kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

হাদিসশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অবদান

মুফতি মুহম্মদ রফিকুল ইসলাম

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাদিসশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অবদান

সাহাবায়ে কিরামের পর যাঁরা হাদিসশাস্ত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন তাঁরা হলেন তাবেয়িরা। হিজরি প্রথম শতক থেকে দ্বিতীয় শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ দীর্ঘ সময়ে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন অঞ্চল ও শহরে হাদিসশাস্ত্র প্রচার ও প্রসারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তাবেয়িরা। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরিতে। তখন জীবিত ছিলেন অনেক সাহাবি।

 

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কতজন সাহাবি দেখেছেন?

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কতজন সাহাবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন—এ প্রসঙ্গে মতভেদ রয়েছে। আল্লামা ইবনে হাজর মাক্কি (রহ.) বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) আটজন সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। তার মধ্যে রয়েছেন আবদুল্লাহ ইবন আবু আওফা (রহ.), আনাস ইবনে মালিক (রা.), সাহল ইবনে সায়াদ, আবুত্তোফাইন (রা.) (আল খাইরাতুল হাসান, পৃষ্ঠা : ২২, আল মানাকেব লিল মাক্কি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২৪)

আল্লামা আলাউদ্দীন বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) জীবনে প্রায় ২০ জন সাহাবিকে পেয়েছেন (হাশিয়া রাদ্দুল মুহতার, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৫৯)।

‘মুনিয়াতুল মুফতি’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সাতজন সাহাবির কাছে হাদিস শ্রবণ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) যে একজন তাবেয়ি ছিলেন—এ কথা ইমাম জাহবি ও আসকালানি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন। আসকালানি (রহ.) আরো বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এক জামাত সাহাবায়ে কেরামকে দেখেছেন, যাঁরা কুফায় অবস্থান করতেন। ঐতিহাসিক ইবনে সায়াদ বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কে দেখেছেন। তিনি বসরায়, ৯১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন (ইসাবা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৮৪)।

 

ইলমে হাদিস শ্রবণ ও শিক্ষা

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) যখন ইলমে হাদিস শ্রবণ ও শিক্ষার উদ্দেশ্য করেন তখন সমগ্র মুসলিম জাহান হাদিসচর্চায় মুখরিত ছিল। প্রত্যেক শহর ও জনপদে হাদিসচর্চার বড় বড় মারকাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অনেক সাহাবি তখন জীবিত ছিলেন, তাঁরা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিলেন। অসংখ্য তাবেয়ি তাঁদের কাছে হাদিস শ্রবণ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) প্রথমে কুফার হাদিসবিশারদ বড় তাবেয়িদের কাছে হাদিস শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কুফার ৯৩ জন মুহাদ্দিসের কাছে হাদিস শিক্ষা লাভ করেছেন। ইমাম জাহবির বর্ণনানুযায়ী ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর হাদিসের শিক্ষক ছিলেন ২৯ জন। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন বড় বড় তাবেয়ি। তাঁদের মধ্যে ইমাম শাবি, সালমা ইবন কুহাইল, মুহারিব ইবন দিসার, আবু ইসহাক সাবরি, আত্তন ইবন আবদুল্লাহ, সামাক ইবন হারব, আমর ইবন মুররা, মনসুর ইবন মামর, আমশ ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ, আদি ইবনে মারসাদ প্রমুখ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁদের কাছ থেকে অসংখ্য হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেন।

 

ইলমে হাদিস শিক্ষার উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইলমে হাদিস শিক্ষার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসরা, মক্কা, মদিনা প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। তিনি যখন বসরা ভ্রমণ করেন তখন সেখানে ইমাম হাসান বসরি, শুবা, কাতাদাহ প্রমুখ বড় বড় তাবেয়ি মুহাদ্দিসের প্রচারিত হাদিসের জ্ঞানে বসরা নগরী মুখরিত ছিল। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁদের কাছ থেকে ইলমে হাদিস শিক্ষা লাভ করে নিজেকে ধন্য করেন। তিনি যখন মক্কা ও মদিনা গমন করেন, তখন সেখানে হাদিসের চর্চা চলছিল ব্যাপকভাবে। সাহাবায়ে কেরামের সংস্পর্শে নিজেদের ধন্য করে অনেক বড় তাবেয়ি স্বতন্ত্রভাবে মক্কায় হাদিসচর্চার অসংখ্য কেন্দ্র স্থাপন করেন। আতা ইবন আবু রিবাহ ও ইকরিমা প্রমুখ তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ইমাম জাহবি ‘তাজকিরাতুল হুফফাজ’ গ্রন্থে ইমাম আজমের শিক্ষকদের নাম উল্লেখ করার সময় লিখেছেন, ‘ওয়া খালকুন কাসির’ অর্থাৎ এতদ্ব্যতীত আরো বিপুলসংখ্যক মুহাদ্দিস তাঁর শিক্ষক ছিলেন।

 

ইলমে হাদিসে বিশেষ অবদান

হাফেজ মুহাম্মদ ইউসুফ সালেহি শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) হাদিসের বড় বড় হাফেজ ও শীর্ষদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি যদি হাদিসের প্রতি খুব বেশি মনোযোগী না হতেন ও ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন না হতেন, তাহলে ফিকহের মাসআলা-মাসাইল বের করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো না। (তাবাকাতুল হুফফাজ, আল হাদিস ওয়াল মুহাদ্দিসুন, পৃষ্ঠা-২৮৪)

মুহাদ্দিস ইয়াহিয়া ইবনে মুঈনকে যখনই ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হতো, তখনই তিনি বলতেন তিনি নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত, ভুলভ্রান্তিমুক্ত। হাদিসের ব্যাপারে কেউ তাঁকে দুর্বল বা অগ্রহণযোগ্য বলেছেন বলে আমি শুনিনি। (উমদাতুল কারি, দ্বিতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা : ১২)

শায়খুল ইসলাম ইয়াজিদ ইবন হারুন (রহ.) বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অত্যন্ত মুত্তাকি, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন গুণসম্পন্ন সাধক, আলিম, সত্যবাদী ও সমসাময়িককালের সবার অপেক্ষা হাদিসের বড় হাফেজ ছিলেন। (মানাকেবে আবু হানিফা লি মুহাম্মদ জামিরি)

হাফেজ আবু নঈম ইসফাহানি (রহ.) বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফার কাছে একটি ঘরে উপস্থিত হলাম, যা কিতাবে পরিপূর্ণ ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কিসের কিতাব? প্রত্যুত্তরে বলেন, হাদিসের। (উকুদুল জাওয়াহিরিল হানিফা প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২৩)

ইয়াহিয়া ইবন মুঈন আরো বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) খুবই নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি নিজের মুখস্থ ও সংরক্ষিত হাদিসই বর্ণনা করতেন। যা তাঁর মুখস্থ নেই তা তিনি কখনো বর্ণনা করতেন না।

 

মাসআলার ব্যাপারে নীতি

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) হাদিস পরিত্যাগ করে শুধু কিয়াস ও বুদ্ধি প্রয়োগের সাহায্যেই মাসআলার রায় দিতেন বলে যে অভিযোগ করা হয় তা সর্বৈব মিথ্যা। মাসআলার রায় দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর নীতি প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেছেন, আমি প্রথমে আল্লাহর কিতাবকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করি, যখন তাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফায়সালা না পাই, তখন নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত রাসুলের সুন্নাত গ্রহণ করি। উভয়ে না পেলে সাহাবায়ে কিরামের কারো কথা গ্রহণ করি।

 

হাদিস বর্ণনা ও গ্রহণে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর শর্তাবলি

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সময় জাল ও মনগড়া রচিত হাদিসের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তাই তিনি হাদিস বর্ণনা ও গ্রহণে কড়া শর্ত আরোপ করেছেন—১. হাদিস বর্ণনা করার পর বর্ণনাকারী ভুলে গেলে তা গ্রহণ করা যাবে না। ২. ওই হাদিসই শুধু গ্রহণযোগ্য, যা বর্ণনাকারী স্বীয় স্মরণ ও স্মৃতিশক্তি অনুসারে বর্ণনা করেছেন। ৩. ওস্তাদের কাছ থেকে না শুনে বর্ণনা করা হাদিস তিনি গ্রহণ করতেন না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) স্বীয় শর্ত অনুযায়ী হাদিস কম পেয়েছেন বলে তিনি কম হাদিস বর্ণনা করেছেন। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর রচিত ছোট একটি কিতাব রয়েছে। তা হলো ‘মুসনাদে আবি হানিফা’।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে যাঁরা বৈরী মনোভাব পোষণ করেন, তাঁদের উচিত হবে তাঁর সম্পর্কে আরো পড়াশোনা করা।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা