kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

অমুসলিম আত্মীয়দের সঙ্গে নবীজির আচরণ

ইজাজুল হক   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অমুসলিম আত্মীয়দের সঙ্গে নবীজির আচরণ

পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক একটি সুখময় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)। সৌহার্দপূর্ণ মানবিক সমাজ বিনির্মাণে তিনি অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় এবং তাদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫৬)

তাই আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক।

আত্মীয় অমুসলিম হলেও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। তাদের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে তাদের প্রয়োজন পূরণে। আসমা (রা.) বলেন, ‘কুরাইশদের সঙ্গে সন্ধিকালে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এলেন। আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার কাছে আগ্রহ নিয়ে আমার মা এসেছেন। আমি কি মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তোমার মায়ের সঙ্গে তুমি সদ্ব্যবহার করো।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০০৩)

নবীজি নিজেও অমুসলিম আত্মীয়দের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করতেন। তাদের সম্মান করতেন। তাদের কাছে পাঠাতেন উপহার-উপঢৌকন। অমুসলিম আত্মীয়-স্বজন তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলেও তিনি তাদের প্রতি সদয় আচরণ করতেন। বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে উদারতা প্রদর্শন করতেন। ইসলামের সমরনীতি অনুসরণ করে সম্ভাব্য সব উপায়ে তাদের প্রতি কোমল আচরণ করতেন।

আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা ছিলেন রাসুল (সা.)-এর দুধমাতা। শৈশবে তিনি তাঁর কাছ থেকে দুধ পান করেন। তিনি মুসলমান হননি। কিন্তু নবীজি আজীবন তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন। তিনি প্রায়ই তাঁর কাছে কাপড়চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রী উপহার হিসেবে পাঠাতেন। (আসাহহুস সিয়ার, পৃষ্ঠা : ৬)

আওতাসের যুদ্ধে মুসলমানরা নবীজির দুধমাতা হালিমা সাদিয়ার বনু সাদ গোত্রের এক লোককে সপরিবারে বন্দি করেন। পরিবারের বৃদ্ধা নারী বলেন, আমি তোমাদের নবীর বোন। আমাকে গ্রেপ্তার করছ কেন? তা শুনে সাহাবারা তাঁকে রাসুলের কাছে নিয়ে এলেন। বৃদ্ধা স্বীয় পিঠ খুলে একটি দাগ দেখিয়ে বলেন, এই যে দেখুন, আপনি শৈশবে আমার পিঠে কামড় দিয়েছিলেন। আমি আপনার বোন। হালিমার কন্যা শায়মা। তাকে চিনতে পেরে নবীজি অশ্রু সংবরণ করতে পারলেন না। তাঁর সম্মানে স্বীয় চাদর বিছিয়ে দিলেন। উপহার-উপঢৌকন দিয়ে তাঁকে বললেন, আপনি চাইলে আমার বাড়িতে যেতে পারেন। আমি সম্মানের সঙ্গে আপনার খেদমত করব। চাইলে নিজ বাড়িতেও ফিরে যেতে পারেন। আপনাকে পৌঁছানোর ব্যবস্থা আমি করে দেব। তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে চাইলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে সম্মানের সঙ্গে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। (ইবনে কাসির, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৬৮৯)

বদরের যুদ্ধে বন্দিদের মধ্যে সবাই ছিল নবীজি ও সাহাবাদের আত্মীয়-স্বজন। সেকালে তো আর কারাগার ছিল না। নবীজি বন্দিদের সাহাবাদের মাঝে বণ্টন করে দেন। তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও মেহমানদারি করার আদেশ দেন। তখন মদিনায় চরম দুর্ভিক্ষ চললেও সাহাবারা বন্দিদের সেবা-যত্নের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা ইতিহাসে বিরল। মুসআব ইবনে উমাইরের ভাই আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমি যে সাহাবির ঘরে বন্দি ছিলাম, তারা আমাকে রুটি খেতে দিতেন এবং নিজেরা আহারাভাবে খেজুর খেতেন। আমি লজ্জিত হয়ে অনেক সময় খেজুর খাওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তারা রুটি খেতেন না। আমাকেই রুটি খেতে বাধ্য করতেন।’ (ইবনে কাসির, আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৭৫)

সুবহানাল্লাহ! শত্রুর মুখে এমন স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে, কেমন ছিল রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা ও আদর্শ। এমন আচরণে মুগ্ধ হয়েই মানুষ দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।

কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি আত্মীয়দের প্রতি স্বজনপ্রীতি করতেন। বরং তিনি তাদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণই করতেন। রাসুলের চাচা আব্বাস (রা.)-এর ঘটনা থেকেই আমরা বিষয়টি আঁচ করতে পারি। বদরের যুদ্ধে আব্বাসও বন্দি হলেন। তখনো তিনি মুসলমান হননি। যখন তাঁকে বন্দি করে আনা হলো তখন নবীজির মন মমতায় আর্দ্র হয়ে উঠল। রাতে আব্বাস বাঁধনের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তা দেখে নবীজির ঘুম হচ্ছিল না। তিনি অনেক বেশি অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগলেন। বিষয়টি এক সাহাবি বুঝতে পেরে আব্বাসের বাঁধন ঢিল করে দিলেন। কিন্তু আত্মীয়তার কারণে বিশেষ কারো শাস্তি হ্রাসের বিধান ইসলামে নেই। তাই নবীজি বলেন, সবার বাঁধন ঢিল করে দাও। (সিরাতুন নবী, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৩৩)

সাহাবারা আব্বাসের মুক্তিপণ ক্ষমা করার আবেদন করলে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমরা তার একটি দিরহামও ক্ষমা করবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৭২৩)

নবীজির জীবনে এমন বহু ঘটনা আছে, যাতে অমুসলিম আত্মীয়দের প্রতি তাঁর মুগ্ধকরা আচরণ প্রকাশ পেয়েছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তারা ইসলামও গ্রহণ করেছে দলে দলে। মক্কার সেকালের কাফির সর্দার আবু সুফইয়ান ছিলেন রাসুল (সা.)-এর শ্বশুর। পরম শত্রু হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে নবীজি সদাচার করতেন। সেই সদাচারের স্বীকৃতি তাঁর বক্তৃতা থেকেই পাওয়া যায়। সপ্তম হিজরিতে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবু সুফইয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুহাম্মদ তোমাদের কী শিক্ষা দেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি আমাদের শিক্ষা দেন—তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক কোরো না। মূর্তিপূজা করতে তিনি নিষেধ করেন। নামাজ পড়া, সত্য কথা বলা, চারিত্রিক নির্মলতা অর্জন এবং আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখার আদেশ দেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬)

আত্মীয়-স্বজন অন্যায়-অবিচার করলেও তিনি তাদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ভদ্রোচিত আচরণ করতেন। তিনি বলতেন, ‘আত্মীয়দের সঙ্গে প্রতিদানমূলক সদ্ব্যবহারকারী প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষকারী নয়। বরং সে-ই প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী, যে অন্যপক্ষ সম্পর্ক ছিন্ন করলেও আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৪৫২)

নবীজি (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ককে বেশ গুরুত্ব দিতেন। মুসলিম আত্মীয়দের প্রতি যেমন তিনি প্রসন্ন ছিলেন, অমুসলিম আত্মীয়দেরও তিনি পরম মমতায় সিক্ত করেন। তাই আসুন, আমরাও আত্মীয়তার বন্ধনকে সুদৃঢ় করে কল্যাণময় ও সৌহার্দপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা