kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিধন্য আট মসজিদ

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিধন্য আট মসজিদ

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করায় সেখানে ইসলামী সমাজের ক্রমবিকাশ ঘটে। ইসলামী সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মদিনা এবং এর উপকণ্ঠে প্রতিষ্ঠিত হয় বেশ কিছু মসজিদ। এর কোনোটি তিনি নিজে প্রতিষ্ঠা করেছেন আর কোনোটি তাঁর স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে পরবর্তী সময়ে নির্মাণ করা হয়। মদিনার বাইরে মসজিদে হারাম ও  মসজিদে আকসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহানবী (সা.)-এর স্মৃতি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্মৃতিধন্য আট মসজিদ নিয়ে লিখেছেন আতাউর রহমান খসরু

 

মসজিদুল হারাম

যার প্রাঙ্গণে বেড়ে ওঠেন মহানবী (সা.)

কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত ইতিহাস থেকে অনুমিত হয় মহানবী (সা.)-এর ঊর্ধ্বতন পুরুষ ইবরাহিম (আ.) তাঁর ছেলে ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে সর্বপ্রথম কাবাঘর নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে ইসমাইল (আ.)-কে তিনি এই ঘরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মক্কায় রেখে যান। ইসমাইল (আ.)-এর বংশধররাই ধারাবাহিকভাবে সে দায়িত্ব পালন করে যান। তবে একদলের দাবি, আদম (আ.) পৃথিবীতে আগমনেরও আগে ফেরেশতারা এই ঘর নির্মাণ করেন। আদম (আ.) কাবাঘরের পুনর্নির্মাণ করেন। আবার কেউ বলেন, ফেরেশতাদের সহযোগিতায় আদম (আ.)-ই প্রথম কাবাঘর নির্মাণ করেন। যা হজরত নুহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবন পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর হজরত ইবরাহিম (আ.) তার পুনর্নির্মাণ করেন।

আসহাবে ফিলের ঘটনার পর কাবা পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিলে কোরাইশরা তা করেন। এর ৩০ বছর পর কাবাঘরে ভয়াবহ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে কাবাঘরের অবকাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। কিছুদিন পর প্রচণ্ড বর্ষণে কাবাঘরের অবকাঠামো আরো নড়বড়ে হয়ে যায়। এ সময় আবারও কাবাঘরের পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হয়। তবে বৈধ উপার্জনের অর্থে ব্যয় সংকুলান না হওয়ায় হাজরে আসওয়াদের দিকে তিন মিটার দেয়াল নির্মাণের কাজ বাকি থেকে যায়। এ ছাড়া তাঁদের নির্মাণে কাবার অবকাঠামোগত আরো কিছু পরিবর্তন আসে।

৬৪ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা.) মক্কায় খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার পর ইবরাহিম (আ.)-এর অবকাঠামো অনুযায়ী কাবার পুনর্নির্মাণ করেন, কোরাইশরা অর্থাভাবে যা করতে পারেনি। ৭৩ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা.)-কে ক্ষমতাচ্যুত করার পর খলিফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ান কাবাকে কোরাইশের অবকাঠামোয় ফিরিয়ে আনেন।

৯১ হিজরিতে প্রবল বন্যায় বায়তুল্লাহর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেক তা সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। ওয়ালিদ মসজিদ সংস্কারে আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করেন। উসমানীয় শাসক সুলতান প্রথম আহমদের সময় কাবার দেয়ালে ফাটল দেখা দিলে তিনি তা ভেঙে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু আলেমরা তা না করার পরামর্শ দেন। আলেমদের আপত্তির কারণে সুলতান আহমদ দেয়াল না ভেঙে ফাটলের জায়গাগুলোর ওপর স্বর্ণের প্রলেপ দেন। কিন্তু কয়েক বছর (১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে) পর প্রচণ্ড বন্যায় দেয়াল ধসে যায়। কাবাঘরের দুই দিকের দেয়াল, দরজা ও ছাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা পুনর্নির্মাণ আবশ্যক হয়ে পড়ে। তত্কালীন শাসক সুলতান মুরাদ দ্রুততম সময়ে তা পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। এটাই কাবাঘরের শেষ নির্মাণকাজ। তবে এরপর একাধিকবার কাবাঘরের সংস্কারকাজ হয়েছে। তার মধ্যে ১২৩৯ হিজরিতে মিসরের গভর্নর মুহাম্মদ আলী পাশা এবং ১৪১৭ হিজরিতে (১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে) সৌদি রাজপরিবার কাবাঘরের বড় ধরনের সংস্কারকাজ করে।

 

মসজিদে নববী

রাসুল (সা.)-এর সব কাজের প্রাণকেন্দ্র ছিল যা

রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার। মহানবী (সা.)-এর সার্বিক তত্ত্বাবধান ও অংশগ্রহণে ঐতিহাসিক এই মসজিদ গড়ে ওঠে। সাহাবিদের দ্বিন শেখানো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ তিনি মসজিদে নববীতে বসেই আঞ্জাম দিতেন। সাহাবিরা এখানেই তাঁর কাছে কোরআন শিখতেন আবার এর প্রাঙ্গণে হতো যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতিসভা। মদিনায় হিজরত করার পর কুবা এলাকায় যাত্রাবিরতি দেন রাসুলে আকরাম (সা.)। সেখানে চার দিন অবস্থানকালে একটি মসজিদও নির্মাণ করেন। কুবা থেকে বিদায় নিয়ে তিনি বর্তমান মসজিদে নববীর এলাকায় এসে স্থায়ী হন এবং মসজিদ নির্মাণ করেন। তত্কালীন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই মসজিদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর খোলাফায়ে রাশেদার যুগ পর্যন্ত মসজিদে নববীই ছিল ইসলামী খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকে মুসলিম বিশ্ব পরিচালিত হতো।

রাসুলে আকরাম (সা.)-এর হাতে মসজিদে নববীর প্রতিষ্ঠা হলেও যুগে যুগে বহু সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে এই মসজিদের। ফলে প্রতিষ্ঠাকালীন আয়তন এক হাজার ৫০ স্কয়ার মিটার থেকে বেড়ে বর্তমানে দুই লাখ ৩৫ হাজার স্কয়ার মিটারে দাঁড়িয়েছে। সপ্তম হিজরিতে মসজিদে নববীর প্রথম সম্প্রসারণ রাসুল (সা.)-ই করেন। তখন আয়তন বেড়ে হয় দুই হাজার ৪৭৫ স্কয়ার মিটার। এরপর ওমর বিন খাত্তাব (রা.) (১৭ হিজরি) থেকে শুরু করে বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (১৪১৪ হিজরি) পর্যন্ত মোট আটবার মসজিদে নববীর সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে। ৯১ হিজরিতে ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের নির্দেশে মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ করেন। এ সময় হজরত আয়েশা (রা.)-এর কক্ষটি মসজিদে নববীর অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তার ওপর নয়নাভিরাম সবুজ গম্বুজ স্থাপন করেন। ১৯০৯ সালে এই মসজিদের মাধ্যমেই আরব উপদ্বীপের বিদ্যুতায়ন শুরু হয়। বাদশাহ ফাহাদের যুগেই মসজিদে নববীর আধুনিকায়নের কাজ হয়। ১৪০৪ হিজরি (১৯৮৫ খ্রি.) থেকে ১৪১৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছরের সংস্কার ও সম্প্রসারণে তা নতুন অবকাঠামো লাভ করে। এতে মসজিদের আয়তন বৃদ্ধি পায় ৮২ হাজার মিটার। যাতে প্রায় সাত লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারত। বাদশাহ ফাহাদ মসজিদে নববীতে নারীদের নামাজ আদায়ের জায়গা তৈরি করেন। এ ছাড়া মসজিদের বাইরের নিরাপত্তা দেয়াল, মসজিদ প্রাঙ্গণের ছাতা, ইলেকট্রিক গম্বুজ, আধুনিক অজুখানা, নতুন মিনার, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, আধুনিক পাঠাগার ইত্যাদি সংযুক্ত হয়। বর্তমানে মসজিদে নববীতে ১০টি সুউচ্চ মিনার ও প্রায় ২০০টি ছোট-বড় গম্বুজ রয়েছে। তবে এই মসজিদের মূল আকর্ষণ মহানবী (সা.)-এর রওজায়ে আতাহ্র, তার মিম্বর, কক্ষ, সবুজ গম্বুজ ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি।

 

মসজিদুল আকসা

যেখানে নবীদের নামাজের ইমামতি করেন মুহাম্মদ (সা.)

মুসলিমদের কাছে মর্যাদার তৃতীয় স্থানে রয়েছে মসজিদুল আকসা। মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর পর যার স্থান। পবিত্র ভূমি জেরুজালেমে অবস্থিত পৃথিবীর প্রাচীনতম মসজিদটির সঙ্গে বহু নবী-রাসুলের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানরা প্রায় ১৬ মাস মসজিদুল আকসার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করেন। পরবর্তী সময়ে মসজিদুল হারামকে মুসলিম উম্মাহর জন্য কেবলা হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। মহানবী (সা.) মেরাজের রাতে এই মসজিদ প্রাঙ্গণেই সব নবী-রাসুল ও ফেরেশতাদের নামাজের ইমামতি করেন। পবিত্র কোরআনে সেই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘পবিত্র সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রি ভ্রমণ করিয়েছেন। যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি। যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ১)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘...নবী (সা.) মসজিদে আকসায় প্রবেশ করে নামাজ আদায়ের জন্য দাঁড়ান। অতঃপর তিনি তাঁর দুই পাশে তাকিয়ে দেখেন সব নবী তাঁর সঙ্গে নামাজে দাঁড়িয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৩২৪)

মসজিদুল আকসার প্রথম নির্মাতা ও নির্মাণকাল নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। তবে অধিকতর সঠিক মত হলো, আদম (আ.) মসজিদুল আকসার প্রথম নির্মাতা। ইবরাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে তা আবাদ হয় এবং সোলায়মান (আ.) তার পুনর্নির্মাণ করেন। তবে হজরত আবুজর (রা.)-এর বর্ণিত একটি হাদিস থেকে ধারণা, মসজিদুল আকসার নির্মাণ ইবরাহিম (আ.)-এর মাধ্যমেই হয়েছিল। আবুজর (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! পৃথিবীতে প্রথম নির্মিত মসজিদ কোনটি? তিনি বলেন, মসজিদুল হারাম। আমি জানতে চাইলাম, তারপর? তিনি বললেন, মসজিদুল আকসা। আমি আবার বললাম, উভয় মসজিদ নির্মাণে সময়ের ব্যবধান কত? তিনি বললেন, ৪০ বছর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫১২)

প্রতিষ্ঠার পর অসংখ্যবার মসজিদুল আকসার সংস্কার হয়েছে। আবার ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষতবিক্ষতও হয়েছে ঐতিহাসিক এই মসজিদটি।

হজরত আউফ ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাবুক যুদ্ধের সময় বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের সুসংবাদ দেন। ১৫ হিজরি মোতাবেক ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম বাহিনী বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয় করে। আবু উবায়দাহ আমের ইবনুল জাররাহ (রা.) এই বিজয়ের নেতৃত্ব দেন। কোনো সংঘাত ও রক্তপাত ছাড়াই তা অর্জিত হয়। উমাইয়া, আব্বাসি ও সেলযুক শাসনামলে বায়তুল মোকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনের ওপর মুসলিম আধিপত্য অক্ষুণ্ন থাকে। ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের হাতে ফিলিস্তিনের পতন হয় এবং তারা সাত দশক বায়তুল মোকাদ্দাস দখল করে রাখে। ক্রুসেডাররা বায়তুল মোকাদ্দাস দখলের পর ১০ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়। ২৫ রমজান ৫৮৩ হিজরি মোতাবেক ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে মিসরের ফাতেমি শাসক সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করেন।

সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবির মৃত্যুর পর বায়তুল মোকাদ্দাস আবারও মুসলিমদের হাতছাড়া হয়। তবে ১১ বছর পর সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুব ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দে তা পুনরুদ্ধার করেন। ১২৪৪ সাল থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দাস মুসলিম শাসকদের অধীনেই থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের উসমানীয় সম্রাজ্য পরাজিত হলে ১৯১৭ সালে বায়তুল মোকাদ্দাস ব্রিটিশদের শাসনাধীন হয়। তারাই বেলফোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে পবিত্র ভূমিকে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়।

 

মসজিদে কুবা

যে মসজিদের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নির্মিত মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমনের পর এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। পবিত্র কোরআনে এই মসজিদ ও তার মুসল্লিদের প্রশংসা করা হয়েছে। বর্তমানে মসজিদে কুবা মদিনার দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। কুবা মূলত একটি প্রাচীন কূপের নাম। কূপের নামানুসারে পরবর্তী সময়ে এলাকার নামকরণ হয়। মহানবী (সা.) মদিনায় আগমনের পর কুবা নামক স্থানে অবতরণ করেন। তিনি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর ঘরে অবস্থান করেন। তখন এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। মদিনার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এই মসজিদের নির্মাণকাজে স্বয়ং নবী করিম (সা.) অংশগ্রহণ করেন। মসজিদ নির্মাণে প্রথম পাথরটি তিনিই রাখেন। নির্মাণকাজ শেষ হলে তিনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেন এবং কুবাবাসীর প্রশংসা করেন। নবনির্মিত মসজিদে প্রথম নামাজ তিনিই আদায় করেন।

মসজিদে নববীর পাশে স্থায়ী আবাস গড়লেও মহানবী (সা.) প্রতি সপ্তাহের শনিবার মসজিদে কুবায় আসতেন।

কোরআনে মসজিদে কুবার প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘যে মসজিদ প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত সেখানে অবস্থান করা আপনার জন্য অধিক সংগত। সেখানে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা পবিত্রতা পছন্দ করে। আর আল্লাহ পবিত্র ব্যক্তিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : তওবা, আয়াত : ১০৮)

প্রতিষ্ঠার পর উসমান বিন আফফান (রা.), ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.), উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ও তাঁর ছেলে প্রথম আবদুল মাজিদ প্রমুখ শাসকরা মসজিদে কুবার সংস্কারকাজ করেন। বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ আলে সৌদের সময় সর্বশেষ সম্প্রসারণ হয়। ১৪০৫ হিজরিতে শুরু হওয়া সংস্কারকাজ শেষ হয় ১৪০৭ হিজরিতে। যাতে মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৫০০ স্কয়ার মিটার। মসজিদে কুবায় বর্তমানে ২০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে।

 

মসজিদে ইজাবা

যেখানে উম্মতের জন্য কেঁদেছিলেন মহানবী (সা.)

মহানবী (সা.)-এর সময়ে মসজিদে নববীর অদূরে প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদে ইজাবা। সম্প্রসারণের পর মসজিদে নববীর বর্তমান অবস্থান থেকে মাত্র ৫৮০ মিটার দূরে এবং মদিনার বিখ্যাত কবরস্থান বাকি থেকে ৩৮৫ মিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী বনু মুয়াবিয়া গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদের নির্মাণকাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই শেষ হয়েছিল। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় যার প্রমাণ পাওয়া যায়। যাতে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন আলিয়া নামক স্থান থেকে ফিরছিলেন। তিনি যখন মসজিদের কাছে পৌঁছালেন তখন তিনি তাতে প্রবেশ করেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। দীর্ঘ সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। সাহাবায়ে কেরামও তাঁর সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। তিনি উম্মতের জন্য মোট তিনটি দোয়া করেন। যার দুটি কবুল হয়। (হাদিস : ৭২৬০)

হজরত ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) তাঁর শাসনামলে এই মসজিদের সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন। পরবর্তী সময়ে বনু মুয়াবিয়া গ্রামটি পরিত্যক্ত হওয়ায় মসজিদটিও পরিত্যক্ত হয়। ধারণা করা হয়, ষষ্ঠ হিজরি শতক পর্যন্ত মসজিদে নামাজ হতো। সপ্তম হিজরি শতকের ঐতিহাসিক ইবনুন-নাজ্জার মসজিদের একাংশ বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখতে পান, একই অবস্থা বর্ণিত হয়েছে চতুর্দশ হিজরি শতকের ইতিহাসে। এ সময়ের লেখক আবদুল কুদ্দুস আনসারি মসজিদে বনু মুয়াবিয়ার স্থানে কয়েকটি পাথরের স্তম্ভ ও মেহরাব দেখতে পান উল্লেখ করেছেন।

১৪১৮ হিজরি মোতাবেক ১৯৯৭ সালে বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ মসজিদে ইজাবা পুনর্নির্মাণ করেন। সম্প্রসারিত মসজিদের বর্তমান আয়তন এক হাজার স্কয়ার মিটার। পাশে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য ১০০ স্কয়ার মিটারের পৃথক কক্ষও নির্মাণ করেন তিনি।

 

মসজিদে আহজাব

বিজয়ের সুসংবাদ এসেছিল যেখানে

মসজিদে আহজাবকে মসজিদে ফাতাহও বলা হয়। মহানবী (সা.) এই স্থানে আল্লাহর পক্ষ থেকে খন্দকের যুদ্ধের বিজয়ের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। পঞ্চম হিজরিতে মক্কার কোরাইশদের নেতৃত্বে আরবের বিভিন্ন গোত্র সদ্য প্রতিষ্ঠিত মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। তখন মহানবী (সা.) মদিনা নগরীর বাইরে পরিখা খনন করে সম্মিলিত বাহিনীর হামলা প্রতিহত করেন। ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধ আহজাব (গোত্রগুলো) ও খন্দক (পরিখা) নামে পরিচিত। সেই হিসাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদকে মসজিদে আহজাব বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এই মসজিদের অস্তিত্ব ছিল না। হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) সিলাআ পর্বতের ওপরের এই স্থানটি চিহ্নিত করে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী সাইফুদ্দিন বিন আবুল হিজা, উসমানীয় সুলতান প্রথম আবদুল মজিদ ও বাদশাহ ফাহাদ মসজিদে আহজাবের সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন।

ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) খন্দকের যুদ্ধের সময় পাহাড়ের ওপর অবস্থান গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি নামাজ আদায় করতেন এবং মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের জন্য নিয়মিত দোয়া করতেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই নবী (সা.) মসজিদুল ফাতাহতে তিন দিন দোয়া করেন। সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার। বুধবার দুই নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া কবুল করা হয়। তাঁর চেহারায় সুসংবাদের বিষয়টি ফুটে ওঠে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৪১৫৩)

 

মসজিদে জুমা

মদিনার যে স্থানে প্রথম জুমা আদায় করেন রাসুল (সা.)

মদিনায় হিজরত করার পর মহানবী (সা.) যে স্থানে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন সেখানেই স্থাপিত মসজিদে জুমা। রাসুল (সা.)-এর জুমা আদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে। তবে তাকে মসজিদে ওয়াদি, মসজিদে আতিকা, মসজিদে কুবাইবও বলা হয়। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে, রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর কুবায় আবু আইয়ুব আনসারি (রহ.)-এর বাড়িতে অবস্থান করেন। সেখান থেকে ১৬ রবিউল আউয়াল জুমার দিন তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথে বনু সালেম ইবনে আউফের বসতিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে জুমার নামাজের সময় হয়ে যায়। ফলে তিনি সেখানে যাত্রাবিরতি করেন এবং জুমার নামাজ আদায় করেন। হিজরতের পর এটাই ছিল প্রথম জুমা।

রাসুলে আকরাম (সা.) যে স্থানে জুমার নামাজ আদায় করেন সেখানে পরবর্তী সময়ে মসজিদ নির্মাণ করা হয় এবং তার নাম রাখা হয় মসজিদে জুমা। মসজিদটি ঠিক কার সময় নির্মিত হয় তা জানা যায় না। তবে উমাইয়া খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) পাথরের অবকাঠামোতে নির্মিত মসজিদের সংস্কার করেন। নবম হিজরিতে শামসুদ্দিন কাবিন ও উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় বায়জিদ মসজিদে জুমার সংস্কার করেন। সর্বশেষ বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ এই মসজিদের পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করেন।

১৪০৯ হিজরিতে বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ পুরনো অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে তা নির্মাণের নির্দেশ দেন। সম্প্রসারণের পর মসজিদের ধারণ ক্ষমতা ৭০ থেকে ৬৫০ জনে উন্নীত হয়। নতুন নির্মাণে মসজিদের সুউচ্চ মিনার ও ছোট-বড় মোট পাঁচটি গম্বুজ রাখা হয়েছে।

 

মসজিদে কিবলাতাইন

কিবলা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক সাক্ষী

ইসলাম ধর্মের অনুসারী পবিত্র কাবার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করে। ইসলামের সূচনাকালেও মুসলিমরা কাবার দিকে ফিরেই নামাজ আদায় করতেন। তবে মধ্যবর্তী কয়েক মাস (১৬-১৭ মাস) আল্লাহ তাআলা মসজিদুল আকসার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করার নির্দেশ দেন। কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ যখন আসে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে বনু সালামায় জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন। দুই রাকাত আদায় করার পর কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আসে। নামাজের ভেতরই রাসুল (সা.) বায়তুল্লাহর দিকে ফিরে যান। অবশিষ্ট দুই রাকাত নামাজ সেদিকে ফিরেই আদায় করেন। যেহেতু চার রাকাত নামাজ তিনি দুই কিবলার দিকে ফিরে আদায় করেছিলেন তাই এই মসজিদের নাম হয়ে যায় মসজিদে কিবলাতাইন বা দুই কিবলাধারী মসজিদ। ঐতিহাসিক সেই ঘটনার বিবরণ বিভিন্ন হাদিসের কিতাবেও এসেছে।

মসজিদে কিবলাতাইন মদিনা নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকণ্ঠে অবস্থিত। মসজিদে নববী থেকে এর দূরত্ব চার কিলোমিটার। দ্বিতীয় হিজরিতে সাওয়াদ বিন গানাম গোত্রের লোকেরা মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণকাজে তারা কাঁচা ইট, পাথর, খেজুরগাছের পাতা ও ডাল ব্যবহার করেছিল। পরবর্তী সময়ে খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.), শাহিন সুজা জামালি, উসমানীয় সুলতান সোলায়মান, বাদশাহ আবদুল আজিজ ও ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ মসজিদে কিবলাতাইনের সংস্কার করেন। বাদশাহ আবদুল আজিজ মসজিদের পুরনো অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করেন। ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ তার আধুনিকায়ন করেন। বর্তমানে মসজিদে কিবলাতাইনের আয়তন তিন হাজার ৯২০ স্কয়ার মিটার। মসজিদে রয়েছে দুটি গম্বুজ। যার একটির আয়তন আট মিটার এবং অন্যটির আয়তন সাত মিটার। উভয় গম্বুজের উচ্চতা প্রায় ১৭ মিটার। কিবলা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে এখনো মসজিদের দুটি মেহরাব ও আজানের স্থান (মিনার) রাখা হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা