kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

বুখারা যখন আমাদের ছিল

মোস্তফা কামাল গাজী   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বুখারা যখন আমাদের ছিল

উজবেকিস্তানের বুখারা মধ্য এশিয়ার ছিমছাম, নিরিবিলি ও প্রাণবন্ত একটি শহর। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থস্থান। মুসলিম সংস্কৃতি ও ধর্মীয় দর্শনের অন্যতম পীঠস্থান। ইলমে হাদিসের সূতিকাগার। মুসলমানদের প্রাণের শহর। যেখানে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য ক্ষণজন্মা মুসলিম মনীষী। এখান থেকেই ইসলামের আলো ছড়িয়েছে বিশ্বময়। একটা সময় বুখারা ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সারা বিশ্ব থেকে ইলমের ভ্রমররা এখানে আসত দ্বিনি শিক্ষা গ্রহণের জন্য। একমাত্র বুখারায় অসংখ্য এমন মাদরাসা ছিল, যেখানে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত ছাত্র পড়াশোনা করত। বুখারার কেন্দ্রীয় মাদরাসা এত বিশাল ছিল যে সেখানে একসঙ্গে সহিহ বুখারির দারস নিত চার হাজারের মতো ছাত্র। হাদিসশাস্ত্রের সম্রাট ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল বুখারি (রহ.) জন্ম নিয়েছেন এই শহরেই। তাঁর জগদ্বিখ্যাত বুখারি শরিফও সংকলন করেছেন এখানে বসে। এ ছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রের স্বনামধন্য পণ্ডিত ইবনে সিনা ও বিখ্যাত সুফি বাহাউদ্দিন নকশবন্দি (রহ.)-এর জন্মস্থানও এই শহর। এ কারণে অনেকেই একে সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মিলনস্থল, বিশ্বের শিল্প-সংস্কৃতির তারকা ব্যক্তিদের উত্থানভূমি এবং সময়ের কৃতী সন্তানদের সম্মেলনস্থল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই শহরের প্রাচীন স্থাপত্য, বিশাল প্রাসাদ, বাগানবীথি এবং নির্মাণশৈলী পর্যটকদের সহজেই মুগ্ধ ও মোহাবিষ্ট করে। প্রাচীন যুগ থেকেই নানা রাজবংশের শাসকদের পছন্দের জায়গা ছিল এই

বুখারা। নানা সময়ে নানা শাসক এর সৌন্দর্যবর্ধন ও সমৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছেন। তবে বুখারা সব দিক থেকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে মধ্যযুগে। এই সময়ে স্থাপিত মোহনীয় অসংখ্য স্থাপনা এখনো বিদ্যমান রয়েছে আগের মতো। ১৩৩০ খ্রিস্টাব্দে ইতিহাসের মহাপরিব্রাজক ইবনে বতুতা এই শহরে ভ্রমণ করেছিলেন। তখন তিনি এই শহরকে ‘বিশ্বের সুন্দরতম বৃহৎ শহর’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বুখারার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

বুখারার পথচলা শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দে। তখন এটি ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের একটি রাজ্য। পরবর্তী সময়ে এটি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের দখলে আসে। আরবদের অধিকারে এসে মুসলিম সভ্যতায় সমৃদ্ধ হওয়ার আগে বুখারায় দুটি ধর্মীয় আন্দোলন সংঘটিত হয়। একটি সাসানি সাম্রাজ্যের শাসনামলে ম্যানিকাশিনিজম, আরেকটি অ্যাসিরিয়ান চার্চ অব ইস্টের নেস্টেরিয়ান ক্রিশ্চিয়ানিটি। এই ঘটনাগুলোর সাক্ষী হিসেবে এখানে বেশ কিছু কয়েন ও ক্রুশ পাওয়া গেছে। বুখারায় সর্বপ্রথম ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসেন ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ। তিনি ছিলেন হজরত মোয়াবিয়া (রা.)-এর সময়ে খোরাসানের গভর্নর। তিনি যখন বুখারায় অভিযান পরিচালনা করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৫। সে সময় খাতুন নামের এক বিধবা নারী বুখারা শাসন করতেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি তুর্কিদের সাহায্য গ্রহণ করেন। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ মাত্র ২৪ হাজার সৈনিক নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাদের সামনে টিকতে না পেরে তাঁর সৈন্যদল এক লাখ দিরহামে সন্ধিচুক্তি করতে বাধ্য হয়।

বুখারার চূড়ান্ত বিজয় হয় কুতাইবা ইবনে মুসলিম (রহ.)-এর হাতে। খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের সময় (৮৬-৯৬ হি.) তিনি খোরাসানের শাসক ছিলেন। তিনি ৯০ হিজরিতে তৎকালীন শাসক ওয়ারদান খাদাহকে পরাজিত করে বুখারার চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করেন। ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে এটি সামানিদদের রাজধানীর মর্যাদা পায়। সামানিদদের স্বর্ণযুগে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে বুখারা। ইমাম বুখারি (রহ.) এই সময়ে জন্মলাভ করেন। সামানিদরা ৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি রাজবংশ কারাখানিদদের কাছে পরাজিত হয়। এরপর বুখারা খাওয়ারিজম শাহের রাজ্যের অন্তর্গত হয়। ৬১৬ হিজরি মোতাবেক ১২২০ খ্রিস্টাব্দে বুখারা শিকার হয় চেঙ্গিস খানের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের। তাঁর নেতৃত্বে বুখারা নগরী হস্তগত হলে তাতে ব্যাপক হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি ছিল একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। এ সময় বুখারার অনেক পুরনো প্রাসাদ ও প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংস হয়। এ ছাড়া বুখারার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও কমে যায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ইসলামী শিক্ষাদীক্ষা বহাল থাকে আপন অবস্থায়। তবে মোগলদের ইসলাম গ্রহণের পর বুখারা আবারও শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ও ইলমচর্চায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

তৈমুর লংয়ের উত্থানের আগ পর্যন্ত চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিরাই বুখারা শাসন করে। এরপর বুখারা পরিণত হয় শায়বানি শাসকদের রাজধানীতে। তারপর উত্থান ঘটে আমিরাত অব বুখারার। রাশিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় রেড আর্মি আমিরাত অব বুখারা দখল করে নেয়। এরপর আসে বুখারান পিপলস রিপাবলিকের যুগ। এই সময় বুখারা উজবেক সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকের অঙ্গীভূত হয়। এরপর ১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান স্বাধীন হলে বুখারা হয় বুখারা প্রদেশের রাজধানী।

বুখারার ঐতিহাসিক স্থাপনা

বুখারা শহরটি স্থাপত্যশিল্পে বেশ সমৃদ্ধ। তাই একে বলা হয় City of Museum বা ‘জাদুঘরের শহর’। শহরটি ছোট-বড় মোট ১৪০টি ঐতিহাসিক স্থাপত্য ধারণ করে আছে।

বুখারায় কমপক্ষে ২০০ মসজিদ ও শতাধিক মাদরাসা আছে। ঐতিহ্যবাহী নানা মসজিদ-মাদরাসার অবস্থানের কারণে ইউনেসকো বুখারাকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে’র মর্যাদা দিয়েছে।

লেখক : শিক্ষক

জামিয়াতু ইলয়াস আল ইসলামিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা