kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

মহানবী (সা.) যেভাবে মদিনার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মহানবী (সা.) যেভাবে মদিনার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন

মদিনা শরিফের নগররাষ্ট্র ১০ বছরের চেয়েও কম সময়ে উন্নতির ধাপগুলো পেরিয়ে এক বিশাল ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যার রাজত্বের সীমা উত্তরে ইরাক ও শামের সীমান্ত থেকে নিয়ে দক্ষিণে ইয়েমেন ও হাদরামাউত পর্যন্ত, পশ্চিমে লোহিত সাগর থেকে নিয়ে পূর্বে পারস্য উপসাগর ও ইরান রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যার পরিমাপ হলো প্রায় ১০ লাখ বর্গমাইল।

যদিও আগে থেকেই মদিনা শহরের নিয়ম-রীতি আরবের প্রাচীন নিয়ম অনুসারে গোত্রভিত্তিক নেতৃত্বাধীন ছিল। কিন্তু দ্রুতই তা একটি সর্বব্যাপী ও কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতায় রূপ নিল। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি জীবন্ত মোজেজা যে এ বিচ্ছিন্ন একটি জাতিকে নিপুণভাবে একটি জাতিসত্তায় পরিণত করলেন। এটি আরবদের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল। কেননা তারা বিভিন্ন গোত্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় অভ্যস্ত ছিল। ফলে বিভিন্ন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর যখন সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, তখন মদিনায় বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের লোকের বসবাস ছিল। তাদের মধ্যে প্রধান দুটি গোত্র ছিল আউস ও খাজরাজ। বনু কাইনুকা, বনু নজির ও বনু কুরাইজা নামের ইহুদি গোত্ররাও তখন মদিনা এলাকায় বসবাসরত ছিল। এ ছাড়া আরো দুই-চারটি উপদলও ছিল। ইসলামপূর্ব সময়ে মদিনার প্রধান দুটি গোত্র আউস ও খাজরাজের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ লেগে থাকত। এ দুটি গোত্রের প্রায় সবাই যখন ইসলামের ছায়াতলে একত্র হলো, তখন তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। এমন পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে নিম্নের সমস্যাগুলো তাত্ক্ষণিক সমাধানের প্রয়োজন ছিল :

ক. নিজের সাথিদের ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দায়িত্ব এবং অধিকার চিহ্নিতকরণ।

খ. মুহাজিরদের আবাসন ও জীবনযাপনের যাবতীয় উপকরণের ব্যবস্থা।

গ. শহরের অমুসলিম বিশেষত ইহুদিদের সঙ্গে সমঝোতা।

ঘ. শহরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া।

ঙ. মক্কার কুরাইশদের পক্ষ থেকে আক্রান্ত মুহাজিরদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা।

উপরোক্ত লক্ষ্যগুলো সামনে রেখে রাসুলে করিম (সা.) প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মীয় ও গোত্রগত সম্প্রদায়ের জনগণের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে সবাইকে একটি চুক্তির আওতায় নিয়ে এলেন। ইতিহাসে যা ‘মদিনা চুক্তি’ বা ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত।

মদিনা সনদের ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায় ইতিহাস ও সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে। অবশ্য এর কিছু ধারা বিভিন্ন হাদিসের কিতাবেও বিক্ষিপ্তভাবে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আবার সিরাত ও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় কিছু কমবেশিও রয়েছে। এগুলোকে একত্র করে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. জিয়া আলউমরি তাঁর ‘আলমুজতামাউল মাদানি’ কিতাবে। সেখানে তিনি এ চুক্তির বর্ণনাসূত্র নিয়ে গবেষণার সারমর্মও পেশ করেছেন। মদিনা সনদ ও সংশ্লিষ্ট আলোচনার জন্য দেখুন কিতাবটির ১০৭ থেকে ১৩৬ পৃষ্ঠা।

মদিনা চুক্তির মূল কথাগুলো ছিল নিম্নরূপ :

১. এটি ছিল মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক সম্পাদিত একটি চুক্তি। মদিনায় বসবাসকারী প্রায় সব ধর্ম-গোত্রের মানুষকে এ চুক্তির অধীনে আনা হয়।

২. এ ভৌগোলিক সীমায় বসবাসকারী লোকজন একই দেশে বসবাসকারী নাগরিক বলে গণ্য হবে।

৩. চুক্তির আওতাভুক্ত লোকজন যে যে ধর্মেরই হোক একে অন্য থেকে জান-মালের নিরাপত্তা পাবে (যতক্ষণ না সে চুক্তি ভঙ্গ করে)।

৪. ফিতনা-ফ্যাসাদকে শক্ত হাতে দমন করা হবে।

৫. বহিঃশক্তি ও বহিরাগত হামলাকে সবাই মিলে প্রতিহত করবে।

৬. কোনো বিষয়ে বিরোধ পরিলক্ষিত হলে তার ফায়সালা করবেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অর্থাৎ কোরআন-সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী তা মীমাংসিত হবে।

৭. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমতি ছাড়া কেউ যুদ্ধে বের হবে না। (মাজমুআতুল ওয়াছাইকিছ সিয়াসিয়্যাহ লিল‘আহদিন নববী ওয়াল খিলাফাতির রাশিদাহ, ড. হামিদুল্লাহ, পৃ. ৬১, ৬২; আলমুজতামাউল মাদানি ফি আহদিন নুবুওয়াহ, ড. আকরাম জিয়া আল-উমারি পৃ. ১২১, ১২২)

এ ছাড়া উক্ত চুক্তিতে নগরায়ণের পলিসি হিসেবে নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে :

এক. শান্তি প্রতিষ্ঠা।

দুই. শিক্ষা ও দীক্ষার প্রচার এবং সহজীকরণ।

তিন. আবাসন, আয়-রোজগার ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা