kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

মৃত্যু ধনী-গরিবের পার্থক্য বোঝে না

ইসলামী জীবন ডেস্ক   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মৃত্যু ধনী-গরিবের পার্থক্য বোঝে না

মৃত্যু কখনো ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, রাজা-প্রজা ও মনিব-ভৃত্যের মাঝে পার্থক্য করে না।

বাদশাহ হারুনুর রশিদের বিশাল রাজত্ব ছিল। ছিল বিপুল সৈন্য-সামন্ত। যিনি আকাশের দিকে মুখ তুলে মেঘকে সম্বোধন করে বলতেন, তুমি বৃষ্টি বর্ষণ করো হিন্দুস্তানে কিংবা চীনে অথবা যেখানে খুশি সেখানে। কসম খোদার! তুমি যেখানেই বৃষ্টি বর্ষণ করো না কেন, তা-ই আমার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

এই হারুনুর রশিদ একবার শিকারে বের হয়েছেন। পথে দরবেশ বাহলুলের সঙ্গে দেখা। হারুনুর রশিদ তাঁকে বলেন, হে বাহলুল! আমাকে উপদেশ দাও। বাহলুল বলেন, হে আমিরুল মুমিনিন! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে আপনার পিতা পর্যন্ত আপনার পিতৃপুরুষরা এখন কোথায় আছেন?

হারুনুর রশিদ বলেন, তাঁরা সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁদের রাজপ্রাসাদ এখন কোথায়?

ওইতো তাঁদের রাজপ্রাসাদ। তাঁদের কবরগুলো কোথায়? এগুলো তাঁদের কবর।

বলুন তো তাঁদের প্রাসাদ ও তাঁদের কবরে কী কাজে এসেছে?

হারুনুর রশিদ বলেন, আপনি সত্য বলেছেন। আরো কিছু উপদেশ দিন।

বাহলুল বলেন, দুনিয়ায় আপনার প্রাসাদ তো অনেক প্রশস্ত। কিন্তু হায়! মৃত্যুর পর আপনার কবরও যদি এমন প্রশস্ত হতো!

হারুনুর রশিদ কেঁদে ফেলেন। বলেন, আরো কিছু বলুন।

বাহলুল বলেন, হে আমিরুল মুমিনিন! মেনে নিলাম আপনি কেসরার ধনভাণ্ডারের অধিকারী। কিন্তু তারপর কী হবে? মৃত্যু কি প্রত্যেক প্রাণীর শেষ পরিণতি নয়? প্রতিটি নিয়ামত সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করা হবে।

হারুনুর রশিদ বলেন, অবশ্যই। এরপর হারুনুর রশিদ প্রাসাদে ফিরে এলেন এবং অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী হন। কয়েক দিন যেতে না যেতেই মৃত্যু এসে তাঁর দরজায় কড়া নাড়ে। শুরু হয়ে যায় মৃত্যুযন্ত্রণা। তখন তিনি তাঁর দেহরক্ষী ও সেনাপ্রধানদের ডেকে নির্দেশ দেন যে তোমরা আমার সমস্ত সেনাবাহিনীকে একত্র করো।

সেনাবাহিনীর সবাই বর্ম পরে তরবারি হাতে রণসাজে সজ্জিত হয়ে উপস্থিত হয়েছে। সংখ্যায় তারা ছিল অগণিত। সবাই তাঁর হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। তিনি যখন তাদের দেখলেন, কেঁদে ফেলেন। কেঁদে কেঁদে বলেন, হে সেই সত্তা! যার রাজত্ব অবিনশ্বর! আপনি দয়া করুন তার প্রতি, যার রাজত্ব নশ্বর। এরপর কাঁদতে কাঁদতে একসময় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

মৃত্যুর পর এই খলিফাকে—যিনি পৃথিবীর বিশাল ভুখণ্ডের রাজত্ব করেছেন, একটি সংকীর্ণ কবরে রেখে আসা হয়েছে। যেখানে না আছে উজির আর না আছে সভা ও সভাসদ। তাঁর সঙ্গে দেওয়া হয়নি কোনো খাদ্য-রসদ। বিছিয়ে দেওয়া হয়নি কোনো বিছানা। তাঁর রাজত্ব ও ধনসম্পদও কোনো কাজে আসেনি।

খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের যখন মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন যন্ত্রণায় তিনি ন্যুব্জ হয়ে যান। অস্থিরতা বেড়ে গেলে তিনি কামরার জানালা খুলে দিতে বলেন। জানালা খুলে দেওয়া হয়। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকান। দেখতে পান, এক ধোপা তার দোকানে কাপড় ধুয়ে শুকানোর জন্য দেয়ালে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তখন আবদুল মালিক কাঁদতে শুরু করেন। তিনি বলতে লাগলেন, হায়রে আমি যদি ধোপা হতাম! হায়রে যদি কাঠমিস্ত্রি হতাম! হায়রে আমি যদি কুলি হতাম! হায়রে আমি যদি মুমিনদের দায়িত্বশীল না হতাম! এরপর আবদুল মালিক মারা যান।

মৃত্যু এমনই। মৃত্যু ধনী ও গরিবের পার্থক্য বোঝে না।

(ড. আবদুর রহমান আল-আরেফির লেখা ‘হাদিকাতুল মাউত’ থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা