kalerkantho

শনিবার । ২ জুলাই ২০২২ । ১৮ আষাঢ় ১৪২৯ । ২ জিলহজ ১৪৪৩

মসজিদভিত্তিক ইসলামী শিক্ষা, মক্তব ও ফুরকানিয়া মাদরাসা নিয়ে বিশেষ আয়োজন

ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রসারে ফুরকানিয়া মাদরাসার অবদান

প্রফেসর ড. রফিক আহমদ   

২৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রসারে ফুরকানিয়া মাদরাসার অবদান

মুসলমানের ঈমান-আমল, ইবাদত-বন্দেগি ও জীবনধারার সব নির্দেশনার গোড়ায় পবিত্র আল কোরআনুল কারিম। কোরআন মাজিদ মুমিনের প্রথম পাঠ্যগ্রন্থ। সালাত থেকে জীবনপ্রণালী সবখানেই সর্বাগ্রে কোরআন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকে বাদশাহি আমল পর্যন্ত, উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে বিশ শতকের সূচনা পর্যন্ত মসজিদভিত্তিক মক্তবে ছিল মুসলমান সন্তানদের বুনিয়াদি শিক্ষার কেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন

মুসলমানদের সন্তানরা মসজিদের সাবাহি (সকালবেলার) মক্তবে ঈমান, আমল, আদব, সুরা, কেরাত, মাসআলা-মাসায়েল ও কোরআন তিলাওয়াতের শিক্ষা পেয়ে আসছে। আগেকার তুলনায় এর সংখ্যা কমে এলেও এখনো ধারাটি অব্যাহত আছে।

এই মক্তবের আরেক নাম ফুরকানিয়া মাদরাসা। শুধু বাংলাদেশই নয়, বরং পাক-ভারত উপমহাদেশের সিংহভাগ লোক যে প্রতিষ্ঠান থেকে কোরআন শিক্ষা করে আসে তা হলো ‘মক্তব’ বা ফুরকানিয়া মাদরাসা। দুই-আড়াই দশক আগেও কোরআন শিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ছিল এটি। বয়স্ক যেকোনো শ্রেণির লোক যিনি কোরআন পড়তে পারেন, তাঁদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনি কোথায় কোরআন পড়া শিখেছেন? সালাত আদায়ের জন্য ছোট ছোট সুরা কোথায় মুখস্থ করেছেন? সালাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত দোয়া ও জিকিরগুলো কিভাবে শিখেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রায় ৯৫ শতাংশ লোক বলবেন, তাঁরা তাঁদের নিজস্ব এলাকার ফুরকানিয়া মাদরাসা থেকেই এসব শিখেছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফুরকানিয়া মাদরাসাগুলোর এত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।

ফুরকানিয়া মাদরাসায় কোরআনের পাঠ

এসব মাদরাসার সৃষ্টিই হয়েছে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য। এ পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনার আগে একটি বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার। তা হলো আমাদের মনে রাখা দরকার যে আরব দেশের শিশুদের কোরআন শিক্ষার পদ্ধতি ও অনারব শিশুদের পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে একই রকম নয়। কারণ আরব শিশুটি মাতৃভাষা আরবি হওয়ার ফলে সে মায়ের কোল থেকেই আধো আধো, ভাঙা ভাঙা আরবি ভাষায়ই কথা বলতে শুরু করে। আস্তে আস্তে সে যখন বড় হতে থাকে এবং লেখাপড়ার জন্য তার হাতেখড়ি দেওয়া হয়, তখন তাকে আরবি বর্ণ, শব্দ ও বাক্য শেখানোর জন্য যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় অনারব শিশুটির জন্য এর ব্যতিক্রম কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করাই স্বাভাবিক। অনারব শিশুদের আরবি বর্ণমালা শিক্ষার আগে কিছু আরবি দোয়া ও জিকির শিক্ষা দেওয়া হয়। যেমন—কালিমায়ে তায়্যিবাহ, শাহাদত, তাআওউজ, তাসমিয়া প্রভৃতি।

ফুরকানিয়া মাদরাসাগুলোতে কায়েদায়ে বাগদাদিয়াকে অনুসরণ করা হয়ে থাকে; তবে গত দুই-আড়াই দশক থেকে নুরানি কায়েদার প্রচলন বেড়েছে। ছেলে-মেয়েদের বয়স যখন প্রায় পাঁচ-ছয় বছর হয় তখন তাদের ফুরকানিয়ায় পাঠানো হয়। এ সময় তাদের একত্রে পড়ানো হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছাত্রীদের আলাদাভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা থাকে। এখানে তাদের আরবি বর্ণমালাগুলো শেখানো হয়। এ জন্য বিশেষ কিছু পদ্ধতি অনুসৃত হয়ে থাকে। পদ্ধতির ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকগুলো গবেষকরা পর্যালোচনা করবেন। একটি ইতিবাচক দিক হলো—একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাছ থেকে কয়েকটি শব্দ ভালোভাবে শিখে নিলে বাকি বর্ণ দ্বারা গঠিত শব্দগুলো একই নিয়মে শিক্ষকের সহযোগিতা ছাড়াই নিজে নিজে পড়তে পারে।

অন্যতম নেতিবাচক হলো, কোরআন শেখাতে গিয়ে ছেলে-মেয়েদের এমন কিছু শব্দ শেখানো হচ্ছে, যা কোরআন-হাদিস তো দূরের কথা অনেক শব্দ আরবি ভাষায় খুঁজে পাওয়া যায় না। এতগুলো অনর্থক শব্দের পরিবর্তে অর্থবোধক শব্দ শেখানো হলে পরবর্তী সময় পড়ালেখার ক্ষেত্রে সে উপকৃত হতো।

নুরানি মাদরাসা যেভাবে এলো

নুরানি মাদরাসার জন্ম মূলত ফুরকানিয়া মাদরাসা থেকেই, অন্য ভাষায় বলা যায়, ফুরকানিয়া মাদরাসার উন্নত সংস্করণের নামই হলো নুরানি মাদরাসা। এ মাদরাসার যিনি স্থপতি তিনি হলেন শায়েখ কারি বেলায়েত হুসাইন (রহ.)। কেন তিনি এ ধরনের একটি পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন? এর জবাবে তিনি নিজেই বলেন, আমি ফুরকানিয়া মাদরাসা এবং মক্তবগুলোর লেখাপড়ার পদ্ধতি গবেষণা করে দেখলাম যে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান পদ্ধতি মোটেও বাস্তবসম্মত নয়; কারণ একজন ছাত্র কয়েক বছর ফুরকানিয়া মাদরাসায় বা মক্তবে লেখাপড়া করেও সহিহ করে কোরআন পড়তে পারে না। অথচ আল্লাহ তাআলা কোরআনে কারিমে বলেছেন, ‘আমি কোরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। ’ আল্লাহ যখন বলেছেন, তিনি কোরআন সহজ করেছেন, তাহলে নিশ্চয়ই কোরআন পড়া সহজ। হয়তো আমরা এই পদ্ধতি খুঁজে পাচ্ছি না। এর পর থেকে তিনি এ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন, শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর সাধনায় সফলকাম হন এবং নুরানি পদ্ধতির মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে পাঠদান শুরু করেন। পাশাপাশি এই ময়দানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। তিনি বহু আগে থেকেই এই পদ্ধতিতে কাজ শুরু করেন, তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ১৯৬০ সাল থেকে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৮১ সালে তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে একটি নুরানি বোর্ড গঠন করেন। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এই পদ্ধতিতে অসংখ্য মাদরাসা গড়ে উঠেছে। ২০০৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে শুধু ঢাকা শহরেই নুরানি মাদরাসার প্রায় দুই হাজার ৪০০ শাখা রয়েছে এবং এসব শাখা-প্রশাখায় প্রায় এক লাখ ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে।

নুরানি মাদরাসার পাঠদান পদ্ধতি

নুরানি মাদরাসার পাঠদান পদ্ধতি দেশের সর্বস্তরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অনারবদের কোরআন শেখানোর জন্য এটি একটি অনন্য পদ্ধতি। ফুরকানিয়া মাদরাসার পাঠদানের মধ্যে ও নুরানিয়ার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, ফুরকানিয়া মাদরাসায় তাত্ত্বিক বা সনাতনি (Theoretical) পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, কিন্তু নুরানি মাদরাসায় ব্যাবহারিক পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। নুরানি মাদরাসায় পাঠদানকালে চক ও ব্ল্যাকবোর্ড ব্যবহার করা হয়। যেমন আরবি বর্ণমালা শেখাতে গিয়ে শিক্ষক ছাত্রদের সামনে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বর্ণ কয়েকবার উচ্চারণ করেন। এরপর বর্ণগুলো ছাত্র-ছাত্রীকে তালকিন (বারবার আবৃত্তি) দিতে থাকেন, একপর্যায়ে তারা বর্ণগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে শেখে।

মোটকথা, মুসলমানদের সন্তান-সন্ততিকে জীবনের বুনিয়াদি স্তরে আবশ্যকীয় ইসলামী শিক্ষা ও কোরআনের তালিমের জন্য মক্তব শিক্ষাব্যবস্থা ও ফুরকানিয়া মাদরাসার গুরুত্ব ও আবেদন পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান রয়েছে। এটা সচল রাখার জন্য সমাজের মানুষের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা