kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নগর পরিকল্পনা

মুফতি মাহমুদ হাসান   

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নগর পরিকল্পনা

হিজরতের নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে মদিনায় মুহাজিরদের ঢল নামল। একপর্যায়ে মদিনার স্থায়ী বাসিন্দাদের চেয়ে মুহাজিরদের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে গেল। নবাগতদের আবাসন নিশ্চিত করতে রাসুলে করিম (সা.) প্রথম দিন থেকেই পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করে নিয়েছেন। এই পরিকল্পনার বিশ্লেষণধর্মী পাঠের পর এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ শ বছর আগে নগর পরিকল্পনা ও নগরায়ণ নীতিবিষয়ক তিনি কী অবিশ্বাস্য বিপ্লব সাধন করেছিলেন। নবাগত এত বিশালসংখ্যক মুসলিমকে সীমিত উপকরণের মধ্যে বসবাস ও উপার্জনের ব্যবস্থা করা সহজ বিষয় ছিল না। তা ছাড়া বিভিন্ন বংশ, স্তর, এলাকা থেকে আগত বৈচিত্র্যময় নবাগত মুহাজিরদের এমনভাবে প্রত্যাবাসন করা জরুরি ছিল, যেন তাদের মধ্যে পরদেশি ভাব না থাকে এবং মদিনার পরিবেশে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বা আইন-শৃঙ্খলায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে। সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমনটিই হয়ে থাকে। এটি রাসুলে করিম (সা.)-এর জীবন্ত এমন একটি অলৌকিক কীর্তি, যা নগরবিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের জন্য বিশেষ পাঠ ও গবেষণার দাবি রাখে। আধুনিক শহরগুলোতে নাগরিকদের সামাজিক শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক বিভিন্ন জটিলতার সমাধানে বিশেষজ্ঞরা আজও রাসুলে করিম (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও কর্মপন্থা থেকে অনেক কিছু অর্জন করতে পারে।

সর্বপ্রথম রাসুলে করিম (সা.)-ই পৃথিবীর সামনে এই রহস্য উন্মোচন করেছেন যে শুধু ইট-পাথরের দালানের মধ্যে চিকন গলি আর মার্কেট বানিয়ে দেওয়ার নাম শহর নয়। বরং এর সঙ্গে এমন সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের ব্যবস্থাও অপরিহার্য, যাতে শারীরিক, মানসিক সজীবতা, দ্বিনি ও আন্তরিক প্রশান্তির মাধ্যমে উচ্চমার্গের মানবিকতা এবং মানবসভ্যতার উত্তরণ ও বিকাশ সাধিত হয়।

মদিনা নগরীর প্রাথমিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

প্রাথমিকভাবে মদিনার ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপরিচালনা ভবন তৈরির জায়গা নির্বাচন ও এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আগেই জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শুরুতেই মসজিদে নববী ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের বাসস্থান নির্মাণের মাধ্যমে এর প্রাথমিক পর্ব শেষ হয়। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সব কাজের মূল কেন্দ্র ছিল মসজিদে নববী। আর দ্বিতীয় পর্বের শুরু হয় নবাগত মুহাজিরদের আবাসনের জন্য সংক্ষিপ্ত পরিসরে ঘর নির্মাণের মাধ্যমে। নির্মাণাদির এ স্তর ও পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে বছরখানেক বা এর চেয়েও কিছু বেশি সময় কেটে যায়। (তারিখে ইবনে কাসির : ৩/২২০-২২২)

মদিনা নগরী এক বিবেচনায় মুহাজির শিবির ছিল। যদিও সব মুহাজির মদিনায়ই ছিলেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই মদিনা নগর বিস্তৃত হয়ে আশপাশের বসতিগুলো যথা বনু সায়োদা ও বনু নাজ্জারের সঙ্গে লেগে যায়। যদিও নগরপলিসি ছিল যে মদিনায় শুধু মুহাজিররাই থাকবেন। এ জন্যই পার্শ্ববর্তী গোত্র বনু সালামা যখন মদিনায় এসে বসতি স্থাপনের ইচ্ছা পোষণ করল, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের নিজেদের কলোনিতে থাকার নির্দেশ দিয়ে মদিনায় বসত গড়ার প্রতি নিরুৎসাহ করেছিলেন। (দেখুন : সহিহ বুখারি হাদিস : ১৮৮৭)

মদিনা নগরীর পলিসির মধ্যে এটিও একটি ছিল যে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করে বসতভিটা ছেড়ে আসা অসহায় মুহাজিরদের আবাসন সরকারিভাবে ব্যবস্থা করা। তাই প্রাথমিকভাবে বসবাসের জন্য মসজিদে বা মসজিদসংলগ্ন স্থানে ব্যবস্থা করা হতো, আর বড় গোত্র হলে শহরের এক পাশে বিশাল তাঁবুর ব্যবস্থা করা হতো। আর তাদের প্রাথমিক খানার জন্য সরকারিভাবে মেহমানদারির ব্যবস্থা হতো। প্রাথমিক পর্ব শেষে ধীরে ধীরে স্থায়ী আবাসন ও রোজগারের ব্যবস্থা করা হতো। (তাবাকাতে ইবনে সাদ : ১/৩৪৬, ওয়াফাউল ওয়াফা : ১/৫২৫)

নাগরিকদের স্থায়ী আবাসনের উদ্যোগ

মুহাজির নাগরিকদের স্থায়ী আবাসনের জন্য সাধারণত দুটি ব্যবস্থা করা হতো :

এক. কোনো ধনী আনসারিকে দায়িত্ব দেওয়া হতো যে তিনি যেন একজন মুহাজির ভাইয়ের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করেন। তবে এ ব্যবস্থাটি দীর্ঘস্থায়ী ছিল না, বরং প্রাথমিকভাবে মদিনা রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়মতান্ত্রিক চালু হওয়ার আগ পর্যন্তই ছিল।

দুই. দ্বিতীয় ব্যবস্থাপনা ছিল, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনাবাদি জায়গাগুলো আবাদ করার মাধ্যমে অথবা কিছু আনসারি সাহাবির দানের মাধ্যমে প্রাপ্ত জমিতে মুহাজিরদের জন্য বড় বড় ঘর তৈরি করা হতো। এই ঘরগুলো বড় বড় কামরাবিশিষ্ট ছিল। একেক ঘর একেক গোত্রকে দেওয়া হতো। তবে রান্নাবান্নার জায়গা গোত্রভিত্তিক একত্রে ছিল। (তারিখে ইবনে কাসির : ৩/২২৪-২২৯, ওয়াফাউল ওয়াফা : ১/৫২৭)

নগরায়ণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ

বর্তমানে আধুনিক নগরায়ণে সাধারণত নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয় :

১. শহরের রাস্তা ও সড়ক, মার্কেট নির্মাণ এবং আবাসন ব্যবস্থা।

২. বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা ও বণ্টন।

৩. ব্যবহৃত পানির নিষ্কাশন ও ময়লা-আবর্জনার ডাস্টবিনের ব্যবস্থা ও তার পরিচ্ছন্নতা।

৪. শিক্ষা, চিকিৎসা, অন্য সেবামূলক সংস্থাগুলো গঠন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা।

৫. শহরের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যবর্ধন ও বিনোদনকেন্দ্র স্থাপন।

৬. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি।

এসব বিষয়ের ব্যাপারেই রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। বিশেষভাবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রত্যেকটি পয়েন্টের ওপরই স্তরমাফিক বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। আমরা এ স্বল্প পরিসরে সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে সবার বিস্তারিত আলোচনা করতে পারব না এবং এখানে তার প্রয়োজনও নেই। তাই সংক্ষিপ্তাকারে কিছু বিষয়ে আলোচনা করছি।

শিক্ষা সম্প্রসারণ ও চিকিৎসাব্যবস্থা

রাসুলুল্লাহ (সা.) শিক্ষা সম্প্রসারণে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। বিভিন্ন গোত্রভিত্তিক পাঠশালা তৈরি করে সেখানে একাধিক শিক্ষক নিয়োগ দিতেন। যাঁরা তাদের কোরআন-সুন্নাহ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতেন, দ্বিনি দাওয়াত সম্প্রসারণ করতেন। (দেখুন : সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০০২, ১৩৯৫, ৪৩৪১, ৪৩৪৯)

মসজিদে নববীসংলগ্ন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে  তোলেন। তা ছিল একটি উন্মুক্ত পাঠশালা। সেখানে বিশেষ করে অসহায় ও পরদেশি মুসলিমদের জন্য শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ধনী সাহাবিদের অর্থায়নে খাদ্য, চিকিৎসা ইত্যাদিরও ব্যবস্থা হতো। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪২, ৬০২, ৬৪৫২)

এ ছাড়া ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর সহিহ বুখারিতে মসজিদে অসুস্থদের সেবার জন্য স্বতন্ত্র তাঁবু নির্মাণবিষয়ক একটি অনুচ্ছেদও উল্লেখ করেন। যেখানে অসহায় রোগীদের চিকিৎসা ও সেবা করা হতো। (দেখুন : বুখারি, হাদিস : ৪৬৩)

বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা

মদিনার মানুষদের ব্যাপকভাবে খাবার পানির জন্য এক ইহুদি থেকে ‘রুমা’ নামক কূপটি খরিদ করে তা প্রশস্ত করে খনন করার প্রয়োজন হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কাজের জন্য সাহাবায়ে কেরামকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি ‘রুমা’ নামক কূপটি খনন করবে, তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। হজরত উসমান (রা.) তা শুনে ‘রুমা’ নামক কূপটি খরিদ করে তা প্রশস্ত করে খনন করে জনসাধারণের জন্য ওয়াক্ফ করে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৭৮)

হজরত সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার মা ইন্তেকাল করেছেন, তাঁর ইসালে সাওয়াবের জন্য কোন সদকা উত্তম? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘পানির ব্যবস্থা করা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৮১, নাসাঈ, হাদিস : ৩৬৬৪)

এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় সাহাবিরা কূপ খনন করেন, সিরাতের কিতাবগুলোতে যার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

শহরের রাস্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনা

শহরের মধ্যে অনেকে অন্যায়ভাবে রাস্তা দখল করে ‘তোমাদের মধ্যে যদি রাস্তা নিয়ে বিবাদ হয়, তাহলে তোমরা তার চওড়া (কমপক্ষে) সাত হাত বা সাত গজ রাখবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬১৩)

সড়কের নিরাপত্তাবিষয়ক নির্দেশ হলো, ‘ঈমানের ৭৭টি শাখা রয়েছে, এর মধ্যে সর্বোচ্চ হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিসগুলো সরানো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৮)

অন্য বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘জনৈক ব্যক্তি পথচলাকালে পথিমধ্যে কাঁটাযুক্ত ডাল পেয়ে তা সরিয়ে রাখল, এতে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ক্ষমা করে দিল।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫২)

মসজিদ ও কবরস্থান নির্মাণ

এলাকাভেদে প্রয়োজনীয় মসজিদ ও কবরস্থান নির্মাণ করেন। মদিনায় এসে শুরুতেই রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববী নির্মাণ করলেন। এর পাশেই ‘বাকি’ নামক স্থানে মুসলিমদের কবরস্থান গড়ে ওঠে। এ ছাড়া আশপাশের এলাকাগুলোতেও মসজিদ ও কবরস্থান গড়ে ওঠে।

নাগরিক প্রয়োজনে মার্কেট নির্মাণ  ও এর তত্ত্বাবধান

মদিনার নাগরিকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সহজলভ্যতার জন্য পূর্ব থেকেই চলে আসা বাজারের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) নতুন করে বাজার খুলে দিয়েছেন। এই বাজারের ব্যবসা সম্প্রসারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) অসামান্য প্রচেষ্টা চালান। পূর্ণ আরব উপদ্বীপ করায়ত্ত হওয়ার পর থেকে আমদানি-রপ্তানির কাজেও নতুন মাত্রা যোগ হয়। এমনকি এ ঘোষণা করে দিলেন যে মদিনার বাজারে ব্যবসায়ীদের জন্য শুল্ক ট্যাক্স নেই। (ফুতুহুল বুলদান পৃষ্ঠা ২৪)

ব্যবসার প্রতি উৎসাহমূলক অনেক হাদিস রয়েছে। একটি হাদিসে এসেছে, ‘সত্যবাদী আমানতদার ব্যবসায়ীরা আখিরাতে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)

তা ছাড়া বাজার পরিচালনার জন্য প্রাথমিকভাবে ১২ জনের কমিটি বানিয়ে দিলেন, যার প্রধান ছিলেন হজরত ওমর (রা.)। (সিরাতে ইবনে হিশাম ২/৪৯১, আত্তারাতিবুল ইদারিয়্যা ১/২৮৪)

তা ছাড়া ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন ব্যাবসায়িক আইন জারি করেন। অবৈধ কারবার, মজুদদারি, সুদ, জুয়া, ধোঁকা, প্রতারণা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করাসহ সব অপকর্ম নিজ তত্ত্বাবধানে দমন করেন।

একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) জনৈক ব্যক্তির দোকানের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাতে রাখা খাদ্যের স্তূপের ভেতর হাত দিলেন। এতে অনুভব করলেন যে ওপর দিয়ে ভালো খাদ্য রাখা থাকলেও স্তূপের ভেতরে ভেজা। তখন দোকানদারকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে দোকানদার বলল, হে আল্লাহর রাসুল! এটা বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি তা ওপরে রাখলে না কেন? যাতে মানুষ দেখেশুনে কিনতে পারে।’ অতঃপর বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৩১৫)

পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি পবিত্রতাকে পছন্দ করেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করেন। তিনি দয়াশীল, দয়াশীলতা পছন্দ করেন। তিনি দানশীল, দানশীলতা পছন্দ করেন। অতএব, তোমরা তোমাদের আঙিনাগুলো পরিষ্কার করো, ইহুদিদের মতো হয়ো না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৭৯৯, মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস : ৭৯০)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা দুই অভিশাপকারী থেকে বেঁচে থাকো।’ সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! দুই অভিশাপকারী কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মানুষের চলাচলের পথে অথবা মানুষের ছায়াগ্রহণের স্থানে প্রস্রাব-পায়খানা করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯) 

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব না করে, অতঃপর তা দিয়ে গোসল করে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩৯, মুসলিম, হাদিস : ২৮২)

পথঘাট অবৈধ ভোগদখলে নিষেধাজ্ঞা

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা রাস্তার ওপর বসা ছেড়ে দাও। লোকজন বলল, এ ছাড়া আমাদের কোনো পথ নেই। কেননা এটাই আমাদের ওঠাবসার জায়গা এবং এখানেই আমরা কথাবার্তা বলে থাকি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি তোমাদের সেখানে বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে। তারা বলল, রাস্তার হক কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, দৃষ্টি অবনমিত রাখা, কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করা।’ (সহিহ বুখারি হাদিস : ২৪৬৫)

অন্য বর্ণনায় বর্ণিত হকগুলোর সঙ্গে আরো কয়েকটি হক যোগ করা হয়েছে। তা হচ্ছে—পথচারীদের পথ দেখিয়ে সহযোগিতা করা, পথ হারানো ব্যক্তিকে পথ দেখানো এবং রাস্তায় যেকোনোভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করা। (সুনানে আবি দাউদ হাদিস : ৪৮১৬, ৪৮১৭)

নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন

পরিবেশ সুন্দর করাও ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা অপব্যয়হীন যেকোনো সুন্দরকে পছন্দ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা নিজে সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।’ (সহিহ মুসলিম হাদিস : ১৪৭)

মদিনায় ছিল অনেক সুন্দর দৃষ্টিনন্দন খেজুরবাগান। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহ দিতেন এবং অযথা গাছ কাটা ও পাতা ছেঁড়াকে নিষেধ করতেন। তিনি মাঝেমধ্যে খেজুরবাগানে গিয়ে বিশ্রাম নিতেন। মসজিদে নববীর সামনেই হজরত আবু তালহা (রা.)-এর বাইরুহা নামক একটি বাগান ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মাঝেমধ্যে সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নিতেন, সেখানকার কূপ থেকে ঠাণ্ডা পানি পান করতেন। (বুখারি হাদিস : ১৪৬১)

বৈধ বিনোদন ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্লান্তি দূরীকরণ, বিনোদন ও ঘোরাফেরার জন্য মদিনা শহরের অদূরে আকিক উপত্যকাকে নির্ধারণ করেন। সেখানে বৃক্ষ রোপণ করেন এবং পশু চরানোরও ব্যবস্থা করেন। তিনি নিজেও মাঝেমধ্যে আকিক উপত্যকায় গিয়ে আরাম করতেন। (ওয়াফাউল ওয়াফা : ৩/১৮৫)

মদিনার ছেলেরা বিভিন্ন মাঠ-প্রান্তরে বৈধ খেলাধুলা যথা শরীরচর্চা, দৌড় প্রতিযোগিতা, তরবারি চালনা, তীরন্দাজি ও ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা করত। (দেখুন : আবু দাউদ হাদিস : ৪৭৭৩, ৫২০২)। একদা মসজিদে নববীর পাশে ছেলেরা খোলা মাঠে তরবারি চালনা প্রতিযোগিতার খেলা করছিল। হজরত ওমর (রা.) তা দেখে বাধা দিতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে নিষেধ করেছেন এবং ছেলেদের খেলতে উৎসাহ দিলেন। (বুখারি হাদিস : ৯৮৮)

একদা বনু আসলামের লোকেরা তীরন্দাজি খেলছিল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘হে ইসমাঈলের বংশধররা! হ্যাঁ, তীর নিক্ষেপ করো, কেননা তোমাদের পিতাও দক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন।’ (বুখারি হাদিস : ২৮৯৯)

এ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান সিরাতের একটি অধ্যায় তথা নগরপরিকল্পনার সামান্য বিবরণ। নচেৎ এ বিষয়টি স্বতন্ত্র গবেষণার দাবি রাখে। বর্তমানে শহরগুলোতে নাগরিকদের সামাজিক রীতি, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক বিভিন্ন জটিলতার সমাধানে বিশেষজ্ঞরা আজও রাসুলে করিম (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও কর্মপন্থা থেকে নিকনির্দেশনা অর্জন করতে পারে। মূলত মানবতার ত্রাণকর্তা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের কোনো অংশকে বাদ দিয়েই মানবসমাজ সঠিকভাবে চলতে পারে না। বরং সব ক্ষেত্রেই তাঁর দ্বারস্থ হওয়া অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের দায়িত্বশীলদের বোঝার তাওফিক দান করুন।

 

মদিনা জনপদের নগরায়ণ

নববীযুগের শেষের দিকেই মদিনা নগরী পশ্চিমে বুতহা পর্যন্ত, পূর্বে বাক্বি ও উত্তর-পূর্বে বনু সায়েদা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যায়। তখনই রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে নতুন বাসস্থান স্থাপনে নিরুৎসাহ করেন। যদিও ধীরে ধীরে আরো কিছু সীমানা বিস্তৃত হয়, তবে মৌলিকভাবে তা নিয়ন্ত্রণে সফল হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখন মদিনার বসতি সিলা পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছবে, তখন তোমরা শামের (সিরিয়া, জর্দান ও ফিলিস্তিন) দিকে হিজরত করবে।’ (ওয়াফাউল ওয়াফা : ১/৯৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ পদক্ষেপটি নগর পরিকল্পনায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর গুরুত্ব ওই ব্যক্তিই বুঝতে পারবে, যে বর্তমানের শৈল্পিক শহরগুলোর কপটচরিত্র ও উচ্ছৃঙ্খল সমাজকে কাছ থেকে উপলব্ধি করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা শহরকে বিশেষ সীমা থেকে বাড়তে দেননি। এ নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি নিম্নোক্ত তিনটি পথ অবলম্বন করেন :

১. যাদের পরিবারে সদস্যসংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় আবাসন সংকট তৈরি হয়, তাদের ওপরের দিকে তলা বাড়িয়ে একাধিক তলাবিশিষ্ট ঘর বানানোর নির্দেশ দেন। হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) তাঁর ঘরের সংকীর্ণতার সমস্যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পেশ করলে তিনি বলেন, ‘তুমি ওপরের দিকে ঘর উঠাও, আর আল্লাহর কাছে প্রশস্ততা কামনা করো।’ (আখবারু মাক্কা : ৩/৩০৪)

২. অতিরিক্ত বসতিকে নতুন খালি স্থানে স্থানান্তর করার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে দুটি উপকার হয়েছে। প্রথমত, এতে কৃষি উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। আর দ্বিতীয়ত, নবাগতদের আবাসনের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা হয়েছে।

৩. বনু কুরাইজা ও বনু নজিরের বিজিত এলাকাসহ মদিনার অভ্যন্তরীণ অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। যাতে একদিকে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টির সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়, অন্যদিকে গোত্র ও শ্রেণিগত সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ গড়া যায়। (বুখারি, হাদিস : ৪০২৮, ফুতুহুল বুলদান পৃষ্ঠা : ৩১)

এতে কোনো অতিশয়তা নেই যে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ উদ্দেশ্যে অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করেছিলেন। বর্তমানে কিছু পশ্চিমা দেশ এসব সোনালি নীতি অনুসরণ করেই সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলা দূরীকরণে একধরনের সফল হয়েছে, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) সাড়ে চৌদ্দ শ বছর আগে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা