kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

ওফাত স্মরণ

হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর জীবন ও সংগ্রাম

আতাউর রহমান খসরু   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর জীবন ও সংগ্রাম

আল্লামা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) ভারতবর্ষের মুসলিম ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। যিনি একইসঙ্গে ভারতবর্ষের মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক পথনির্দেশক ছিলেন। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ঐতিহ্যবাহী দ্বিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল দেওবন্দের ‘সদরে মুদাররিস’ (পরিচালক) এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় দল ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’-এর সভাপতি ছিলেন।

সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) ১৯ শাওয়াল ১২৯৬ হিজরিতে (১৮৭৯ খ্রি.) ভারতের উত্তর প্রদেশের ‘উন্নাও’ জেলার ‘বাঙ্গারমৌ’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সাইয়েদ হাবিবুল্লাহ নাম রাখেন হুসাইন আহমদ। তবে তাঁর পারিবারিক নাম ছিল ‘চেরাগে মুহাম্মদ’। তিনি ছিলেন হুসাইন (রা.)-এর বংশধর। ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁর পূর্বপুরুষরা মদিনা থেকে তিরমিজ হয়ে লাহোরে আসে এবং সেখান থেকে ভারতের ফয়জাবাদ জেলার এলাহাবাদে বসতি স্থাপন করে। পারিবারিক পরিমণ্ডলেই শায়খুল ইসলাম মাদানি (রহ.)-এর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। বাবা-মায়ের কাছেই তিনি হিফজ সম্পন্ন করেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। শিক্ষকদের ভেতর শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রহ.)-এর প্রভাবই তার ওপর সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি পরিবারের সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন এবং ১৮ বছর সেখানে অবস্থান করেন; যদিও বিশেষ প্রয়োজনে তাঁকে তিনবার ভারতে আসতে হয়েছিল। মদিনায় অবস্থানকালে শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) মসজিদে নববীতে হাদিসের দরস দিতেন। মদিনায় জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্য তাঁর চিন্তা ও মননে ভারসাম্য আনে। বিশেষত সেখানে বহু বর্ণ ও মতবাদের মানুষের উপস্থিতি তাঁর বৈশ্বিক ও ‘উম্মাহ চিন্তা’-কে বিস্তৃত করেছিল।

শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিক্ষুব্ধ সময়ের ভেতরে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোরকালে ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন পুরোপুরি দানা বাঁধতে শুরু করে। তাঁর পরিবার ও শিক্ষকদের প্রায় সবাই ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয়। তাই দেশমাতৃকার মুক্তির দীপ্ত চেতনা নিয়েই তিনি বেড়ে ওঠেন। শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রহ.)-এর সান্নিধ্য তাঁকে আরো প্রদীপ্ত করে তোলে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন যাত্রা শুরু হয় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে। ঐতিহাসিক রেশমি রুমাল আন্দোলনের নেতা শায়খুল হিন্দ মদিনায় আগমন করলে শায়খুল ইসলাম (রহ.) প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন। হিজাজের পবিত্র ভূমিতেই তিনি শায়খুল হিন্দের সঙ্গে কারাবরণ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মিসরের কারাগার হয়ে কুখ্যাত মাল্টা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তিন বছর সাত মাস নির্বাসনে থাকার পর ১৩৩৮ হিজরির (১৯২০ খ্রি.) রমজানে মুক্তি পান। নির্বাসনে থাকাকালে মদিনায় অবস্থিত শায়খুল ইসলাম মাদানি (রহ.)-এর বাড়িঘর লুণ্ঠিত হয় এবং তাঁর মাতা-পিতা, স্ত্রী, সন্তান-সন্তুতি সবাই মারা যান। মাল্টা থেকে দেশে ফেরার পর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, খেলাফত আন্দোলন ও মদিনার বৈরী পরিবেশের কারণে সেখানে আর ফিরে যাওয়া হয়নি। শায়খুল হিন্দের ছায়ায় দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মনোযোগ দেন। এই সময় তিনি খেলাফত আন্দোলন, জমিয়ত ও কংগ্রেসের সদস্যপদ লাভ করেন এবং বিভিন্ন কর্মসূচির নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি অভিন্ন ভারতের প্রবক্তা হলেও দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানে অবস্থিত তাঁর শিষ্যদের তিনি দেশ গঠনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।

১৯২০ সালে শায়খুল হিন্দের নির্দেশে তিনি কলকাতার একটি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯২১ ‘ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করা হারাম’ ফতোয়া দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। দুই বছর কারাবাসের পর ১৯২৩ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন এবং মুহাদ্দিস হিসেবে সিলেটে আগমন করেন। পাঁচ বছর সিলেটে অবস্থানের পর ১৯২৮ সালে তিনি দেওবন্দের সদর মুদাররিস পদে যোগদান করেন। এরপর আজীবন এই পদে বহাল ছিলেন।

শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.)। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি গাঙ্গুহি (রহ.)-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন এবং ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কাছ থেকেই খেলাফত লাভ করেন। তবে তিনি হাজি এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি (রহ.)-এর সান্নিধ্যও লাভ করেন। মাদানি (রহ.)-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল। তাঁর প্রচেষ্টায় আসাম ও সিলেট অঞ্চলে অসংখ্য দ্বিনি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৯২৮ সালে দারুল উলুম দেওবন্দের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি সিলেট ত্যাগ করলেও ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগ পর্যন্ত প্রতি রমজানে সিলেটে ইতেকাফ করতেন এবং এই অঞ্চলের দ্বিনি শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নানা কর্মসূচিতে যোগদান করতেন। তাঁর সেই শ্রম ও প্রচেষ্টার প্রভাব এখনো সিলেট ও আসাম অঞ্চলের দ্বিনচর্চায় বিদ্যমান। বাংলাদেশ শায়খুল ইসলাম মাদানি (রহ.)-এর ৫০ জন খলিফা রয়েছেন যাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশই বৃহত্তর সিলেটের।

৫ ডিসেম্বর ১৯৫৭ সালে বরেণ্য এই মনীষীর মৃত্যু হয়। শায়খুল হাদিস জাকারিয়া (রহ.) তাঁর জানাজার নামাজের ইমামতি করেন এবং দারুল উলুম দেওবন্দের ঐতিহ্যবাহী ‘কাসেমি’ কবরস্থানে প্রিয় শিক্ষক মাহমুদ হাসান দেওবন্দির পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

 

তথ্যসূত্র : মাওলানা ড. মুশতাক আহমদ, শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.; সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, তাজকিরায়ে শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.); ড. রাশিদ আল ওয়াহেদি সংকলিত, শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) : হায়াত ওয়া কারনামা; আসির আদরাভি, মায়াসেরে শায়খুল ইসলাম, ইউপি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা