kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বেনিনে ইসলামের অগ্রযাত্রা

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বেনিনে ইসলামের অগ্রযাত্রা

চীনের মহাপ্রাচীরের পর মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় স্থাপনার দেশ বেনিন। নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য ছয় শতাব্দী আগে প্রি-মেকানিক্যাল যুগে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বর্গফুটের বিশাল দেয়াল স্থাপন করেছিল তারা। বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। তবে আজ আমরা বেনিনের স্থাপত্যশৈলী আর সহস্রাব্দের ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলব না। আমরা কথা বলতে চাই বেনিনের ইসলাম আর মুসলমানদের নিয়ে। পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্রপতিশাসিত একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বেনিন। আফ্রিকার সবচেয়ে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম এই বেনিন। দেশটির রাষ্ট্রীয় নাম রিপাবলিক অব বেনিন। রাজধানীর নাম পোর্টো-নভোয়া। দেশের বৃহত্তম নগরীর নাম কোটোনো। এটি আফ্রিকার ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর মধ্য থেকে একটি। এর আগের নাম ছিল দাহোমি। বেনিনের জলবায়ু ক্রান্তীয়। এর বর্তমান অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। বেনিন ১৯৬০ সালের ১ আগস্ট ফরাসি উপনিবেশবাদ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। আর ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে।

দেশের বেশির ভাগ মানুষই দিনমজুর আর কৃষক। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে বর্তমান জনসংখ্যা এক কোটি ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৫০৪ জন। এর মধ্যে ২৭.৭ শতাংশ মুসলিম, ২৫.৫ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক, ১১.৬ শতাংশ বৌদ্ধ, ৯.৫ শতাংশ খ্রিস্টানসহ বাকি আরো কিছু ধর্মবিশ্বাসের সংমিশ্রণ সেখানে রয়েছে। জাতিগতভাবেও এদের মধ্যে রয়েছে নানা মিশ্রণ। তবে ফন, ইয়োরোবা ও আজা জাতির লোকই সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেশটির সরকারি ভাষা ফরাসি হলেও ফন ও অন্যান্য আফ্রিকান ভাষাও এখানে বহুল প্রচলিত। এক লাখ ১৪ হাজার ৭৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিকে ঘিরে আছে পশ্চিমে টোগো, পূর্বে নাইজেরিয়া ও বুরকিনা ফাসো, উত্তরে নাইজার আর দক্ষিণে গিনি উপসাগর। সিআইএর তথ্যানুযায়ী সীমান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুরকিনা ফাসোর সঙ্গে সীমান্ত সংযোগ ৩৮৬ কিলোমিটার, এ ছাড়া নাইজার ২৭৭ কিলোমিটার, নাইজেরিয়া ৮০৯ কিলোমিটার আর টোগোর সঙ্গে ৬৫১ কিলোমিটার সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। গিনি উপসাগর ঘেঁষে প্রায় ১২১ কিলোমিটার তটরেখা বিদ্যমান রয়েছে এ দেশটির।

আর ১২১ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ তটরেখাই বেনিনে ইসলাম প্রবেশ ও প্রচারে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। অনুন্নত এই জনপদে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের নানা এলাকা থেকে বাণিজ্যিক কাফেলা নিজেদের পণ্য নিয়ে উপস্থিত হতো এই সমুদ্র উপকূলে। আবার কেউ বা আসত দাস সংগ্রহের অভিপ্রায়ে। যদিও তৎকালীন সময়ে পৌত্তলিকতা ছিল বেনিনের প্রধান ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু এসব বাণিজ্য কাফেলার মধ্য থেকে মুসলিম বণিকরা নিজেদের ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ইসলামের সুমহান সৌন্দর্য বেনিনবাসীর সামনে তুলে ধরতে পিছপা হননি। যার ফলে মুসলিম বণিকদের উত্তম চরিত্র-মাধুর্য আর নীতিনৈতিকতায় মুগ্ধ হয়ে অনেক লোক ইসলামের সুমহান ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে শুরু করে। এর মধ্যে কেনিয়া থেকে আগত বেনিনে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী অধিবাসীরা প্রথম ইসলামের ছায়াতলে আসার সৌভাগ্য অর্জন করে। আর কেনীয় নেতাদের আহ্বানে দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। ঞযব ড়িত্ষফ ভধপঃ নড়ড়শ-এর তথ্যানুযায়ী নাইজেরিয়া ও মালি থেকে আগত মুসলিম পণ্ডিতরাই ইসলামের শাশ্বত আদর্শ তুলে ধরতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে বেশির ভাগ বেনিন মুসলিমই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের নীতি-আদর্শ গ্রহণ করেন। যদিও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত শিয়া মুসলিম বণিকরাও নিজেদের আদর্শ প্রচারে চেষ্টার ত্রুটি করেননি।

বেনিনের জাতিগুলোর মধ্য থেকে ইউরোবা ও বারিবা জাতিগুলোই ইসলাম গ্রহণের দিক থেকে অগ্রগামী ছিল। তবে বেনিনের হাউসা ও ফুলানি উপজাতিগুলোও ইসলামের প্রচার ও প্রসারে অনেক ভূমিকা রেখেছে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক শাকির মাহমুদের রচিত আফ্রিকান ইতিহাস-বিষয়ক গ্রন্থ ‘তারিখুল ইসলামী’র ভাষ্য মতে, ১৮৫১ সালে বেনিনে ফরাসি উপনিবেশবাদ গড়ে উঠার পর সেখানে ইসলামের প্রচার ও প্রসার আরো ব্যাপকতা লাভ করে। যদিও সে সময় দেশটির দক্ষিণ প্রান্তে বসবাসরত পৌত্তলিক উপজাতিরা ফরাসি দখলদারদের সহায়তায় ইসলামী জোয়ারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু ইসলামী দাওয়াহ সংস্থাগুলোর প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় সেই প্রতিরোধ ডিঙিয়ে ইসলামের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। এ ক্ষেত্রে নাইজেরিয়ান সুফি নেতাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে আজ বেনিনে ইসলামই হচ্ছে সর্বাধিকসংখ্যক জনতার ধর্মবিশ্বাস। পশ্চিম আফ্রিকার অন্য দেশগুলোর মতো বেনিনেও সর্বাধিকসংখ্যক মুসলিম মালেকি মাজহাবের অনুসরণ করে থাকেন।

ইসলামী শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (ইসেসকো) তথ্য মতে, বেনিনের মুসলমানরা ১৯৯০ দশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি ইসলামী কর্মকাণ্ডের প্রতিও গভীর মনোযোগী হয়ে ওঠেন। আর সে সময় তাঁরা দেশের নানা প্রান্তে মসজিদ প্রতিষ্ঠা, ‘নূর আল ইসলাম’ নামক সংবাদপত্র ও ‘দ্য ইসলামিক উম্মাহ’ নামে একটি মাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। তাঁরা ‘সাওতুল ইসলাম’ নামে একটি রেডিও কেন্দ্র স্থাপনে সক্ষম হন। দেশটির কোটোনো শহরেই রয়েছে কয়েক শ মসজিদ, যার মধ্য থেকে অন্তত ১২টিতে শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় করা হয়। ইউনেসকো ২০১৫ সালে কোটোনোকে বেনিনের ইসলামিক সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক

ফকিরের বাজার, নেত্রকোনা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা