kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিশ্বনবীর কাছে জিবরাইল (আ.)-এর চার প্রশ্ন

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম   

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্বনবীর কাছে জিবরাইল (আ.)-এর চার প্রশ্ন

জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের প্রধান। তিনি নবী-রাসুলদের কাছে অহি প্রেরণের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর উপাধি হলো, রুহুল আমিন তথা বিশ্বস্ত আত্মা। তিনি হলেন আকাশের আমিন। জমিনের আমিন হলেন বিশ্বনবী (সা.)। আকাশের আমিন জিবরাইল (আ.) জমিনের আমিনের কাছে ওহি নিয়ে আসতেন। কোনো কোনো সময় সবার অলক্ষ্যে ওহি নাজিল করে চলে যেতেন। আবার কোনো কোনো সময় মানব আকৃতিতে আগমন করতেন। তিনি প্রায় সময় দাহিয়াতুল কালবি (রা.)-এর আকৃতি ধারণ করে আসতেন। ফেরেশতা কুকুর ও শূকর ছাড়া যেকোনো আকৃতি ধারণ করতে পারেন। একবার জিবরাইল (আ.) ধবধবে সাদা পোশাকে এবং নিকষ কালো কেশবিশিষ্ট অবস্থায় ছদ্মবেশে মহানবী (সা.)-এর দরবারে এসে হাজির হন। হাদিস বিশারদদের মতে, দশম হিজরিতে বিদায় হজের কিছুকাল আগে জিবরাইল (আ.) সাহাবায়ে কেরামদের দ্বিন শিক্ষা দেওয়ার জন্য এসেছিলেন। তাঁর মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়নি। মহানবী (সা.) তখন সাহাবায়ে কেরাম দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। ওমর (রা.) বলেন, আমাদের কেউ তাঁকে চিনতে পারেনি। কোনো কোনো হাদিস বিশারদের মতে প্রথমে মহানবী (সা.)ও চিনতে পারেননি। অবশেষে লোকটি মহানবী (সা.)-এর সামনে এসে এবং স্বীয় হাঁটুদ্বয় মহানবী (সা.)-এর পবিত্র হাঁটুদ্বয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বসে পড়েন। অতঃপর স্বীয় হস্তদ্বয় তাঁর পবিত্র ঊরুদ্বয়ের ওপর রাখেন। সাহাবায়ে কেরাম অবাক হয়ে তাঁর কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। লোকটি মহানবী (সা.)-কে চারটি বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তা হলো, ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামতের সময়।

প্রথম প্রশ্ন : লোকটি প্রথমে প্রশ্ন করেন, হে মুহাম্মদ (সা.)! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ইসলাম হচ্ছে ১. তোমার এ সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। ২. নামাজ কায়েম করা, ৩. জাকাত প্রদান করা, ৪. রমজানের রোজা রাখা এবং ৫. পথ খরচের সামর্থ্য থাকলে হজব্রত পালন করা। মহানবী (সা.)-এর কথা শ্রবণ করার পর লোকটি বলেন, আপনি সত্যিই বলেছেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম লোকটির কথা শুনে অবাক হলেন। কারণ তিনি নিজে প্রশ্ন করছেন আবার সত্যায়নও করছেন। কিন্তু তাঁরা কোনো কথা বলেননি।

দ্বিতীয় প্রশ্ন : লোকটি আবার প্রশ্ন করলেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ঈমান হলো—১. আল্লাহ তাআলা, ২. তাঁর ফেরেশতাকুল, ৩. আসমানি কিতাবগুলো, ৪. রাসুলগণ, ৫. পরকাল এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। লোকটি এবারও বলেন, আপনি সত্যিই বলেছেন। সাহাবায়ে কেরাম আগের মতো এবারও আশ্চর্য বোধ করলেন।

তৃতীয় প্রশ্ন : লোকটি আবার প্রশ্ন করলেন, আমাকে ইহসান সম্পর্কে অবহিত করুন। মহানবী (সা.) জবাবে বলেন, ইহসান হলো, মহান আল্লাহর এমনভাবে ইবাদত করা, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তাহলে মনে করবে, তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।

চতুর্থ প্রশ্ন : এরপর লোকটি চতুর্থ প্রশ্ন করলেন, আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন। প্রত্যুত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, জিজ্ঞাসাকারী থেকে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি অধিক জ্ঞাত নয়। অর্থাৎ আপনার চেয়ে আমি এ প্রসঙ্গে অধিক অবগত নই। প্রশ্নকারী বলেন, তাহলে আমাকে কিয়ামতের কিছু নিদর্শন বলে দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামতের নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো—১. দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে অর্থাৎ দাসী তার মনিবের সন্তান জন্ম দেবে এবং পরবর্তী সময়ে সে সন্তানটিই তার মনিবের স্থলাভিষিক্ত হবে। ২. আরেকটি নিদর্শন হলো, তুমি দেখতে পাবে যে যাদের পায়ে জুতা ও গায়ে জামা নেই, যারা শূন্য হাতে একসময় জীবনযাপন করত এবং মেষ চরাত তারাই পরবর্তী সময়ে বড় বড় প্রাসাদ গড়ে তুলবে এবং এসব কাজে প্রতিযোগিতা করবে। এসব প্রশ্ন করে লোকটি চলে গেলেন। ওমর ফারুক (রা.) বলেন, আমরা কিছু সময় নীরব বসে রইলাম। অতঃপর মহানবী (সা.) আমাকে লক্ষ্য করে বলেন, হে ওমর! আগন্তুক এ প্রশ্নকারীকে কি তুমি চিনতে পেরেছ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-ই বেশি জ্ঞাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তিনি হলেন, জিবরাইল (আ.)। তিনি দ্বিন শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে তোমাদের কাছে এসেছিলেন। অন্য বর্ণনামতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের আরেকটি নিদর্শন হলো, নগ্নপদ, নগ্নদেহ বিশিষ্ট, মূক ও বধিরদের তোমরা পৃথিবীর শাসক হিসেবে দেখতে পাবে। অতঃপর মহানবী (সা.) সুরা লুকমানের সর্বশেষ আয়াত পাঠ করে বলেন, পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। ১. কিয়ামত কখন হবে, ২. কখন বৃষ্টি হবে, ৩. গর্ভাশয়ে সন্তান কী অবস্থায় আছে, ৪. আগামীকাল কী উপার্জন করবে, ৫. কোন জায়গায় সে মৃত্যুবরণ করবে। উল্লিখিত বর্ণনাটি হাদিসে জিবরাইল হিসেবে পরিচিত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮, আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৯৫)

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া

কামিল মাদরাসা, ফেনী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা