kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

নওমুসলিমের কথা

টুইন টাওয়ার হামলা আমার জীবন বদলে দেয়

-ড্যানিয়েল লোডুকা

৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টুইন টাওয়ার হামলা আমার জীবন বদলে দেয়

ড্যানিয়েল লোডুকা তরুণ প্রজন্মের একজন শিল্পী ও লেখিকা। তিনি জীবনঘনিষ্ঠ ছবি আঁকেন। ইসলাম বিষয়ে লেখালেখি করেন। ২০০৩ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের ওপর বিএফএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের একটি গণমাধ্যমের ফিচার লেখক হিসেবে কর্মরত আছেন

 

এটি ছিল শরতের এক শান্ত রাত। পাঠাগার বন্ধ হয়ে গেছে। আমাকে বইয়ের স্তূপ ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হলো। কিন্তু আমি তখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছি এবং আচ্ছন্ন হয়েই আমার ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে এগোচ্ছি। গাছের ফাঁকে ফাঁকে খেলছিল হালকা উষ্ণ আলো আর আমি ছিলাম গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত। আমি এমন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলাম, যাকে আমি উত্তরের ঊর্ধ্বে ভাবতাম। তখনো আমি বিশ্বাস ও বিশ্বাসের সূক্ষ্ম দাগের ওপর টলমল করছি। আমার ভেতর প্রশ্ন দোল খেতে থাকে, আমি কি নিশ্চিন্ত হয়ে যাব, আমি যে সত্য জেনেছি সেটাই চূড়ান্ত? নাকি আবিষ্কৃত সত্য উপেক্ষা করে জীবনকে আপন প্রবাহে ছেড়ে দেব? যে সম্পদের সন্ধান পেয়েছি তার সদ্ব্যবহার করব, নাকি ভাবব এই সত্যের সন্ধান তো আমি প্রথম পাইনি?

আমি আনন্দবোধ করলাম, আনন্দে চিৎকার করে উঠতে চাইলাম। আমি ফুটপাতে রাস্তার জ্বলজ্বলে লাইটের নিচে থামলাম। আমার প্রভু এখানে আছেন—এই নিশ্চিত বিশ্বাস লাভের পর প্রথমবারের মতো আমি আমার প্রভুর সঙ্গে কথা বললাম। আমি অনুভব করলাম, তিনি শুনছেন এবং আমার হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করছেন। আমি তখনো মুখে উচ্চারণ করতে পারিনি, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল।’ অথচ আমি নিজেকে মুসলিম ভাবতে শুরু করেছি। এটা ছিল জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ও সুখকর দিন। যেদিন আমি আমার স্বপ্ন ও প্রত্যাশার চেয়েও শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করেছিলাম।

 

ফিরে দেখা অতীত

অতীতের দিকে তাকিয়ে আমি দেখি, ইসলামের পথে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। একটি ধর্মবিরোধী প্রকল্পে কাজ শুরু করার পর। তখন কল্পনাও করতে পারতাম না, একদিন আমি কোনো ধর্ম গ্রহণ করব এবং তা পালন করব। তবে আমার ভেতর প্রচণ্ড রকম কৌতূহল কাজ করত। আমার মনে সব সময় প্রশ্ন তৈরি হতো। এমন সব প্রশ্ন, যার উত্তর জানা ছিল না। সত্যি আমি সুখী ছিলাম। হঠাৎ করেই আমি মৃত্যু ও জীবনের ছন্দঃপতন নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। মনে আছে, আমি দীর্ঘ সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম আমার আগে কত প্রজন্ম চলে গেছে এবং আমার পরেও আরো কত প্রজন্ম গত হবে।

 

টুইন টাওয়ার হামলা পাল্টে দিল জীবন

এরপর ‘ক্রস কান্ট্রি’-এর জন্য একজন বন্ধুর সঙ্গে এক মাসের হাইকিং ও ক্যাম্পিংয়ের জন্য বের হলাম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমি সৃষ্টির মহিমা অবলোকন করতে পারলাম। অ্যারিজোনার কোনো এক স্থান থেকে আমি মা-বাবাকে লিখেছিলাম, পৃথিবীর যে বিস্ময়কর সৌন্দর্য আমি দেখছি—একজন শিল্পী হিসেবে বলতে পারি, তার চেয়ে সুন্দর ও মহৎ কিছু আমার পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়।

এই সফরের পরপরই ১১ সেপ্টেম্বরের বিভীষিকাময় হামলা হয়। শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দ্বিতীয় বিমানের হামলার দৃশ্য আমি নিজ চোখে দেখেছি। আমি নিশ্চিত নই যে ১১ সেপ্টেম্বরের আগে আমি ইসলামের নাম শুনেছিলাম কি না? তবে এই সন্ত্রাসী হামলার পর জানতে পারলাম এর পেছনে একটি ভিনদেশি ধর্মকে দায়ী করা হচ্ছে—যাকে ইসলাম বলা হয়। ধীরে ধীরে ধর্মের প্রতি আমার বিদ্বেষ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে আমি রাজনীতি, রাজনৈতিক দর্শন ও সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের ওপর পড়াশোনা শুরু করি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ধর্ম মানবসৃষ্ট তা আমি প্রমাণ করব। রাজনৈতিক চিন্তা থেকেই তার জন্ম। এ জন্য ধর্মীয় সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করি। বাইবেল, ভগবতগীতা ও ত্রিপিটক পড়ি। এরপর কোরআন সংগ্রহ করতে ক্যাম্পাসের এমআইটিতে যাই। কয়েক মুসলিম শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তারা আমাকে কোরআনের একটি অনুবাদ উপহার দেয়। এক বছর ধরে আমি একটু একটু কোরআন অধ্যয়ন করি।

 

এটি কোরআন, কোনো সংগীত নয়

গবেষণার কাজে আমি আমেরিকার দখলকৃত একটি শহরে (সম্ভবত ইরাকে) গেলাম। আমি যে শহরে ছিলাম ২০ দিন পর সেখানে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়, যেন মানুষ খাবার সংগ্রহ করতে পারে। মানুষ রাস্তায় নেমে এলো। কোলাহলপূর্ণ একটি রাস্তায় আমি চমৎকার একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমার সঙ্গে থাকা সাংবাদিককে বললাম, সংগীতটি চমৎকার। তিনি হেসে বললেন, এটি সংগীত নয়, কোরআনের তিলাওয়াত। আমি বিস্মিত হলাম। এটি সেই কোরআন—যা এক বছর ধরে আমি শুনছি এবং তা এখনো আমার কাছে সংরক্ষিত। কোরআনের শব্দমালা আমার ভেতরে প্রোথিত আকঙ্ক্ষার মতো জ্বলে উঠল। কোরআনের তিলাওয়াত এবং মুসলিমদের মধ্যে এক সপ্তাহের অবস্থানে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ অদম্য হয়ে উঠল। কোরআনের প্রতি আকর্ষণও প্রবল হয়ে উঠল। একসময় কোরআনে মগ্ন হয়ে গেলাম।

 

অ্যাবাউট ইসলাম থেকে আতাউর রহমান খসরুর ভাষান্তর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা