মারহাবা, ১৯৮৮ : ২১৮), পাঠাগার প্রধানকে খাজেন বলা হয় (আল আশ, ১৯৯১ : ৬৮)। বায়তুল হিকমায় সংগৃহীত গ্রন্থ-পুস্তকের বাইন্ডিংয়ের ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেকেই বাইন্ডারদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিত। ইবন নাদিমের বর্ণনা মতে, যাদের প্রধানের নাম ছিল ইবন আবুল হাবিশ। তিনি খলিফা মামুনের যুগে বায়তুল হিকমায় নিয়োজিত ছিলেন (ইবন নাদিম, ১৯৭৮ : ১৪)। এখানে সমাজের শিক্ষিত শ্রেণি, ছাত্র ও অনুসন্ধানী পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও তাদের সেবা প্রদানের জন্য আলাদা একদল চৌকস ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা ছিলেন। এ ছাড়া গ্রন্থাগারের অভ্যন্তরীণ অনুবাদক, সংকলক, সম্পাদক ও অনুলিপিকার ছাড়াও একটি পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরির জন্য যত ধরনের কর্মচারী দরকার এর পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ছিল।

খলিফা মামুনের এরূপ প্রচেষ্টার ফলে বহু প্রাচীন গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়ে শুধু ধ্বংসের হাত থেকেই রক্ষা পায়নি; বরং তা শত-সহস্র শাখায় বিস্তৃত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনে ভূমিকা রাখে। ইতিহাস রচয়িতা উইলিয়াম মূর বলেন, “It was through the labours of these learned men that the nations of Europe, then shrouded in the darkness of the Middle Ages, became again acquianted with their own proper but forgotten patrimony of grecian science and philosophy.” (Muir, 1963: 512).

(বি. দ্র. : বাইতুল হিকমাহ বিষয়ে লেখকের দীর্ঘ প্রবন্ধ কয়েক পর্বে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে কালের কণ্ঠে ছাপা হবে—বিস।)

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা