kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

বাংলা সাহিত্যে নবিপ্রেম

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলা সাহিত্যে নবিপ্রেম

অনাচার-অসত্যের অন্ধকার অবসানে প্রিয় নবী (সা.)-এর শুভাগমন চিরন্তন এক মহাসত্যের অভ্যুদয়। প্রিয় নবী (সা.)-এর জন্মগ্রহণে বিশ্বে জাগে আনন্দের ফল্গুধারা।

বহতা নদীর মতোই বাংলা ভাষা তার নিজস্ব ছন্দ ও রূপবৈচিত্র্যে এগিয়েছে পরিবর্তনের আবহে। কালানুক্রমিক এই জয়যাত্রায় বেড়েছে কলেবর এবং হাজারো অভিনবত্বে বাংলা ও বাঙালির প্রাণের উচ্চারণ আধুনিকতার চরমে পৌঁছে বর্তমানে শোনাচ্ছে সম্ভাবনার অমিয় সাগরসঙ্গমের বিস্ময় বারতা। এই ধারায় প্রিয় নবী (সা.)-এর অবস্থান যেমন গৌরবের, তেমনি সুদৃঢ়।

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জয়যাত্রাকে হাজার বছরের পুরনো বিবরণীতে জান্নাতি অনুগ্রহতুল্য বলা চলে। বৌদ্ধকবি রামাই পণ্ডিত তাঁর (১০০০-১০২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত) ‘কলিমা জাল্লাল’-এ নবিবন্দনা গেয়েছেন : ‘ব্রহ্মা হৈল মুহাম্মদ বিষ্ণু হৈল পেকাম্বর (পয়গাম্বর)/আদম্ব হৈলা মূল পানি/গণেশ হৈলা গাজী কার্তিকা হৈলা/কাজী ফকির হৈলা যথা মুনি...।’

একজন বৌদ্ধ পণ্ডিতের বর্ণনায় আমাদের নবী হয়ে গেলেন সর্বোচ্চ সম্মানের পাত্র; যদিও কার্তিক, গণেশ, বিষ্ণু ইসলামী মূল্যবোধে গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বিস্তরণে আমরা দেখি, মধ্যযুগে মুসলিম শাসকদের আন্তরিক পরিচর্যায় নবী (সা.)-এর প্রশস্তিধারা পৌঁছেছে অনন্য উচ্চতায়। ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে, ১৩৮৯ থেকে ১৪১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত শাহ্ মুহাম্মদ ছগিরের ইউসুপ-জোলায়খায় (ইউসুফ-জুলেখা) প্রিয় নবী (সা.)-এর উজ্জ্বলতম অবস্থান জানান দেয় : ‘জীবাত্মার পরমাত্মা মুহাম্মদ নাম/প্রথম প্রকাশ তথি হৈল অনুপাম।/...এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীকুল/মুহাম্মদ তার মধ্যে প্রধান আদ্যমূল।’

রণকুশলী মুহাম্মদ (সা.)-এর দীপ্তিময় উচ্ছ্বাস খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন কবি জৈনুদ্দীনের ‘রাসুল বিজয়ে’ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত) : ‘নিঃসরিলা নবীবর সঙ্গে অশ্ববার/প্রচণ্ড মৃগেন্দ যেন সাতাইশ হাজার।/চলিল সকল সৈন্য করিয়া যে রোল/প্রলয়ের কালে যেন সমুদ্র হিল্লোল।’

বাংলা সাহিত্যের চিরচঞ্চলা পথচলায় পরবর্তী সময়ে শেখ চান্দ, আলাওল, মুহাম্মদ খান, দৌলত উজির, দৌলত কাজী, মুনশিজান, শাহ্ গরিবুল্লাহ, মুহাম্মদ দানেশ প্রমুখ তাঁদের রচনাসম্ভারের নানা অধ্যায়ে নবিপ্রেমের অপূর্ব মাধুর্য তুলে ধরেছেন। যেমন—‘প্রণামহু তান (তাঁর— আল্লাহর) সখা মহম্মদ নাম/এ তিন ভুবনে নাহি যার উপাম (উপমা)।’—লাইলি-মজনু, দৌলত উজির। অথবা ‘মহাম্মদ আল্লাহর রসুল সখাবার/যার নূরে ত্রিভুবন করিছে প্রসর।’—দৌলত কাজী।

অথবা ‘নিজ সখা মহাম্মদ প্রথমে সৃজিলা/সেই জ্যোতিমূলে ত্রিভুবন নিরমিলা।’—পদ্মাবতী, আলাওল।

মধ্যযুগের কাব্য, পুথিতে বিচিত্র ব্যঞ্জনায় নবিপ্রেম ও বন্দনা প্রাণময় হয়ে ওঠে। খাতের মহাম্মদ, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী, মুন্সী মালে মুহাম্মদ, শেখ ফজলুল করিম, মীর মশাররফ হোসেন, মুন্সী মহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, পাগলা কানাই, লালন, হাসন, খানবাহাদুর তসলিম প্রমুখের নাম এই ধারায় বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁদের কিছু ভক্তিময় নিবেদন হলো—‘মুহাম্মদ মোস্তফা নবী আখেরি দেওয়ান/যাঁহা (যাঁহার) কারণে হৈল লওহলা মাকান (লাওহে মাহফুজ)।/যাঁহা কারণে হৈল জমিন আসমান/যাঁহা কারণে হৈল এ দোন (দু) জাহান।’—খোলাসাতুল আম্বিয়া, খাতের মহাম্মদ।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী মধ্যযুগের নারী কবি। তাঁর ‘রূপজালালে’র শুরুতেই দেখা মেলে অপূর্ব নবিবন্দনা : ‘প্রথমে প্রণাম করি প্রভু নিরঞ্জন/যাঁহার সৃজন হয় এ তিন ভুবন।/তৎপর বন্দনা করি নবীর চরণ/যাঁহার প্রভাবে হয় অন্তিম তরণ।’

মধ্যযুগে দেখা যায়, মুন্সী মেহেরুল্লাহ স্বনামে অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি নবিপ্রেমে উতলা হয়ে লিখেছেন : ‘গাওরে মোসলমানগণ নবীগুণ গাওরে/পরান ভরিয়া সব সল্লে আলা গাওরে।’

মীর মশাররফ হোসেন আধুনিক গদ্যসাহিত্যের পথিকৃৎ, ‘বিষাদ সিন্ধু’, বাঙালির ঘরে ঘরে সমাদৃত। তাঁরই মিলাদুন্নবীর উদ্দেশ্য সার্থক কাব্য রচনা ‘মৌলুদ শরিফে’ অনুপম উচ্ছ্বাসে উচ্চারিত ভক্তিগাথা : ‘তুমি যে সত্য পয়গম্বর/সে প্রমাণ আছে বহুতর/তবু যার মানতে ধোঁকা/সে তার করমের (কর্মের) লেখা।’

আধুনিক কাব্যধারায় ফররুখ আহমদের ‘সিরাজাম মুনিরা’ সর্বকালীন মর্যাদায়, সর্বজনীন গ্রহণীয় স্থান পেয়েছে। প্রিয় নবী (সা.) ফররুখের রচনায় দীপ্তিময় : ‘...কে আসে কে আসে সাড়া পড়ে যায়,/কে আসে কে আসে নতুন সাড়া/জাগে সুষুপ্ত মৃত জনপদ, জাগে শতাব্দী ঘুমের পাড়া।’

কিংবদন্তির ‘বিশ্বনবী’র লেখক গোলাম মোস্তফা অসংখ্য নাত-ই-রাসুল রচনা করেছেন, যা আজও মসজিদে-মাহফিলে নবিবন্দনার অনুষঙ্গ হিসেবে ভক্তিময় উচ্চারণে নিবেদিত : ‘নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মোহাম্মদ রাসুল...।’

অথবা ‘তুমি যে নূরের রবি নিখিলে ধ্যানের ছবি/তুমি না এলে দুনিয়ায় আঁধারে ডুবিত সবই...।’

‘রবিউল আউয়াল’ অর্থ বসন্তের প্রারম্ভ। মরুর ঊষর-ধূসর প্রান্তরে নবীর আগমন প্রতীক্ষায় প্রকৃতি সেজে ছিল মায়াবী রূপসজ্জায়। গাছে গাছে সবুজের সমারোহ, ম-ম গন্ধে খেজুরের ছড়াগুলো উঁকি দিচ্ছে আর পাখপাখালির কূজন, নদীর কলতান, বাতাসের উদাসী গুঞ্জরণ শোনায় বিশ্বনবীর আগমনী বার্তা। তখনই শুনি নজরুলের মূর্ছনাধ্বনি : ‘তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে.../মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে/যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে...।’

প্রিয় নবী (সা.)-এর আগমনে বিশ্বে জাগে এক মহাপুলক আর প্রকৃতি হয় ধন্য-কৃতজ্ঞ। আজও কান পাতলে বাংলার ঘরে ঘরে শোনা যায় : ‘আজকে যত পাপী ও তাপী/সব গুনাহের পেল মাফী/দুনিয়া হতে বে-ইনসাফী/জুলুম নিল বিদায়...।’—কাজী নজরুল ইসলাম।

প্রিয় নবী (সা.) সর্বজনশ্রদ্ধেয় মহামানব। তাঁর মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের নামের সূচনায় যুক্ত তাঁর (মুহাম্মদ) নাম। ‘উম্মতে মুহাম্মদি’ সগৌরবে নিজের নামের সঙ্গে ‘মুহাম্মদ’ যুক্ত করে। এ জন্যই কাজী নজরুলের ভক্তিময় প্রকাশ : ‘মুহাম্মদ নাম যতই যপি ততই মধুর লাগে/নামে এত মধু থাকে কে জানিত আগে।’

আমাদের মরমি সাহিত্যেও নবিপ্রেমের সন্ধান মেলে। আল্লাহর পরিচয় লাভের জন্য রাসুলকে চেনার আহ্বান রয়েছে মরমি চিন্তায়—‘রাসুলকে চিনলে পরে, খোদা চিনা যায়...।’ প্রিয় নবী (সা.)-এর ভালোবাসায় মরমি সাহিত্যিকরাও পিছিয়ে নেই। তাঁদের ভক্তিময়তায় রাসুলবিহীন জীবন অর্থহীন : ‘রাসুল রাসুল বলে ডাকি/রাসুল নাম নিলে বড় সুখে থাকি.../হায়াতুল মুরসালিন বলে/কোরআনেতে লেখা দেখি।/দ্বিনের রাসুল মারা গেলে,/কেমন করে দুনিয়ায় থাকি।’

স্পষ্ট উচ্চারণে বলা যায়, মরমি সাধকরাও প্রিয় নবী (সা.)-এর সান্নিধ্যের মধ্যেই মানবমুক্তি অন্বেষণ করেন বলে তাঁদেরই অনুভব—‘নবী না মানে যারা মোয়াহেদ কাফের তারা এই দুনিয়ায়;/ভজনে তার নাই মজুরি,/দলিলে সাফ দেখা যায়।’

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর।

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা