kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৭ । ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৪ সফর ১৪৪২

ধরতে এসে নিজেই ধরা!

মুফতি তাজুল ইসলাম   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধরতে এসে নিজেই ধরা!

মহানবী (সা.) যখন হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় যাচ্ছিলেন তখনকার ঘটনা। কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে ধরে এনে দেওয়ার জন্য বিরাট অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। বহু লোক ওই পুরস্কারের লোভে নবীজির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিল। সুরাকা ইবনে মালেকও তাদের একজন। অন্যদের মতো সেও নবীজির অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।

এক স্থানে গিয়ে নবীজির সন্ধান পেয়েও গেল। সুরাকা নবীজি ও আবু বকর (রা.)-কে ধরার জন্য উল্কাবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে চলল। ক্রমেই সে তাঁদের নিকটবর্তী হচ্ছে। সে একেবারেই কাছাকাছি পৌঁছে গেলে আবু বকর (রা.) কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!’ নবীজি বলেন, ‘আবু বকর! পেরেশান হয়ো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪০)

এরপর নবীজি (সা.) সুরাকার জন্য বদদোয়া করলেন। বদদোয়ার ফলে সুরাকারের ঘোড়ার পা হঠাৎ জমিনে ঢুকে গেল এবং এই পরিমাণে ঢুকে গেল যে ঘোড়ার পেট জমিনের সঙ্গে লেগে গেল। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে অনেক চেষ্টা করল। হাত-পা ছোড়াছুড়ি করল; কিন্তু কোনো লাভ হলো না। অবশেষে সে নবীজির কাছে ফরিয়াদ করে বলল, ‘আমি জানি আপনি আমার জন্য বদদোয়া করেছেন। দয়া করে আপনি আপনার প্রভুর কাছে দোয়া করুন, যাতে তিনি আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। যদি আমি এই বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যাই, তাহলে আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি—এর পর থেকে আপনার দিকে ধাবমান যাবতীয় বিপদাপদ ও তুফানের বিরুদ্ধে আমি অপ্রতিরোধ্য পাহাড়ের মতো দাঁড়াব; আমি কাউকেই আপনার পর্যন্ত পৌঁছতে দেব না।’

নবীজি (সা.) সুরাকার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন। বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে সে মক্কার দিকে ফিরে চলল। পথিমধ্যে যার সঙ্গেই তার সাক্ষাৎ হতো, সে তাকেই বলত, ‘এদিকে যেয়ো না। এদিকে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি বহুদূর পর্যন্ত গিয়ে এসেছি। সেখানে তোমরা কাউকে পাবে না।’ সুরাকা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসন্ধানকারী সবাইকেই এ কথা বলছিল যে মুহাম্মদকে এদিকে তালাশ করে লাভ নেই। অন্য কোথাও যাও এবং সেদিকে তালাশ করো। (সহিহ বুখারি, হাসিস : ৩৬১৫)

এভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে কাফির-মুশরিকদের নিকৃষ্ট সংকল্প থেকে রক্ষা করলেন। কেননা নবীজিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও হেফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজেই গ্রহণ করেছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি ওয়াদা করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর ওয়াদা বাস্তবায়নে সত্যবাদী। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে মানুষের (অকল্যাণ) থেকে রক্ষা করবেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)

সুরাকা পরবর্তীকালে কোনো এক সময় আবু জাহিলকে লক্ষ করে এই কবিতাগুলো আবৃত্তি করেছিল—

আবুল হাকাম! জাহেলি যুগে আবু জাহিলের উপনাম ছিল ‘আবুল হাকাম’, আল্লাহর কসম! তুমি যদি ওই সময় উপস্থিত থাকতে, যখন আমার ঘোড়ার পা জমিনে ধসে গিয়েছিল, তাহলে তুমি বিস্ময়ের সাগরে ডুবে যেতে। তুমি যদি এই বাস্তবতায় কখনো সন্দেহ না করতে যে মুহাম্মদ (সা.) নিঃসন্দেহে আল্লাহর সত্য নবী এবং তার প্রমাণও আছে, তাহলে কার এমন দুঃসাহস আছে যে তার মোকাবেলায় সামনে দাঁড়াবে? তোমার জন্য করণীয়—তুমি মানুষকে তাঁর পথে কাঁটা বিছাতে বাধা দেবে। কেননা আমি দেখতে পাচ্ছি, এমন একদিন অবশ্যই আসবে, যেদিন সারা পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় মুহাম্মদের পতাকা উড়বে। তাঁর সাহায্য ও বিজয়কে দুনিয়ার কোনো শক্তিই বাধা দিতে পারবে না। যদি জগতের সব মানুষও একজোট হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, তাহলে খোদ ‘মদদ’ই সদলবলে তাঁর সাহায্যার্থে চলে আসবে।

সুরাকা ইবনে মালেক ইবনে জুশুম (রা.) অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমান হয়েছিলেন।

বলা যায়, মহানবী (সা.)-কে ধরতে এসে তিনি নিজেই ‘ধরা খেয়ে’ গেলেন। (দালাইলুন্নুবুউওয়া লিল বায়হাকি : ৪/৪৮৯, আখবারু মক্কা লিল ফাকিহি : ৪/৮৫, আল-ইসাবা : ৫/৩৬)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা