kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

হারুত মারুত কি ফেরেশতা ছিলেন

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

২৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হারুত মারুত কি ফেরেশতা ছিলেন

ফোরাত নদীর তীরের ধ্বংস হয়ে যাওয়া তৎকালীন সময়ের উন্নত এক শহরের নাম বাবেল। যার অবস্থান প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার (ইরাক) মধ্যে। বর্তমান দুনিয়া যেটিকে ব্যাবিলন (Babylon) নামে চেনে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমি ব্যাবিলনের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাচীন স্থাপত্য—এর কোনো কিছু নিয়েই আলোচনা করতে চাই না। এমনকি তামাম দুনিয়ার মানুষের ব্যাবিলন-বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু ঝুলন্ত উদ্যান নিয়েও কথা বলার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমি আজ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই ব্যাবিলনের নাম মুখে নিলেই কল্পজগতে ভেসে ওঠা হারুত আর মারুতের কথা। জাদুবিদ্যার জয়জয়কারের কথা।

তবে জাদু বলতে ডেভিড কপারফিল্ডের চোখ-ধাঁধানো স্টেজ শো কিংবা ক্রিস অ্যাঞ্জেলের ভ্রু কোঁচকানো হাত সাফাইয়ের কথা বলছি না। আমি বলতে চাইছি এমন জাদুর কথা, যার বাস্তবতা বিজ্ঞান মেনে নিতে নারাজ। কারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরের কোনো কিছু বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার অতীত। পবিত্র কোরআনের ভাষ্যমতে, ‘তারা ওই শাস্ত্রের অনুসরণ করল, যা সোলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। সোলাইমান কুফরি করেননি; শয়তানরাই কুফরি করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। তারা উভয়ই এ কথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে ‘আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফের হয়ো না।’ অতঃপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যা দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে। তারা আল্লাহর আদেশ ছাড়া তা দ্বারা কারো অনিষ্ট করতে পারত না। তারা তা-ই শিখে, যা তাদের ক্ষতি করে এবং কোনো উপকার করে না। তারা ভালোরূপে জানে, যে কেউ জাদুবিদ্যা চর্চা করে, তার জন্য পরকালে কোনো অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা আত্মবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ—যদি তারা জানত!’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১০২)

আলোচ্য আয়াতে হারুত ও মারুত বলে দুটি নাম রয়েছে। যাঁদের নিয়ে রচিত হয়েছে নানা কল্পকাহিনি। গদ্য-পদ্য আর সাহিত্যরসে ভরপুর সেসব ঘটনাবলি কমবেশি সবাই জানেন। অনেক মুফাসসিরের প্রদত্ত ব্যাখ্যায় দেখা যায়, তাঁরা মানুষকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিতেন। তবে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ হিসেবে এটাও বলে দিতেন যে ‘আমরা পরীক্ষার জন্য, কাজেই তুমি কাফের হয়ো না।’ কিন্তু লোকজন সেসব শিক্ষা করে অসৎ কাজে ব্যবহার করতে শুরু করল। তাই আয়াতের শেষে বলে দেওয়া হয়েছে যে যারা এই জাদুবিদ্যা ব্যবহার করে, তাদের জন্য পরকালে কিছুই নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আয়াতে উল্লিখিত নবী সোলাইমান (আ.)-এর সঙ্গে জাদুর কী সম্পর্ক? সেটি জানতে হলে আমাদের চোখ বোলাতে হবে ইসলামপূর্ব জাতিগুলোর ইতিহাসের পাতায়। বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসিরের (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে লিখিত ঘটনার সারসংক্ষেপ হচ্ছে—বিশেষ এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সোলাইমান (আ.)-কে জাদুর অপবাদ দেওয়া হলো। আর তাঁর রাজ সিংহাসনের নিচ থেকে অন্য লোকের লুকিয়ে রাখা কিছু জাদুর বই উদ্ধার করা হলো। অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে সেগুলো নবী ইদ্রিস (আ.)-এর সময়কালের প্রাচীন বাবেলের জাদুবিদ্যার বই। কোরআনের আলোচ্য আয়াতে সেই ঘটনারই জবাবে বলা হয়েছে যে সোলাইমান (আ.) কুফরি কালাম, জাদুবিদ্যা বা ডার্ক আর্টিস্ট আদৌ ব্যবহার করেননি। বরং সেসব চর্চা করত ইবলিশ শয়তান। সোলাইমান (আ.) সেসব বই পুঁতে ফেলেন। এবং সেগুলোর কোনো কিছু প্রয়োগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেগুলো অসাধু লোকেরা খুঁড়ে আনে, আর রাজ্যময় ছড়িয়ে পড়ে। যা আজ সোলেমানি তাবিজের কিতাব নামে একজন নবীর নামে অপবাদ রটিয়ে রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছে।

ফিরে আসছি মূল আলোচনায়। হারুত ও মারুত আসলে কে? এ নিয়ে রয়েছে নানা গল্প। ইমাম তাবারি (রহ.) ও ইবন জারির (রহ.)-এর মতে, কোরআনের আয়াতে উল্লিখিত শব্দ ‘মালাকাইনে বা মালিকাইনে’ এখানে দুটি পঠন রীতিই চালু আছে। যদি বলা হয় ‘মালিকাইনে (দুজন শাসক)’, তাহলে এর ব্যাখ্যা হলো হারুত মারুত কোনো ফেরেশতা নন বরং তৎকালীন সময়ের দুজন বাদশা, যাঁরা কোনো অপরাধ করেছিলেন আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন যে আমাদের দুনিয়াতেই শাস্তি দিন। আল্লাহ সেটি কবুল করেছেন ও দুনিয়াবাসীর শিক্ষার জন্য নিদর্শন হিসেবে সেভাবে রেখেছেন। যেন মানুষ জাদু নামক কুফরি থেকে বিরত থাকে। আর যদি ‘মালাকাইনে (দুজন ফেরেশতা)’ বলা হয়, তাহলে এর ব্যাখ্যা হলো মহান আল্লাহ তাআলা নিজ সৃষ্টি ফেরেশতাদ্বয়কে ইচ্ছা করেই এভাবে রেখেছেন যেন তাঁরা মানুষকে জাদুর বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেন। এটি তাঁদের কোনো শাস্তির কারণে নয়। কারণ ফেরেশতারা কোনো অপরাধ করতে পারেন না। তাঁদের সে যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টিই করা হয়নি। যেমন কোরআনের সুরা তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ফেরেশতা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাঁদের আদেশ করেন। আর তাঁরা যা করতে আদেশপ্রাপ্ত হন তা-ই করেন। (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)

কাজেই হারুত মারুতকে নিয়ে বহুল প্রচারিত জোহরা নামক নারীর মুখরোচক ঘটনায় বিশ্বাস না করে আল্লাহর ফেরেশতাদের ওপর মিথ্যা অপবাদ না রটিয়ে; সত্য ও সঠিক তথ্য জেনে আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে সত্য ধারণা পোষণ করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য বোঝার তাওফিক দান করুন।

লেখক : পরিচালক, তামীরুল উম্মাহ মহিলা মাদরাসা, ভাটারা, ঢাকা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা