kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

আধুনিক অর্থনীতিতে মুসলমানের অবদান

মাহামুদুল হাসান   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আধুনিক অর্থনীতিতে মুসলমানের অবদান

মানবসমাজের শুরু থেকেই অর্থনীতির প্রয়োগ ছিল অপরিহার্য। অর্থনীতির তাত্ত্বিক উন্নয়নের আগেও এর প্রয়োগ ছিল মানবসমাজে। পরে বিভিন্ন সভ্যতা এবং মনীষী এই শাস্ত্রের উন্নয়নে অবদান রাখেন। মুসলিমরাও তাদের স্বর্ণযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু পাশ্চাত্যের দার্শনিকরা মুসলমানের অবদান অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। তাঁদের দাবি, অর্থনীতির উন্নয়ন গ্রিক ও রোমানদের মাধ্যমে হয়েছে। প্রায়োগিক অর্থনীতি বিভিন্ন তত্ত্ব উদ্ভাবন করে। সেই সূত্র ধরে পরবর্তী সময়ে ইউরোপে আধুনিক অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয়। তবে গ্রিক ও রোমানদের সঙ্গে ইউরোপের এই অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং তার মধ্যবর্তী সময় সম্পর্কে ইউরোপীয়রা কিছু বলতে চায় না। এই সময়টাই হচ্ছে মুসলিম মনীষীদের হাতে অর্থনীতিশাস্ত্রের উন্নয়নের সময়। তাঁরা গ্রিক ও রোমানদের অর্থনৈতিক তত্ত্ব সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও তার উন্নয়ন করেন, যা থেকে ইউরোপীয়রাও উপকৃত হয়।

হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফার শিষ্য আবু ইউসুফ (রহ.) ছিলেন বাগদাদের প্রধান বিচারপতি। তত্কালীন খলিফার অনুরোধে তিনি রচনা করেন ‘কিতাব আল খারাজ’, যাতে তিনি রাজস্ব সংগ্রহ, আয়ের ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে আলোচনা করেন। আবু ইউসুফ (রহ.) অ্যাডাম স্মিথের অনেক আগে রাজস্ব আরোপের নীতিমালা আলোচনা করেন। দেশের অর্থনৈতিক কী কী দায়িত্ব রয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা করেন । ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর সাধারণ পরিচয়, তিনি একজন দার্শনিক ও সুফি। কিন্তু অর্থনীতিতেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে, যা এমনকি মুসলিমরাও জানে না। গাজ্জালি (রহ.)-এর লেখা থেকে কল্যাণ অর্থনীতির ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর ‘এহইয়া উলুমুদ্দিন’ বইয়ে ‘দেশের আর্থিক নিরাপত্তা’ রক্ষায় অনুসরণীয় নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, দেশের মানুষের জীবন, বুদ্ধিমত্তা, সম্পত্তি ও সম্পদের নিরাপত্তা দেবে সরকার।

ইবনে খালদুন মুসলিম জাহানের একজন খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ। তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখায় শ্রমবণ্টন, মূল্য, চাহিদা, জোগান, ভোগ, সরকারের অর্থসংস্থান ও বাণিজ্যচক্র নিয়ে আলোচনা করেন। ইবনে খালদুনের মতে, অতিরিক্ত অপব্যয়ের কারণে একটি বিরাট সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তিনি দেশের অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ নিরুত্সাহ করেন এবং বাজারকে সুষমবণ্টনের উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন। অ্যাডাম স্মিথের বহু আগে তিনি শ্রমবণ্টনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। AMERICAN President Ronald Regan-এর উপদেষ্টা এবং অর্থনীতিবিদ Arthur Laffer Zuvi Laffer Curve-এর জন্য বিখ্যাত । কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ইবনে খালদুন কয়েক শ বছর আগে এই  CURVE-এর ধারণা দিয়েছিলেন। এমনকি Arther Laffer-ও কোনো সময় বলেননি যে তিনি Laffer Curve-এর উদ্ভাবক; বরং Laffer নিজেই এর কৃতিত্ব ইবনে খালদুনকে দিয়েছেন।

মুসলিম অর্থনীতিবিদরা আধুনিক অর্থনীতির আগেই শিল্পের পারস্পরিক যোগসূত্র এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। মুসলিম মনীষী আশ শায়বানি (রহ.) সর্বপ্রথম এ বিষয়ে আলোচনা করেন। পরবর্তী সময়ে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তা নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করেন। এ ব্যাপারে তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘একটি সামান্য সুই ক্রেতার কাছে আসার আগে তাতে ২৫ জনের অবদান থাকে।’ ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর অন্তত ৭০০ বছর পর পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ একই রকম যুক্তি প্রদানের সময় সুই কারখানার উদাহরণ দিতেন।

ইবনে খালদুন শ্রমবণ্টনের সুবিধা নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদ Spengler শ্রমবণ্টনের ব্যাপারে ইবনে খালদুনের চিন্তা-ভাবনা সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন ১৯৬৪ সালে।

কুদামা বিন জাফর খলিফা আল মুতাসিম বিল্লাহর সময় বাগদাদের অর্থসচিব ছিলেন। অর্থনীতিতে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। আধুনিক অর্থনীতিবিদরা পণ্যের বিনিময়ে পণ্য Barter exchange-এর যেসব সমস্যার কথা বলেন, তা তিনি সেই সময় ব্যাখ্যা করেছিলেন। গাজ্জালি (রহ.) ও আল দিমাস্কি Barter trade-এর সমস্যা ও মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।

অর্থনীতি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা প্রায় সবাই Thomas Gresham-এর দেওয়া Gresham’s law নিয়ে জানেন । Gresham’s law-তে বলা হয়, খারাপ টাকা ভালো টাকাকে বাজার থেকে বের করে দেয়। শায়খ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ও আল মাকরিজি কয়েক শতাব্দী আগে মামলুক সুলতানদের সময়ে এই তত্ত্বের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই আল-হিসবা নামক বিশেষ দপ্তরের ভূমিকা। সংক্ষেপে আল-হিসবা ছিল একটি অফিস, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এবং নীতি-নৈতিকতা পর্যবেক্ষণ করা হতো। অনেক মুসলিম অর্থনীতিবিদই আল-হিসবার দায়িত্ব এবং কর্তব্য নিয়ে বলেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন—আল-শায়বানি, ইবনে বাসাম, ইমাম ইবনে তাইমিয়া, আল-উকবানি, ইবনে আবদ আর-রউফ ও আল-সাকাতি। আল হিসবার কার্যকলাপে এবং মুসলিম অর্থনীতিবিদদের দেওয়া এই দিকনির্দেশনা থেকে এখনকার সময়েও অনেক কিছু অনুসরণ করা হয়। গ্রিক ও রোমান সমাজেও বাজার দেখাশোনার জন্য বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হতো। এসংক্রান্ত অফিসগুলোকে বলা হতো Agoronomos. অনেক ইউরোপীয় পণ্ডিতের দাবি, এই Agoronomos থেকেই মুসলিমরা ‘আল-হিসবার’ ধারণা নিয়েছিল। ‘আল-মাওয়ারদি’ কোরআনেই ‘আল-হিসবা’র ধারণার অস্তিত্ব রয়েছে বলে প্রমাণ করেছেন। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, যে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশিদিনের আমলেও বাজার পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের প্রমাণ পাওয়া যায়।

বর্তমান পৃথিবীর পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভোগবাদী দর্শন অনেক রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। দুনিয়ার মানুষ পুঁজিবাদী অর্থনীতি থেকে বাঁচতে আশ্রয় খুঁজেছিল সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে ইসলামী অর্থনীতির কাছেই ফিরে যেতে হবে।

 

তথ্যসূত্র : আবদুল আজিম ইসলাহি, কন্ট্রিবিউশন অব মুসলিম স্কলারস টু ইকোনমিক থট এবং অ্যানালিসিস; প্রবন্ধ : ইবরাহিম এম ওয়েসিস, ইবনে খালদুন : দ্য ফাদার অব ইকোনমিকস; প্রবন্ধ : হামিদ এস হোসাইনি, কন্ট্রিবিউশন অব মিডেবল মুসলিম স্কলারস টু হিস্টরি অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট; ডেনিয়েল ওলাহ, দ্য ইমেজিং আরব স্কলারস হো বিট অ্যাডাম স্মিথ বায় হাফ অ্যা মিলিয়ন

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা