kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

জান্নাতে যাওয়ার সাত আমল

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জান্নাতে যাওয়ার সাত আমল

হাশরের ময়দানে বিচারের পর মানুষের ঠিকানা হবে হয়তো জান্নাত নতুবা জাহান্নাম। তবে তৃতীয় আরেকটি স্থান হবে আরাফ। আরাফবাসীরা জান্নাতে প্রবেশের আশা পোষণ করবে; কিন্তু প্রবেশ করতে পারবে না। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আরাফের ওপর অনেক লোক থাকবে। তারা প্রত্যেককে তার চিহ্ন দ্বারা চিনতে পারবে। আর তারা জান্নাতিদের ডেকে বলবে, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। কিন্তু তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, তবে প্রবেশ করার ব্যাপারে আশাবাদী হবে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৪৬)

সুরা হাদিদে বলা হয়েছে, হাশরের ময়দানে মানুষ তিন দলে বিভক্ত হবে। এক দল সুস্পষ্ট কাফির ও মুশরিক। এদের জাহান্নামের দরজা দিয়ে  ভেতরে প্রবেশ করানো হবে। দ্বিতীয় দল মুমিনদের। তাদের সঙ্গে থাকবে ঈমানের আলো। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘সেদিন (বিচারের দিন) আপনি দেখবেন মুমিন ও মুমিনাদের, তাদের সম্মুখভাগে ও ডান পাশে তাদের জ্যোতি ছোটাছুটি করবে। বলা হবে, আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা : হাদিদ, হাদিস : ১২)

আবদুল্লাহ ইবনে ইবন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, প্রত্যেক মুমিনকে তার আমল অনুযায়ী নুর দেওয়া হবে। ফলে কারো নুর হবে পর্বতসম, কারো হবে খেজুর বৃক্ষসম এবং কারো হবে মানবদেহসম। সর্বাপেক্ষা কম নুর সেই ব্যক্তির হবে, যার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নুর থাকবে। তা আবার কখনো জ্বলে উঠবে আবার কখনো নিভে যাবে। (ইবনে কাসির)

তৃতীয় দল হবে মুনাফিকদের, যাদের সঙ্গে দুনিয়ায় মুমিনদের সম্পর্ক ছিল। তারা হাশরের ময়দানে প্রথমে মুমিনদের সঙ্গে থাকবে এবং পুলসিরাতের দিকে চলতে শুরু করবে। তখন ভীষণ এক অন্ধকার সবাইকে ঘিরে ফেলবে। মুমিনরা ঈমানের আলোর সাহায্যে সামনে এগিয়ে যাবে। মুনাফিকরা তাদের ডেকে বলবে, আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? তারা বলবে, হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদগ্রস্ত করেছ। (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ১৪)

 

জান্নাত কেমন

জান্নাত অর্থ—বাগান, উদ্যান, ঢাকা, আচ্ছন্ন ইত্যাদি। জান্নাত বৃক্ষ তরুলতায় আবৃত হওয়ার কারণে একে জান্নাত বলা হয়। জান্নাত এমন শান্তির জায়গা, যার বর্ণনা দেওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। জান্নাতে রয়েছে এমন সুখ-শান্তি, যা কোনো হৃদয় কল্পনা করেনি এবং কোনো চোখ দেখেনি। জান্নাতে থাকবে উন্নত মানের আসন। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘জান্নাতিদের তাদের ধৈর্যের প্রতিদানস্বরূপ প্রাসাদ দেওয়া হবে। তাদের সেখানে অভিবাদন ও সালাম দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হবে। তথায় তারা স্থায়ীভাবে থাকবে। আশ্রয়স্থল ও আবাসস্থল হিসেবে তা কতই না উত্তম।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭৫-৭৬)

অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে বহু প্রাসাদ, যার ওপর নির্মিত থাকবে আরো প্রাসাদ তথা বহুতলবিশিষ্ট, যার পদদেশে নদী প্রবাহিত।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ২০)

মহানবী (সা.) বলেছেন, জান্নাতে মুমিনদের জন্য একটি মুক্তার তৈরি বিরাট গম্বুজ থাকবে; যার ভেতরের অংশ ফাঁকা থাকবে। ওই গম্বুজটির দৈর্ঘ্য ৬০ মাইল লম্বা হবে। তার প্রতিটি কোণে মুমিনদের সংশ্লিষ্ট স্ত্রী ও খাদেমরা থাকবে। কোনোটির দূরত্ব এত বেশি হবে যে এক কোণের লোক অন্য কোণের লোকদের দেখতে পাবে না। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

প্রস্থের দূরত্ব হবে জাবিয়াহ (একটি জায়গার নাম) থেকে সানআর (একটি জায়গার নাম) দূরত্বের সমতুল্য (তিরমিজি)।

মহানবী (সা.) বলেছেন, জান্নাতে চাবুক রাখার পরিমাণ সামান্য জায়গা দুনিয়া ও এর মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে উত্তম (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

জান্নাতের সুঘ্রাণ ৫০০ মাইল দূর থেকে পাওয়া যাবে। জান্নাতিরা নানা ধরনের ফলফলাদি ভক্ষণ করবে। তারা হবে ৬০ হাত লম্বা এবং ১৪ তারিখের চাঁদের মতো উজ্জ্বল। তাদের উন্নত মানের পোশাক পরিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘জান্নাতে জান্নাতিদের জন্য ফলমূল ও কাঙ্ক্ষিত সব কিছু থাকবে।’ (সুরা : ইয়াসিন)

আরো ইরশাদ করেন, ‘তারা জান্নাতে হেলান দিয়ে বলতে থাকবে—তথা তারা প্রচুর ফলমূল ও পানীয় বস্তু আনতে বলবে।’ (সুরা : সাআদ) আরো ইরশাদ করেন, ‘জান্নাতে আছে দুধের নদী, যার স্বাদ অপরিবর্তনীয় ও পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নদী এবং পরিশোধিত মধুর নদী ও তথায় থাকবে বিভিন্ন ফলমূল ও তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা।’ (সুরা : মুহাম্মদ)

 

জান্নাতে যাওয়ার সাত আমল

চিরসুখের জান্নাতে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থানের জন্য যেসব আমল করা আবশ্যক এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন—১. অনাহারীকে আহার দাও, ২. সালাম প্রচার করো, ৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখো, ৪. মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তথা শেষ রাতে উঠে নামাজ পড়ো। অতঃপর নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করো। এ হাদিসে জান্নাতে যাওয়ার কাজ চারটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা একজন মুমিন এসব কাজ করে থাকে। অপর হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন—১. যে ব্যক্তি হালাল জিনিস ভক্ষণ করে, ২. মহানবী (সা.)-এর সুন্নত তরিকা অনুযায়ী আমল করে এবং ৩. যার অনিষ্ট থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি)

উভয় হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী তারাই জান্নাতের অধিকারী হবে যারা—১. অনাহারীকে আহার দান করে, ২. অপর মুসলমান ভাইকে সালাম দেয় ৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, ৪. রাত জেগে নামাজ আদায় করে, ৫. হালাল রিজিক ভক্ষণ করে, ৬. সুন্নত তরিকা অনুযায়ী আমল করে, ৭. হাত ও জবান দ্বারা কাউকে কষ্ট দেয় না।

মহান আল্লাহ আমাদের এই আমলগুলো বেশি বেশি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা